kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

দিল্লির চিঠি

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে

জয়ন্ত ঘোষাল   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৪:৪৯ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে

এবার উজবেকিস্তানে সাংহাই কো-অপারেশনের বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে সাক্ষী রেখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সর্বসমক্ষে বলেছেন, খুব দ্রুত সাংহাই কো-অপারেশনের সদস্যদের উচিত প্রত্যেককে প্রতিটি সীমান্তের ট্রানজিট রাইট দেওয়া। তা না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতিটা হবে কী করে?

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শুনেছেন, কোনো উত্তর দেননি। উত্তর দেওয়ার প্রথাও নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, ভারত থেকে আফগানিস্তানে অথবা এশিয়ার একটা বড় অংশ ভারতে ব্যবসা করতে গেলে প্রয়োজন সরাসরি আফগানিস্তান থেকে ঢুকে সেসব দেশে পৌঁছানো।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু পাকিস্তান যদি সে সুযোগ না দেয়, তাহলে কিভাবে একটা দেশ আরেকটা দেশের সঙ্গে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ঐক্য গড়ে তুলবে?

কাজেই সেন্ট্রাল এশিয়ার বাজার পেতে গেলে এই অধিকার পাওয়া জরুরি বলে মনে করছে ভারত। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার শুরুতে সদ্য অনুষ্ঠিত এই এসসিও বৈঠকের অবতারণা কেন করলাম? কারণ একটাই, পাকিস্তান যখন ভারতের সঙ্গে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করছে না বা ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক যুযুধান দুই পক্ষ, সে সময় বাংলাদেশ কিন্তু ভারতের সঙ্গে এই ট্রানজিটের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ভারত এখন চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাদের বাণিজ্যটাকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর মাধ্যমে বিস্তার করার সুযোগ পাচ্ছে। আবার বাংলাদেশও চট্টগ্রামে তার পরিকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুত সাধন করছে, যাতে বাংলাদেশেরও বাণিজ্যিক ক্ষমতা অনেকটা বেড়ে যায়। চট্টগ্রাম বন্দরকে ব্যবহার করে ভারতের পণ্য পরিবহনের এই ট্রানজিট ব্যবস্থাকে এখন দুই দেশের সরকারের তরফ থেকেও অভিহিত করা হচ্ছে ট্রান্সশিপমেন্ট কিংবা কানেক্টিভিটি নামে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন ঢাকায় গিয়েছিলেন তখনই ভারত কর্তৃক চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের ব্যাপারে একটা সমঝোতা স্মারক হয়েছিল এবং উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এটা কার্যকর হয়েছে। আবার চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে জাহাজ ও পণ্যসামগ্রী হ্যান্ডলিংয়ের বাড়তি চাপ নেওয়ার মতো যে সক্ষমতা, সেটাও এর ফলে দ্রুত বাড়ানোর প্রয়াস বাংলাদেশের সরকারের দিক থেকে তৈরি হয়েছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দ্রুত দূর করার চেষ্টা হচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনকালেই দীর্ঘদিন পর স্থল সীমানা চুক্তি কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যে যেসব ছিটমহল ছিল, তা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাগ হয়েছে। এগুলো শেখ হাসিনা সরকারেরও একটা বড় সাফল্য।

২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিলেন। সেই ভার্চুয়াল বৈঠকে বাংলাদেশ প্রস্তাব দিয়েছিল, ভারত, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারে যে ত্রিদেশীয় আঞ্চলিক সড়ক হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ যুক্ত হতে চায়। ভারতের যে অ্যাক্ট-ইস্ট পলিসি, তার আলোতেই এই সড়কটা হচ্ছে। এই মহাসড়ক ভারত-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী  Moreh-Tamu  হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় ও নেপিডো এবং বাগো শহর হয়ে শেষ হবে থাইল্যান্ডের  Myawaddz-Mae sot  শহরে। ভারত এই মহাসড়কটি কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাইছে। ভারতের ইস্ট ওয়েস্ট ইকোনমিক করিডরের এটা একটা অংশ।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের চিলাহাটি সীমান্ত থেকে পশ্চিমবঙ্গের হলদিবাড়ী পর্যন্ত রেল যোগাযোগ উদ্বোধন করা হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরো অগ্রগতি হচ্ছে।

