kalerkantho

রবিবার । ৪ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ইনডেমনিটি—মোশতাক থেকে জিয়া ও আজকের বিএনপি

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৫:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



ইনডেমনিটি—মোশতাক থেকে জিয়া ও আজকের বিএনপি

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার জন্য কারা দায়ী তার পরিপূর্ণ ফায়সালা এখনো হয়নি। হঠাৎ করেই বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন বা তাঁকে হত্যা করা হয়েছে এমন কিছু এটা নয়, এ কথা সবাই বোঝে। এর বিশাল প্রেক্ষাপট রয়েছে, তেমনি রয়েছে এর ভয়ংকর পরিণতি। এত বছর হয়ে গেলেও এর প্রেক্ষাপট ও পরিণতি—দুটিই বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির জন্য এখনো অতি গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

এত বড় একটি হত্যাকাণ্ড, যার নজির বিশ্বে নেই, তার প্রেক্ষাপট সঠিক ও আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো উদঘাটিত হবে কি না জানি না। আবার এটিও জানি না যে এর ভয়ংকর যে পরিণতি, তার থেকে বাংলাদেশ কখনো মুক্ত হতে পারবে কি না। এর পরিণতির ভয়াবহতার কথা সবাই জানার পরও কেন জানি তার থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে মুক্ত করার বলিষ্ঠ ও কার্যকর কোনো প্রচেষ্টা নেই। বরং আদর্শগতভাবে বাংলাদেশের মানুষ উল্টো দিকে হাঁটছে। এ নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। সবাই নগদ নিয়ে ব্যস্ত। তবে সামনের সারিতে থেকে যারা সরাসরি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে, তাদের বিচার হয়েছে। কয়েকজনের দণ্ড কার্যকর হয়েছে আর ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন বিদেশে পালিয়ে আছে। চূড়ান্ত রায়ের পর প্রায় ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও পলাতকদের একজনকেও ফিরিয়ে আনা যায়নি। কেন যায়নি, এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এর প্রভাব কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তার চুলচেরা বিশ্লেষণও খুবই প্রয়োজন।

প্রায় সব দেশের ইতিহাসে দু-চারটি এ রকম ঘটনা পাওয়া যাবে, যেখানে দেখা যায় বড় বড় রাজনৈতিক ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি অথবা করা যায়নি অথবা হতে পারে, বিচার হতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু অপরাধী বা হত্যাকারীর বিচার করা যাবে না, সুনির্দিষ্টভাবে এ রকম কোনো আইন মানবসভ্যতার ইতিহাসে কখনো হয়নি, একটি উদাহরণও নেই। তাই বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট বুঝতে হলে এর শিকড়ে কারা রয়েছে এবং তাদের ডালপালার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সবার জানা থাকা উচিত। মহৎ উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ ও লক্ষ্য অর্জনে কোনো বাহিনী নিয়োজিত হলে সেখানে কোল্যাটারাল ড্যামেজ বা অনিচ্ছাকৃত অপরাধের দায়মুক্তি অনেক দেশে অনেক সময় হয়েছে, যার অন্য উদাহরণ বাংলাদেশেও আছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। প্রথমত, এই হত্যাকারীরা কোনো কাজের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়নি। তাই এই হত্যাকারীরা রাষ্ট্রদ্রোহী। দ্বিতীয়ত, তারা নিজেরাই বলেছে, তারা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছে। অর্থাৎ আত্মস্বীকৃত খুনি। আত্মস্বীকৃত কথাটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কারা এই জঘন্যতম নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই, সন্দেহ বা মতভেদ নেই। সুতরাং বিষয়টি শতভাগ স্পষ্ট।

