kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০২২ । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

টিসিবির পণ্যে দীর্ঘ লাইন: বিমুখ হয়ে ফিরছে অনেকে

খায়রুল কবির চৌধুরী   

২৯ অক্টোবর, ২০২২ ০২:৫৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



টিসিবির পণ্যে দীর্ঘ লাইন: বিমুখ হয়ে ফিরছে অনেকে

সাপ্তাহিক ছুটির দিন গতকাল শুক্রবারও টিসিবির তেল বিক্রির কার্যক্রম চলে। রাজধানীর মগবাজার এলাকায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

ছয় মাস আগেও এই অবস্থা ছিল না ঢাকার মগবাজারের বাসিন্দা সোহানার। সংসারের টানাপড়েনে এখন আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো দায়। নিরুপায় হয়ে স্বল্প মূল্যে নিত্যপণ্য কিনতে দাঁড়িয়েছেন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) লাইনে। রোদ মাথায় সময় গোনা, কখন মিলবে সেই তেল, ডাল ও চিনি।

বিজ্ঞাপন

গতকাল শুক্রবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে রাজধানীর হাতিরঝিল-গাবতলা পয়েন্টে গিয়ে টিসিবির লাইনে এই দৃশ্য দেখা যায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সোহানার মতো অন্তত ৮০ জন টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। পুরুষরা তখন কেউ কেউ লাইন ছেড়ে জুমার নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছে। অনেকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও দিনের বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ায় পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফেরত যায়।

স্বল্প মূল্যে নিত্যপণ্য কিনতে আসার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে সোহানা বলেন, ‘লাইনে দাঁড়াতে অস্বস্তি লাগে। কারণ আমরা অভ্যস্ত নই। ’ তিনি জানান, চার মাস আগে কার্ড পেয়েছেন। এর আগে দুইবার পণ্য কিনতে পেরেছেন। গতকাল তৃতীয়বার।

তিনি বলেন, ‘এক বছর আগের আর এখনকার জীবনে অনেক পার্থক্য। সে সময় আমরা মোটামুটি ভালো ছিলাম। এখন জীবনমান অনেক নিচে। ’

তিন ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে পাঁচজনের সংসার মো. হিরণ হাওলাদারের। কারওয়ান বাজারে মাছ ব্যবসায়ীদের মাছ ওঠানো-নামানোর কাজ করেন তিনি। মাসে ১২-১৩ হাজার টাকা আসে। থাকেন বস্তির টিনের ঘরে। চার হাজার টাকা লাগে শুধু ঘর ভাড়ায়ই। তিনি বলেন, ‘এক বছর আগেও মাসের খরচ শেষে প্রতি মাসে হাতে কিছু টাকা থাকত। এখন খাবার জোগাড় করাই অনেক কষ্ট। ’

এমন আরো অনেকে জানায়, সকাল সাড়ে ১১টা থেকে টিসিবির লাইনে তারা দাঁড়িয়ে। সকাল ৭টার দিকে যারা এসেছে, তারা বেশির ভাগই পণ্য কিনে ফেরত গেছে। অনেকে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলে, এর আগেও লাইনে দাঁড়িয়ে বিমুখ হতে হয়েছে। একটা কার্ডের বিপরীতে মাসে একবারই পণ্য কেনা যায়। গত মাসে চেষ্টা করেও অনেকে টিসিবির পণ্য কিনতে পারেনি। তাই গতকাল আবার এসে লাইনে দাঁড়িয়েছে।

মগবাজারের পাগলাবাজার রোডের বাসিন্দা বাদশা মিয়া জানান, গত ১৭ সেপ্টেম্বর মগবাজারের পেয়ারাবাগে বিকেল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও ফিরে গেছেন খালি হাতে।

এভাবে পণ্য কেনাকে যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করলেন লাইনে দাঁড়ানো এক নারী। দুই লিটার তেল, দুই কেজি ডাল, এক কেজি চিনির জন্য এই যুদ্ধ। তা-ও মাসে মাত্র একবার জোটে। পুরো প্যাকেজ তিনি কিনেছেন ৪১০ টাকা দিয়ে।

লাইনে দাঁড়ানো অনেকে জানায়, তিন দিন আগে মগবাজার সোনা মিয়ার বাড়ির সামনে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য পায়নি তারা। তাদের অনেকে গতকাল আবার লাইনে দাঁড়িয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মগবাজারের একজন বাসিন্দা জানান, সকাল ১১টায় এসে লাইনে দাঁড়ান তিনি। মাঝখানে জুমার নামাজ থাকায় লাইন ছেড়ে চলে যান। নামাজের পর আবার এসে লাইনে দাঁড়ান। দুপুরের চড়া রোদের দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, ‘বেশিক্ষণ লাইনে দাঁড়াইতে পারি না। মাথা গরম হয়ে যায়। ’

ক্রেতারা জানায়, যে পরিমাণ পণ্য দেওয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। এই প্যাকেজে ১৫ দিনও যায় না। মেহমান এলে খরচ আরো বেড়ে যায়। অপেক্ষমাণ অনেকে অভিযোগ করে, প্যাকেজের দাম ৪০৫ টাকা হলেও এখানে ৪১০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে টিসিবির ডিলার ভাই ভাই ট্রেডার্সের বিক্রয় প্রতিনিধি দীন ইসলাম জানান, পাঁচ টাকা সবাইকে ভাংতি দেওয়া যায় না। এ জন্য পাঁচ টাকার ডাল বেশি দিয়ে ৪১০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

সকাল সাড়ে ৭টায় পণ্য বিক্রি শুরু হয় বলে জানায় ডিলার কর্তৃপক্ষ ভাই ভাই ট্রেডার্স। দুপুর ২টা ১০ মিনিটে মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বিক্রি বন্ধ হওয়ার পরও ২৫ থেকে ৩০ জন লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল, যারা পণ্য পায়নি।



সাতদিনের সেরা