kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০২২ । ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বিশেষ সাক্ষাৎকার : সংঘাত, উত্তেজনা আরো বাড়বে

অনলাইন ডেস্ক   

১ অক্টোবর, ২০২২ ০৩:৪৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিশেষ সাক্ষাৎকার : সংঘাত, উত্তেজনা আরো বাড়বে

আন্দ্রে কর্চুনফ

ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এর ফলে ইউক্রেন-রাশিয়াসহ পুরো অঞ্চলে সংঘাত-উত্তেজনা আরো বাড়বে বলে মনে করেন মস্কোর নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের মহাপরিচালক আন্দ্রে কর্চুনফ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মেহেদী হাসান

কালের কণ্ঠ : ইউক্রেনের চার অঞ্চলকে রাশিয়ার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার প্রভাব কী হতে পারে?

আন্দ্রে কর্চুনফ : এটি অনেক বড় একটি সিদ্ধান্ত। প্রথমত, রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবাই এখন খুব কঠিন হবে।

বিজ্ঞাপন

প্রেসিডেন্ট পুতিনের এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের কোনো নেতাই মানবেন না। আর এটি সম্ভবত অযৌক্তিকও নয়।

দ্বিতীয়ত, আগামী দিনগুলোতে সংঘাত, সহিংসতা আরো বাড়তে পারে। কারণ ইউক্রেনের নেতারা এখন ওই ভূখণ্ডগুলো ফিরে পেতে তাদের প্রচেষ্টা জোরদার করবেন। আর এখন ওই ভূখণ্ডগুলো রাশিয়ার অংশ হয়ে যাওয়ায় সেখানে যেকোনো হামলাকে রাশিয়ার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে ক্রেমলিন তা মোকাবেলা করতে চাইবে। তাই আমার আশঙ্কা, আগামী সপ্তাহগুলোতে আমরা হয়তো আরো উত্তেজনা, আরো সংঘাত দেখতে পাব।

কালের কণ্ঠ : ইউক্রেনের চার অঞ্চলকে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?

আন্দ্রে কর্চুনফ : প্রথমত, এখানে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। অভিযোগ ছিল, দনবাসসহ ওই অঞ্চলের রুশ ভাষাভাষীদের ওপর নিপীড়ন চলছিল। তারা রাশিয়ার হস্তক্ষেপ চেয়েছিল। প্রেসিডেন্ট তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশেষ সামরিক অভিযান চালিয়েছেন এবং রুশপন্থীদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এরপর ভোটে ওই অঞ্চলের জনগণ রাশিয়ার সঙ্গে যোগ দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। সেই হিসেবে এটি একটি প্রক্রিয়ার ফল।

আমার মনে হয়, প্রেসিডেন্ট পুতিন নিশ্চিত করতে চান যে ইউক্রেনে তাঁর সামরিক অভিযান সফল এবং উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে। এর আগে তিনি যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন তা যৌক্তিক প্রমাণের জন্য ইউক্রেনের ওই অঞ্চলগুলোকে রাশিয়ার অংশ করে নেওয়াটা তাঁর জন্য দরকারি ছিল। এখন দেখার বিষয়, রাশিয়ার জনগণ এই যুক্তিকে কতটা গ্রহণ করে।

কালের কণ্ঠ : ইউক্রেনের ভূখণ্ড রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলো আগে থেকেই মস্কোকে সতর্ক করছিল। এর পরও এমন সিদ্ধান্তের কারণ কী? এতে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ল কি?

আন্দ্রে কর্চুনফ : ক্রিমিয়া উপদ্বীপের নতুন পরিচয়কে পশ্চিমা দেশগুলো কখনো স্বীকৃতি দেবে না। আমার মনে হয়, পশ্চিমাদের এ অবস্থান মোকাবেলার জন্য রাশিয়ার নেতৃত্বকে প্রস্তুত হওয়া উচিত। প্রেসিডেন্ট পুতিনের ওই ঘোষণার প্রতি রাশিয়ার নাগরিকদের যতটা না আগ্রহ, তার চেয়েও অনেক বেশি আগ্রহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের।

আর রাশিয়ার দিক বিবেচনা করলে, তার নিজের প্রয়োজনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি সব সময় আছে। আগামী দিনেও থাকবে।

কালের কণ্ঠ : আধুনিক বিশ্বে আরেকটি দেশে এভাবে সামরিক অভিযান চালানো, নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং নিজের দেশের সঙ্গে যুক্ত করে নেওয়া কতটা নৈতিক?

আন্দ্রে কর্চুনফ : যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান যাই বলুন না কেন, এগুলো ঘটছে কূটনৈতিক ব্যর্থতার পর। সমস্যা বা উদ্বেগগুলো কূটনৈতিকভাবেই সমাধান হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে মস্কোকে। কারণ মস্কোর উদ্বেগগুলোকে পশ্চিমারা গুরুত্ব দেয়নি।

কালের কণ্ঠ : গত সপ্তাহে রাশিয়া থেকে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইনের কয়েকটি স্থানে ছিদ্র শনাক্ত হয়েছে। ইউরোপ ও রাশিয়া এ জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করছে। রাশিয়া কি গ্যাস পাইপলাইনে কোনো নাশকতা করেছে বলে মনে করেন?