এই আত্মস্বীকৃত খুনিদের ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রথমে ক্ষমা করে দিলেন, অর্থাৎ তাদের বিচার করা যাবে না—এই মর্মে ইনডেমনিটি অথবা দায়মুক্তির ঘোষণা দিলেন অবৈধ রাষ্ট্রপতি বাঙালি ইতিহাসের জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক। সেদিন থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জন্য আরেকটি কলঙ্কিত দিন হয়ে গেল। অবৈধ রাষ্ট্রপতির অবৈধ কাজকে আরো পাকাপোক্ত করলেন অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী বিএনপির আদর্শ ও প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান। অধ্যাদেশ অস্থায়ী একটি বিষয়। এটি যদি জিয়াউর রহমান ভোট কারচুপির মাধ্যমে গঠিত পঞ্চম সংসদে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল আইনি রূপ না দিতেন, তাহলে মোশতাকের অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যেত, এটিই চিরাচরিত বিধান। জিয়াউর রহমান শুধু আইন করলেন তা নয়, এই কালো আইনকে সংবিধানে সন্নিবেশিত করে সেটিকে আরো শক্তপোক্ত করলেন। জিয়াউর রহমান সেখানেই থামলেন না, এই আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পদোন্নতিও দিলেন। অপরাধের বিচার না করা বা করতে না পারা এক বিষয়, আর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের পথ প্রকাশ্যে সরাসরি বন্ধ করে দেওয়া, তাদের পুরস্কৃত করার মাধ্যমে উৎসাহ প্রদান সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। কোনো যুক্তি ও অজুহাত এখানে খাটে না।

এ তো গেল মোশতাক আর জিয়াউর রহমানের কথা, কিন্তু আজ যখন দেখি জিয়াউর রহমানের সব কর্মকাণ্ডকে বর্তমানের বিএনপি বাছবিচারহীনভাবে সমর্থন শুধু নয়, গ্লোরিফাই করে—তখন সত্যিই ৪৭ বছর আগে সংঘটিত এই ঘটনা আলোচনার জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আরো প্রাসঙ্গিক হয় এই কারণে যে বিএনপির জন্ম, উত্থান, রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ এবং রাজনীতি—সব কিছুই জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের পথ ধরেই শুরু হয়েছে। এ পথেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ পদদলিত হয়েছে, জামায়াতের মতো ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী দল শুধু রাজনীতি করা ও মন্ত্রী হওয়া নয়, স্পর্ধার সব সীমা লঙ্ঘন করে বলতে পেরেছে একাত্তরে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। বাংলাদেশের জন্য এর চেয়ে বড় চপেটাঘাত আর হতে পারে না। পঁচাত্তরের খুনিদের আইন দ্বারা রক্ষা ও পুরস্কৃত করার কারণেই একাত্তরের খুনিরা এত বড় স্পর্ধা দেখাতে সাহস পেয়েছে। এক খুনিকে মাফ করে দিলে অন্য খুনিরা উৎসাহিত হয়, সেটিই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অঙ্গনে ঘটেছে, যা ৩০ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না।

বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার বন্ধ করে দেওয়ার পথ ধরেই সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র চরম সাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপিত হয়েছে। মানবসভ্যতার মৌলিক, স্বতঃসিদ্ধ অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের পথকে উৎসাহিত করা, যে অর্থেই হোক না কেন, সেটি শেষ বিচারে কারো জন্য ভালো হয় না। জিয়াউর রহমানের জন্যও যে ভালো কিছু হয়নি, তা এখন সবাই জানে। একজন সিটিং রাষ্ট্রপতি নিহত হলেন, এর বিচার কেউ চাইল না, যদিও তাঁর পরিবারের আপনজন পরে রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। এটিকেই বলে ইতিহাসের নির্মম পরিহাস। কিন্তু এর চেয়ে বড় পরিহাস হলো এই, বর্তমানের বিএনপি ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত এই নির্মম পরিহাস থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। জিয়াউর রহমানের সব কাজ বিএনপি এখনো গ্লোরিফাই শুধু নয়, তাঁর সব কাজ সঠিক বলে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্তিতে ফেলার চেষ্টায় আছে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি দেখে মনে হয়, আবার সুযোগ পেলে তারা জিয়াউর রহমানের চিন্তা ও কাজকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করবে, যেটি তারা করেছিল ২০০১-২০০৬ মেয়াদে। এতে সংঘাত, সংঘর্ষ রাজনীতিতে ফিরে আসবে এবং বর্তমান সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতিফলন যতটুকু যা আছে তার সব কিছু বাতিল হবে, বাংলাদেশ পুনরায় পাকিস্তানি স্টাইলের ধর্মীয় উগ্রবাদী রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হবে, যার পরিণতি ২০০১-২০০৬ মেয়াদে দেখা গেছে। বিএনপির অঙ্গসংগঠন ছাত্রদল প্রকাশ্যে রাস্তায় যখন স্লোগান দেয় পঁচাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার, তখন উপরোক্ত শঙ্কার যথার্থতাই প্রমাণিত হয়।

বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গিজনিত বিষয়ের ওপর আরো দু-একটি উদাহরণ দিই। পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুর আদর্শবাহী দল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির চরম শিকার হয়েও তিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বাংলাদেশকে বের করার উদ্যোগ নেন। সে কারণেই তিনি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন না করে জাতির পিতা হত্যার বিচার সাধারণ আদালতেই শুরু করলেন। অথচ বিচার দ্রুত শেষ করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করলে তখন কেউ কোনো প্রশ্ন ওঠাত না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে কর্মরত বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের চাকরিচ্যুত করা হয় এবং তারা সবাই তখন বিদেশে আত্মগোপনে চলে যায়। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আবার সবাইকে চাকরিতে পুনর্বহাল শুধু নয়, নতুন করে প্রমোশন দেয়। এতে প্রমাণিত হয় আজকের বিএনপিও বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের পুরস্কৃত করার নীতিতে বহাল আছে। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারটি হাইকোর্ট পর্যন্ত শেষ হয়, আপিল বিভাগে পেন্ডিং থাকে। কিন্তু ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে অত্যন্ত কূটকৌশলে আপিল বিভাগে এই হত্যাকাণ্ডের শুনানিটি বিএনপি ঠেকিয়ে রাখে। এসব কারণে বলা হয়ে থাকে জিয়া-পরবর্তী বিএনপি সংশোধনের পথে নয়, বরং একই রকম প্রতিহিংসা ও হত্যাকাণ্ডের রাজনীতিতে অটল আছে, যার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। সুতরাং বিএনপির রাজনৈতিক স্ট্যান্ড যত সময় উপরোক্ত জায়গায় বহাল থাকবে, তত দিন বাংলাদেশে সুস্থ রাজনীতি প্রত্যাশা করা বাতুলতা মাত্র।

রাজনীতিতে সমঝোতা, আপস এবং আলাপ-আলোচনা একটা প্রচলিত প্রথা। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সেটা হওয়া উচিত ও প্রত্যাশিত। কিন্তু উপরোক্ত রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিএনপি যদি প্রকৃত অর্থে সরে না আসে, তাহলে কার সঙ্গে কার সমঝোতা হবে। এক পক্ষের রাজনীতির মৌলিক অবলম্বন প্রতিহিংসা, হত্যাকাণ্ড, আত্মস্বীকৃত খুনিদের পুরস্কৃত করা আর অন্য পক্ষ বারবার তার ভিকটিম বা শিকার। সুতরাং এই দুইয়ের মধ্যে সমঝোতা হবে কী করে। একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলে তাদের কার্যক্রমের মধ্যে ভালো-মন্দ, সফলতা-ব্যর্থতা থাকবে, সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হত্যাকাণ্ডের পথ কোনো বিকল্প হতে পারে না। তথাকথিত ছদ্মবেশী নিরপেক্ষ সুধীরা জিজ্ঞেস করতে পারেন, পুনরায় বিএনপি ক্ষমতায় এলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড আক্রমণের চলমান মামলার বিচারের কী হবে, ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান বিষয়ক মামলার বিচারের পথ রুদ্ধ হবে কি না, তারা কি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পলাতক আসামিদের ধরে এনে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা করবে, নাকি আগের মতো পুরস্কৃত করবে। বাংলাদেশের রাজনীতি বলতে যা কিছু বোঝায় তার সব কিছুকে সুস্থ ধারায় আনতে হলে উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর বিএনপির কাছ থেকে পাওয়া জরুরি। এক পক্ষ জল্লাদের ভূমিকায় আর অন্য পক্ষ সব কিছুতে সাধু-সন্ন্যাসী হবে—এমন প্রত্যাশা অবাস্তব। তাই উপসংহারে বলা যায়, আজকের বিএনপি যদি মোশতাক-জিয়ার পথ পরিহার করে সুস্থ রাজনৈতিক ধারায় ফিরে আসে, তাহলে বাংলাদেশকে আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
[email protected]



সাতদিনের সেরা