kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

কপ২৭ : প্রাপ্তি একেবারে কম নয়

ধরিত্রী সরকার সবুজ, শার্ম আল-শেখ থেকে   

২১ নভেম্বর, ২০২২ ০৪:৪২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কপ২৭ : প্রাপ্তি একেবারে কম নয়

মিসরের শার্ম-এল-শেখ শহরে শেষ হলো জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন কপ২৭। কপ২৭-এর মূল অনুষ্ঠানটি শার্ম-এল-শেখ আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে ৬ থেকে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হলো। ১৮ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এক দিন বাড়াতে হয়। শেষ হলো ১৯ গড়িয়ে ২০ তারিখ ভোরে।

বিজ্ঞাপন

প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলালে কপ২৭ একেবারে হতাশ করেনি।

সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি কার্যকর জলবায়ু চুক্তি সই করার আহ্বান জানিয়েছিলেন কপ২৭-এর প্রেসিডেন্ট সামেহ শুক্রি। জলবায়ু আলোচকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘দ্রুত একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছতে হবে। ’ কিন্তু বিশ্ববাসী এবার পায়নি উল্লেখ করার মতো তেমন কোনো সিদ্ধান্ত। ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠিত কপ২৬-এর প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট থেকে প্রায় সব আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য তাকিয়ে থাকতে হবে ২০২৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য কপ২৮-এর দিকে।

শার্ম-এল-শেখ ‘বিজ্ঞের উপসাগর’, ‘শান্তির শহর’ নামেও পরিচিত; মিসরীয় আরবিতে ‘মাদিনেত এস-সালাম’ বলা হয়। শার্ম-এল-শেখ হলো সিনাই উপদ্বীপের মরুভূমি এবং লোহিত সাগরের মধ্যবর্তী একটি মিসরীয় শহর। শার্ম-এল-শেখের বালুকাময় সৈকত, স্বচ্ছ জল এবং প্রবাল প্রাচীরের আতিথেয়তা নিয়েছে কপ২৭-এ যোগদানকারী সারা বিশ্বের প্রায় ৩৮ হাজার মানুষ।

কপ সম্মেলন হলো সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক জলবায়ু সম্পর্কিত সম্মেলন।

ইউএনএফসিসিসি-এর ১৯৭টি দেশ এখানে অংশগ্রহণ করে। বিভিন্ন গ্রুপে জি৭৭ এবং চীন, আফ্রিকা গ্রুপ, লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রিজ, আমব্রেলা ফোরাম, স্মল আইল্যান্ড ডেভেলপিং স্টেটস, ইনডিপেনডেন্ট অ্যালায়েন্স অব লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান দেশগুলো নেগোসিয়েশনে অংশগ্রহণ করে এবং সর্বসম্মতিক্রমে কপ-এর সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয় এবং এখানেই কপ-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কাজ করে।

আলোচক ও কূটনীতিকদের উদ্দেশে অনেক আশা নিয়ে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কপ২৭-এর প্রেসিডেন্ট সামেহ শুক্রি বলেছিলেন, ‘সম্মেলন শেষ হওয়ার আগেই একটি সমন্বিত, উচ্চাভিলাষী ও ভারসাম্যমূলক ফল বের করে আনতে হবে। সময় এখন আর আমাদের পক্ষে নেই। বিশ্ববাসী এই আলোচনার দিকে তাকিয়ে আছে। আসুন, সময় শেষ হওয়ার আগে একযোগে এগিয়ে যাই। ’

কপ২৭-এর উদ্বোধনী আয়োজনে একই সুরে কথা বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিতে পারিনি। দ্রুত ও একযোগে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ’

অন্যদিকে কপ২৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘মানবজাতির সামনে দুটি কঠিন বিকল্প রয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একসঙ্গে কাজ করা কিংবা সম্মিলিত আত্মহত্যা। ’

ইউএনএফসিসিসি কপ আয়োজনের দিনগুলোকে গুরুত্ব আরোপের জন্য বিষয়ভিত্তিক নামকরণ করে। এবাবের কপ-এ ৯ নভেম্বর অর্থ দিবস; ১০ নভেম্বর বিজ্ঞান দিবস; ১১ নভেম্বর যুব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দিবস; ১২ নভেম্বর ডিকার্বনাইজেশন দিবস; ১৩ নভেম্বর অভিযোজন এবং কৃষি দিবস; ১৪ নভেম্বর জেন্ডার দিবস এবং পানি দিবস; ১৫ নভেম্বর সুশীল সমাজ দিবস এবং জ্বালানি শক্তি দিবস; ১৬ নভেম্বর জীববৈচিত্র্য দিবস এবং ১৭ নভেম্বরকে ‘সমাধান দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। দিবসগুলোর নামকরণের দিকে দৃষ্টি দিলে কপ ভেন্যুতে আলোচনার একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়।

