kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

ডেঙ্গু হটস্পট ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত জরুরি

ড. কবিরুল বাশার   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৪:৩০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ডেঙ্গু হটস্পট ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত জরুরি

ডেঙ্গু এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কিছু এলাকায় এপিডেমিক আকার ধারণ করেছে। সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু ভয়াবহ হবে—এই বার্তা আমরা জুনের শুরুতে দিয়েছি এবং এটি প্রায় সব জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে। কালের কণ্ঠে গত ১৯ জুন লিখেছিলাম, ‘বাংলাদেশে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু ভয়াবহ হতে চলেছে। গত বছরের তুলনায় আমরা এ বছর এডিস মশার ঘনত্ব ঢাকায় বেশি পেয়েছি।

বিজ্ঞাপন

ঢাকায় এডিস মশার বর্তমান ঘনত্ব ডেঙ্গু ছড়ানোর উপযোগী মাত্রায় রয়েছে। ’ আমরা বারবার বলে এসেছি হটস্পট ম্যানেজমেন্ট করতে ব্যর্থ হলে ডেঙ্গু ভয়াবহ হবে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি এসে আমরা এই ভয়াবহতা টের পাচ্ছি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ১৭ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর এক দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৯৯ জন, যার মধ্যে ২৮০ জন ঢাকার এবং ১১৮ জন অন্যান্য জেলার। ঢাকার পরে ডেঙ্গুর নতুন হটস্পট হয়েছে কক্সবাজার। ঢাকা বাদে বাংলাদেশের ৬২টি জেলায় মোট রোগীর সংখ্যা এক কক্সবাজারে আক্রান্তের সংখ্যা থেকে কম। এ ছাড়া কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা সারা বাংলাদেশের মোট রোগীর সংখ্যার তুলনায় বেশি। গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ১১ হাজার ১৭৭ জন রোগী ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের মাত্র ৭২টি হাসপাতালের। এই ৭২টি হাসপাতাল ছাড়াও আরো অনেক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বাড়িতে ডেঙ্গু রোগ নিয়ে অনেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।

প্রতিদিন ক্রমাগত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে, কোনোভাবেই আমরা ডেঙ্গুর লাগাম টেনে ধরতে পারছি না।

কোনো শহরে বা অঞ্চলে ডেঙ্গু যখন এপিডেমিক হয় তখন জরুরি ভিত্তিতে সেখানে হটস্পট চিহ্নিত করতে হয়। আর এটি করার অন্যতম উপায় হলো, হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু রোগীর ঠিকানা সংগ্রহ করে ম্যাপিং করে হটস্পট চিহ্নিত করা। আমরা বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই অল্প কয়েকটি হাসপাতালে নিয়মিতভাবেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেশি। এই হাসপাতালগুলো হলো—মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল, ইবনে সিনা হাসপাতাল, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল এবং আদ-দ্বীন হাসপাতাল। ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী আছে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

বছরের শুরু থেকেই এই হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত মনিটর করে রোগীর ঠিকানা সংগ্রহ করে হটস্পট ম্যানেজমেন্ট করতে পারলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা এত বাড়ত না। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হটস্পট চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে রোগীর বাড়ির চারপাশে ৫০০ গজের মধ্যে ফগিং ও লার্ভিসাইডিং করে উড়ন্ত মশা ও লার্ভা মেরে দিতে হবে। এপিডেমিক এলাকার উড়ন্ত মশাগুলো ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করছে। তাই তারা জ্যামিতিক হারে ডেঙ্গু ছড়াতে সক্ষম। কোনোভাবেই তাদের বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে জনসচেতনতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিতে হবে। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাধারণ নাগরিকদেরও অংশগ্রহণ করতে হবে। যার যার বাড়ি এবং বাড়ির আঙিনা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে যেন কোনোভাবেই নিজের বাড়িতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজনন হতে না পারে।

সিটি করপোরেশনগুলোকে ৎসপিড অ্যাকশন টিম তৈরি করে হটস্পট ম্যানেজমেন্টের জন্য পাঠাতে হবে। ৎসপিড অ্যাকশন টিমকে নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনোভাবেই হটস্পট এলাকায় এডিস মশা বেঁচে না থাকে। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীকেও এ কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে। আগামী অক্টোবর মাস পর্যন্ত আমরা সবাই মিলে যদি এই কার্যক্রমটি সঠিকভাবে অব্যাহত রাখতে পারি, তাহলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে চলে আসবে।

আমি বাঁচলে আমার পরিবার বাঁচবে, পরিবার বাঁচলে সমাজ বাঁচবে, আর সমাজ বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এই মন্ত্র ধারণ করে সবাইকে একযোগে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সিটি করপোরেশন এবং নগরবাসীর সম্মিলিত প্রয়াসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কীটতত্ত্ববিদ ও গবেষক



সাতদিনের সেরা