kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

মিয়ানমার পরিস্থিতির আরো অবনতি, রাখাইনে সংঘাত

মেহেদী হাসান   

৬ অক্টোবর, ২০২২ ০৮:০৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মিয়ানমার পরিস্থিতির আরো অবনতি, রাখাইনে সংঘাত

মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে বিশ্বব্যাপী সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। গত সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে মিয়ানমারের ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে আইসিজি মিয়ানমারকে অবনতিশীল দেশগুলোর তালিকায় রেখেছে।

আইসিজি গতকাল বুধবার বলেছে, দুই বছর বিরতির পর রাখাইন রাজ্যে আবারও লড়াই শুরু হয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ অন্যান্য অঞ্চলেও অব্যাহতভাবে সহিংস বিরোধিতার মুখে পড়ছে এবং শান্তিপূর্ণ ভিন্নমতাবলম্বীদেরও নিপীড়ন করছে।

বিজ্ঞাপন

ক্রাইসিস গ্রুপের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিরোধীদের সংঘর্ষ বাড়ছে। গত মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের কথা উল্লেখ করেছে আইসিজি।

মিয়ানমার নিয়ে আইসিজির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যে সহিংস সংঘাত বেড়েছে। ২০২০ সালের নভেম্বর মাস থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও নৃগোষ্ঠীভিত্তিক সশস্ত্র গ্রুপ আরাকান আর্মির অনানুষ্ঠানিক অস্ত্রবিরতি ভেঙে পড়েছে। গত ৩১ আগস্টের পর আরাকান আর্মি মংডু টাউনশিপে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে বর্ডার গার্ড পুলিশের চৌকিগুলোতে অভিযান চালিয়ে অন্তত ১৯ জন কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। গত ২ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার সামরিক বাহিনী দুটি হেলিকপ্টার গানশিপ দিয়ে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে গুলি চালায়। সেই গুলি বাংলাদেশেও এসে পড়ে।

আরাকান আর্মি গত ১ সেপ্টেম্বর অন টাউনশিপে সামরিক বহরে হামলা চালিয়ে দুটি সামরিক যান ধ্বংস করে। ৭ সেপ্টেম্বর আরাকান আর্মি মাইবন টাউনশিপে সরকারি অফিসে হামলা চালায়। এতে কয়েকজন সেনা সদস্য হতাহত হন। এরপর ৯ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর মংডু টাউনশিপে সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে দখল করে নেয় আরাকান আর্মি। ওই অভিযানে মিয়ানমারের ১৩ সেনা নিহত হন।

ক্রাইসিস গ্রুপ জানায়, আগস্টের শেষের দিকে দক্ষিণাঞ্চলীয় চিন রাজ্যে ১০ সেনাকে হত্যার দাবি করেছে আরাকান আর্মি। এরপর গত ১ সেপ্টেম্বর চিন রাজ্যের পালেতওয়ায় দুই পক্ষের সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, পালেতওয়া শহরের অবস্থান বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে।

অন্যান্য অঞ্চলেও সংঘাত

মিয়ানমারের শান রাজ্যে কারেন আর্মি, কারেন ন্যাশনালিস্ট ডিফেন্স ফোর্সসহ কারেন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আইসিজি বলেছে, কারেন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো গত ৮ সেপ্টেম্বর পেকন টাউনশিপে অ্যামবুশ করে সামরিক বাহিনীর ২০ সদস্যকে হত্যা করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সামরিক বাহিনী গত মাসজুড়ে সাগাইং অঞ্চলের তাবাইন টাউনশিপের কয়েকটি গ্রামে হেলিকপ্টার গানশিপ দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে সামরিক বাহিনী গত ১৯ সেপ্টেম্বর আশ্রমের একটি স্কুলের ওপর এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দুটি হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালায়। ওই হামলায় অন্তত ১১ শিশু নিহত হয়।

গত আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সীমান্ত ও বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে চার দফা তলব করে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের সামরিক হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান গত ৩ সেপ্টেম্বর বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্ত এলাকায় গুলি করে। গত ১৬ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের কামানের গোলা বাংলাদেশে এসে পড়ে।

ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন-পীড়ন, রাশিয়ার সহযোগিতায় শক্তিশালী জান্তা

ক্রাইসিস গ্রুপ নির্বাচনে প্রভাব খাটানোর অভিযোগে গত ২ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের কারাবন্দি নেত্রী অং সান সু চির আরো তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের কথা উল্লেখ করেছে। ক্রাইসিস গ্রুপের হিসাবে, এ পর্যন্ত আট মামলায় ২২ বছরের সাজা পেয়েছেন সু চি। তাঁর বিরুদ্ধে আরো ৯টি মামলা চলছে।

মিয়ানমারের আদালত অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ভিকি বোম্যান ও তাঁর স্বামী হেটে লিনকেও এক বছর করে সাজা দিয়েছেন।

এদিকে মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল অং হ্লাইং গত ৭ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এটি দুই মাসের মধ্যে তাঁদের দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। ওই সাক্ষাতে মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান রাশিয়াকে বিশ্বের পরাশক্তিতে পরিণত করার জন্য পুতিনের প্রশংসা করেছেন। তাঁরা ব্যাংকিং, জ্বালানি, আকাশযানসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

গৃহযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে মিয়ানমার : মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান

মিয়ানমার গৃহযুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা আগের চেয়ে বেড়েছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে জনগণ যে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, তার সঙ্গে ওই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো একসঙ্গে মিলে কাজ করার চেষ্টা করছে। এ কারণে মিয়ানমারের সব অঞ্চলেই সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে তৎপরতা বেড়েছে। কিছু সাফল্যও তারা পাচ্ছে।

আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, কারেন অঞ্চলে কারেন যোদ্ধারা, কাচিনে কাচিন যোদ্ধারা সামরিক বাহিনীর স্থাপনা দখল করে নিচ্ছে। শিগগিরই এর সমাধান নেই। সামরিক বাহিনী মিয়ানমারের জনগণ ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখছে না। এ কারণে বিমান, হেলিকপ্টার থেকে হামলার ঘটনা আমরা দেখছি। তিনি বলেন, কিছু কিছু সময় সামরিক বাহিনী সাময়িক ফল পেলেও দীর্ঘ মেয়াদে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।



সাতদিনের সেরা