kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

নিরুত্তাপ নির্বাচন, আ. লীগ নেতারাই প্রতিদ্বন্দ্বিতায়

কাজী হাফিজ   

৪ অক্টোবর, ২০২২ ০৩:১৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নিরুত্তাপ নির্বাচন, আ. লীগ নেতারাই প্রতিদ্বন্দ্বিতায়

এবারের নিরুত্তাপ এবং প্রায় একদলীয় জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা সদস্য পদেই বেশি। ৬৩৫টি সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দুই হাজার ১৩৫ জন। প্রতিটি সদস্য পদে গড়ে ৩.৩৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা গতবারের চেয়ে বেশি। অন্যদিকে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ৯৬ জন।

বিজ্ঞাপন

এই সংখ্যা অবশ্য গতবারের চেয়ে কম। এবার নির্বাচনে মূলত আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

আগামী ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণার মধ্যে ভোটারদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের নামে টাকা, মিষ্টি ও খাবারের প্যাকেট বিতরণের অভিযোগ উঠেছে। ভোটাররাও আরো বেশি প্রাপ্তির প্রত্যাশায়। কয়েকটি জেলায় এই নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে।

গতবার ৬১টি জেলা পরিষদে এক হাজার ২২০টি সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য পদে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন দুই হাজার ৯৮৬ জন। প্রতিটি সদস্য পদে গড়ে ২.৪৪ জন প্রার্থী ছিলেন। আর গতবার চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন মোট ১৪৬ জন।

এবার জেলা পরিষদ নির্বাচনের পরিস্থিতি সম্পর্কে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, জেলা পরিষদ নির্বাচনটিই অর্থহীন হয়ে গেছে। একদলীয় এই নির্বাচনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ না থাকায় তাদের কোনো আগ্রহও নেই। এই নির্বাচনে ভোটার সীমিত। জেলার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা হচ্ছেন এই নির্বাচনের ভোটার। এ অবস্থায় ভোট কেনাবেচা হতেই পারে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ গতকাল এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘জেলা পরিষদ নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্যের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগ আমরা পেয়েছি। এ ছাড়া ভোট কেনাবেচার অপচেষ্টাসহ আরো কিছু অনিয়মের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আগামী শনিবার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের সঙ্গে কমিশনের বৈঠকে এর প্রতিকার নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ’

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, এই নির্বাচনে সর্বোচ্চ সদস্য পদ রয়েছে কুমিল্লা জেলা পরিষদে। কুমিল্লায় সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য পদ ১৭টি এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য পদ ছয়টি। সদস্য পদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ। এই জেলা পরিষদের সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য পদ ১৫টি এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য পদ পাঁচটি। ১৩টি সাধারণ ও পাঁচটি সংরক্ষিত ওয়ার্ড সদস্য পদ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সিলেট ও দিনাজপুর। আর সর্বনিম্ন তিনটি সাধারণ ও দুটি সংরক্ষিত ওয়ার্ড সদস্য পদ রয়েছে মেহেরপুর ও নড়াইল জেলা পরিষদের।

গতবারের নির্বাচনে প্রতিটি জেলা পরিষদে ১৫টি সাধারণ ওয়ার্ডে ও পাঁচটি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে বিভক্ত করার কারণে সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডে সদস্য পদ ছিল। এবার আইন সংশোধন করে জেলায় উপজেলার সংখ্যানুপাতে ওয়ার্ড সদস্য পদ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এবারের নির্বাচনে ২৬ জেলা পরিষদে একক প্রার্থী হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। নোয়াখালী জেলায় আদালতের আদেশে একজন প্রার্থী তাঁর প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় সেখানে চেয়ারম্যান পদে ভোট হচ্ছে। ফেনী জেলা পরিষদে গতবারের মতোই চেয়ারম্যানসহ সব পদেই বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন প্রার্থীরা। ফেনী জেলা পরিষদসহ সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য পদে ৬৬ জন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য পদে ১৯ জন একইভাবে নির্বাচিত হয়ে গেছেন।

মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি

শেরপুর জেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটার ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না শর্তে জানান, সৌজন্য সাক্ষাতের কথা বলে শুভেচ্ছা বিনিময়ের নামে প্রার্থীদের পক্ষ থেকে তাঁদের বাড়িতে এসে মিষ্টিসহ খাবারের প্যাকেট দেওয়া হচ্ছে। হাত খরচের নামে পাঁচ শ থেকে হাজার টাকাও ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের উপহার-উপঢৌকনও দেওয়া হচ্ছে। মতবিনিময়ের নামে সভায় ডেকে নিয়ে প্যাকেট খাবারসহ এক-দুই হাজার টাকা যাতায়াত খরচও দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েক স্থানে নির্বাচনী ক্যাম্পও খোলা হয়েছে।

ঝিনাইগাতী ও নকলা উপজেলার কয়েকজন ইউপি সদস্য জানান, তাঁরা নিজেরাও ভোটারদের নানাভাবে সন্তুষ্ট করে ভোট নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এখন সুযোগ হয়েছে নির্বাচনের সেই খরচ কিছুটা তুলে নেওয়ার। ওই ইউপি সদস্যের কথা, ‘যে প্রার্থী বেশি দেবেন, সেই প্রার্থীকেই ভোটটা দেব। ’

টাঙ্গাইল জেলা পরিষদ নির্বাচনে ১২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে (সখীপুর উপজেলা) থেকে সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগের তিন নেতা। তাঁরা হলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক কৃষিবিষয়ক সম্পাদক আবদুল হাই তালুকদার, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার কামরুল হাসান ও কালিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য আনোয়ার হোসেন তালুকদার। এখানে প্রচারণায় এখনো বাধা দেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তবে ভোট কেনাবেচার আশঙ্কা করছেন অনেক প্রার্থী।

নরসিংদী জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাথীদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা নিজেদের মতো করে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বেশির ভাগ প্রতিদ্বন্দ্বী একে অন্যের বিরুদ্ধে ভোট কেনার চেষ্টার অভিযোগ করেছেন। এখানে বিভিন্ন ওয়ার্ডের কয়েকজন সদস্য প্রার্থীও ভোট কেনার অপচেষ্টার মৌখিক অভিযোগ করেছেন। তবে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে কেউ লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ করেননি।

চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে নারী সদস্য এবং সাধারণ সদস্যের ১৬টি সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৬৬ জন। এর মধ্যে নারী সদস্যের পাঁচটি ওয়ার্ড ২২ জন ও সাধারণ সদস্যের ১১ ওয়ার্ডে ৪৪ জন লড়ছেন। চারটি সাধারণ ওয়ার্ডে চারজন সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এ টি এম পেয়ারুলের ইসলামের প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক বিএনএফ নেতা নারায়ণ রক্ষিত।

নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদের চেয়ে আলোচনা আছে সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য ও সাধারণ ওয়ার্ডের সদস্য ভোট নিয়ে। জানা যায়, চট্টগ্রামে ১৬টি সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৬৬ জনের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতা এবং তাঁদের অনুসারী।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান ও  চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও রাউজান পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান দেবাশীষ পালিত কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁরা চেয়ারম্যান পদে দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে সবাই এক। কিন্তু সদস্য পদে দল থেকে প্রার্থী সমর্থন না থাকায় এবার দলের অনেকে নির্বাচন করছেন। নারী সদস্য এবং সদস্য পদে অন্য কোনো দলের লোকজন নেই। অনেকটা নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী নিজেরাই।

নির্বাচনী প্রচারে সংসদ সদস্য

জেলা পরিষদ নির্বাচনে পটুয়াখালীতে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের এমপি মুহিবুর রহমান মুহিবের বিরুদ্ধে। গতকাল সোমবার সকালে রাঙ্গাবালী উপজেলা আওয়ামী লীগ অফিসে আয়োজিত আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী খলিলুর রহমান মোহনের আনারস মার্কার নির্বাচনী সভায় অংশ নেন তিনি।

এ বিষয়ে জেলা পরিষদ নির্বাচনে সরাসরি প্রচারণায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে জানতে এমপি মুহিবুর রহমান মুহিবের মোবাইল দুইবার কল করলে প্রথমবার তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এর আগে জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর পক্ষে আয়োজিত সভায় অংশ নেওয়ায় রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনকে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার চিঠি দেন। গত শনিবার পাঠানো চিঠিতে সংসদ সদস্যকে নির্বাচনী আচরণবিধি পালনের অনুরোধ করা হয়।

(স্থানীয় প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন)



সাতদিনের সেরা