আন্দ্রে কর্চুনফ : রাশিয়া তার নিজের সম্পদ এভাবে ধ্বংস করবে—এমন ভাবনাকে আমি খুব একটা যৌক্তিক মনে করি না। ওই পাইপলাইন রাশিয়ার। রাশিয়া যদি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করতে চায় তাহলে নিজেই সুইচ বন্ধ করে দিতে পারে। এটি তার জন্য বেশি সহজ। যারা রাশিয়ার ওপর থেকে ইউরোপের জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে চাইছে, তারা এ কাজ করতে পারে—এমন ভাবনাই বরং বেশি যৌক্তিক।

কালের কণ্ঠ : গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ অভিযান চলছে। এ নিয়ে রাশিয়ার জনগণের মনোভাব কী?

আন্দ্রে কর্চুনফ : এখনো প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন আছে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্যও তাঁকে দিতে হবে। অভিযানের প্রভাব সরাসরি পড়েছে—তাঁর বিষয়ে এমন ব্যক্তিদের মনোভাব বদলাতে পারে।

তবে আমাকে স্বীকার করতেই হবে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার যে ধরনের প্রভাব রাশিয়ার অর্থনীতিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, ততটা হয়নি। রাশিয়ার সরকার পরিস্থিতি অনেক ভালোভাবে সামলেছে। এখন পর্যন্ত রাশিয়ার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক কম। রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযানের  প্রভাব সাধারণ রুশ নাগরিকদের জীবনে খুব একটা পড়েনি। মস্কোতে থাকলে আপনার মনে হবে না যে রাশিয়া তার প্রতিবেশী দেশে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। তাই প্রভাব তুলনামূলক সীমিত।

কালের কণ্ঠ : অথচ নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সারা বিশ্বে পড়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো নতুন করে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছে। এই যুদ্ধে তাহলে কার ক্ষতি হচ্ছে?

আন্দ্রে কর্চুনফ : আমার মনে হয়, আমাদের সবার ক্ষতি হচ্ছে। অবশ্যই রাশিয়ার ক্ষতি হচ্ছে। দেশটি এরই মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি উন্নয়ন, বিনিয়োগের সুযোগ হারিয়েছে। পশ্চিমাদেরও ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন আর সস্তায় রাশিয়ার তেল-গ্যাস পাবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতির পরিমাণ তত নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে পড়তে পারে। ‘গ্লোবাল সাউথ’ ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে পড়ছে। বিশ্ব নতুন করে মন্দার চক্রে পড়তে পারে।

কালের কণ্ঠ : আগের প্রশ্নটা যদি উল্টোভাবে করি, এই যুদ্ধে কার লাভ হলো?

আন্দ্রে কর্চুনফ : এই যুদ্ধে যদি কোনো গোষ্ঠীর লাভ হয়ে থাকে তাহলে তা অবশ্যই অস্ত্র ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর। ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার’ ফলাফল যা-ই হোক না কেন, অস্ত্র ব্যবসা শুধু পশ্চিমা দেশগুলোতে নয়, সারা বিশ্বে বেড়েছে। প্রতিরক্ষা খাত এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আমার মনে হয়, আমরা আগামী দিনগুলোতে প্রতিরক্ষা খাতে নতুন নতুন কর্মসূচি, চুক্তি ও অস্ত্র সরবরাহ দেখতে পাব।

আপনি যদি দেশ হিসেবে বলেন—কে বিজয়ী? আমি স্পষ্টভাবে কোনো বিজয়ী দেখি না। তবে কৌশলগত দিক দেখলে এই যুদ্ধ থেকে অনেকে নিজের স্বার্থসিদ্ধির সুযোগ পেয়েছে এবং তা কাজে লাগিয়েছে। যেমন : যুক্তরাষ্ট্র এই সংকটকে পশ্চিমা বিশ্বে নিজের অবস্থান, ন্যাটোকে সুসংহত করতে এবং ইউরোপীয় মিত্রদের শৃঙ্খলায় আনতে ব্যবহার করেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত ক্ষেত্রে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সুফল পেয়েছে। আবার লাভ হয়েছে চীনেরও। কারণ চীন এখন রাশিয়ার কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কালের কণ্ঠ : প্রেসিডেন্ট পুতিনের পরিকল্পনাটা কী? আসলে কী চান? এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী?

আন্দ্রে কর্চুনফ : আমি মনে করি না, প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে কোনো মাস্টারপ্ল্যান আছে। তবে পুতিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো রাশিয়া যে একঘরে হয়নি তা প্রমাণ করা। রাশিয়া এখনো এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে, আফ্রিকায় বন্ধু দেখাতে পারবে।

আর পুতিন বা রাশিয়া চাইবে, ইউক্রেন যেন তার নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি না হয়। যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী বা সামনের দিনগুলো কেমন হবে তা নির্ভর করছে যুদ্ধক্ষেত্রের আগামীর পরিস্থিতির ওপর।   

কালের কণ্ঠ : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আন্দ্রে কর্চুনফ : কালের কণ্ঠকেও ধন্যবাদ।



সাতদিনের সেরা