কপ২৭-এ নেগোসিয়েশনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অ্যাডাপটেশন, মিটিগেশন এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ। এই কপে ধনী দেশগুলোর কাছে আশা করা হয়েছিল, তারা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ধরে রাখার জন্য গৃহীত পরিকল্পনা কিভাবে বাস্তবায়ন করছে এবং ভবিষ্যতে করবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট ছক বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবে। কিন্তু ধনী এবং শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে তেমন আশাব্যঞ্জক কোনো অঙ্গীকারের কথা এই কপ-এ পাওয়া যায়নি।

বরং উন্নত দেশগুলো এবার তীর ছুড়েছে চীন, ভারত এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর দিকে। কারণ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে থাকলেও চীন, ভারত এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলো অনেক বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সংঘটিত লস অ্যান্ড ড্যামেজের জন্য তারা অর্থ পেতে পারে না, বরং মিটিগেশন ফান্ডের জন্য তাদেরই অর্থ দেওয়া উচিত। মিটিগেশনের আলোচনা এমন মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়ানোর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া জটিলতার মধ্যে নিপতিত হয়। এর অর্থ হলো, ২০৩০ পর্যন্ত নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকটা হুমকির মুখে এবং পৃথিবীর উষ্ণতা কমানোর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কপ২৭ তেমন শক্তিশালী সিদ্ধান্ত নিতে পারল না।

গত বছর কপ২৬-এ প্রতিনিধিরা প্যারিস চুক্তিতে প্রতিষ্ঠিত অভিযোজনের বৈশ্বিক লক্ষ্য নিয়ে একটি কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপটেশনের আলোচনার অগ্রগতি অনেকটা ভালো। তবে এ বিষয়ের পরিপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসবে আগামী কপ২৮-এ।

কপ২৭-এ অন্যবারের মতোই জলবায়ু অর্থায়ন একটি শীর্ষ আলোচনার বিষয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অ্যাডাপটেশন এবং মিটিগেশনের জন্য উন্নত দেশগুলোর বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি এ সম্মেলনে বাস্তবায়িত হবে এমন আশা করা হয়নি। তবে এ বিষয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজনের কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে এবং প্রতিশ্রুত অর্থ বরাদ্দের জোর দাবি জানিয়েছে।

কপ২৭-এ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয় হচ্ছে ক্ষয় ও ক্ষতি  (loss & damage)| ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের কারণে এই ক্ষয় ও ক্ষতি হয়ে থাকে।

লস অ্যান্ড ড্যামেজ কপ২৭-এর নেগোসিয়েশনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থানজুড়ে ছিল এবং এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। সান্তিয়াগো নেটওয়ার্কের হোস্ট অর্গানাইজেশন নির্ধারণ এবং অ্যাডভাইজরি বডি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর লস অ্যান্ড ড্যামেজ মোকাবেলার জন্য একটি স্বতন্ত্র ফান্ড গঠন করা হবে এবং এই ফান্ড পরিচালনা করার জন্য ২৪ সদস্যের একটি ট্রানজিশনাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২৪ জন সদস্যের মধ্যে ১০ জন উন্নত দেশ থেকে, তিনজন এশিয়া-প্যাসিফিক, তিনজন লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, দুজন এলডিসি, দুজন স্মল আইল্যান্ড ডেভেলপিং স্টেটস এবং একজন পূর্ব ইউরোপ থেকে নেওয়া হবে।

অ্যাডাপটেশন ফান্ডের অর্থায়ন দ্বিগুণ করা, সান্তিয়াগো নেটওয়ার্ককে অপারেশনালাইজ করা এবং ক্ষয় ও ক্ষতির (loss & damage) জন্য অর্থায়ন ফান্ড গঠন করা এবারের কপ২৭-এর একটি বিশেষ অর্জন বলা যায়।

লেখক : পরিবেশবিষয়ক লেখক



সাতদিনের সেরা