এ রকম একটা পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার ভারত সফরের পরপরই ভারত ঘোষণা করেছে, আগামী বছর জি-২০-এর সম্মেলনে বাংলাদেশ বিশেষভাবে আমন্ত্রিত। বিশ্বের শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল ২০টি দেশের অর্থনৈতিক জোটের (গ্রুপ অব টোয়েন্টি, সংক্ষেপে জি-২০) বৈঠকে অতিথি হিসেবে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানাবে ভারত। আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এই এক বছর মেয়াদে জি-২০-এর সভাপতিত্ব করবে ভারত। পরবর্তী সভাপতি হিসেবে এক ঘোষণায় জি-২০ নিয়ে ভারত তার কর্মপরিকল্পনা জানিয়েছে।

গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে ভারতের জি-২০-এর মুখ্য সমন্বয়ক ও সাবেক পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, ভারত প্রথমবারের মতো জি-২০-এর সভাপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। জি-২০ হলো বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর জোট। এই জি-২০-এ সভাপতিত্ব আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতকে তার ব্যাবহারিক এজেন্ডা উপস্থাপনের সুযোগ করে দেবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, জি-২০-এর সভাপতি হিসেবে ভারত আগামী ডিসেম্বর থেকে সারা দেশে ২০০টিরও বেশি বৈঠকের আয়োজন করবে। জি-২০-এর রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান পর্যায়ের সম্মেলনটি আগামী বছরের ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরো জানায়, জি-২০-এর বৈঠক ও শীর্ষ সম্মেলনে কিছু অতিথি দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আমন্ত্রণ জানানোর ঐতিহ্য আছে। অতিথি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ, মিসর, মরিশাস, নেদারল্যান্ডস, নাইজেরিয়া, ওমান, সিঙ্গাপুর, স্পেন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আমন্ত্রণ জানাবে ভারত। আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, জাপান, কোরিয়া প্রজাতন্ত্র, মেক্সিকো, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে এই জি-২০ গঠিত।

এই মুহূর্তে কানেক্টিভিটি গোটা পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের কাছেই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে চীন যেভাবে খুব আক্রমণাত্মকভাবে তার এই কানেক্টিভিটির ডিপ্লোম্যাসি শুরু করেছে, তাতে ভারতও সেখানে পিছিয়ে থাকতে চায় না। এ ব্যাপারে ভারতের কাছে বাংলাদেশের সহযোগিতাও বিশেষভাবে কাম্য। বাংলাদেশও তার পররাষ্ট্রনীতি অনুসারে সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেও ভারতের কাছ থেকে এগুলো আদায় করে নিতে চায়, যাতে বাংলাদেশেরও তাতে লাভ ষোলো আনার ওপর আঠারো আনা।

গত বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকায় পুরনো ইন্ডিয়া হাউসে এক অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের হিলি থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে মেঘালয়ের মহেন্দ্রগঞ্জ মহাসড়কসহ কয়েকটি সংযোগ স্থাপন নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন ভারতের সদ্যোবিদায়ি হাইকমিশনার। ভারতের সদ্যোবিদায়ি হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী বলেন, উপ-আঞ্চলিক সংযুক্তির জন্য এই ভাবনা এসেছে। এর উদ্দেশ্য হলো ভারত-বাংলাদেশ, ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, এমনকি তারও বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্ত করা। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আঞ্চলিক সংযোগের জন্য সড়কের সংখ্যা খুবই সীমিত। ভারতের উত্তরাঞ্চল থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার পথ হলো শিলিগুড়ি করিডর। ওই পথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ সীমিত। সেই কারণে বিকল্প পথ হিসেবে আমরা ভারত, বাংলাদেশ, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং এর বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে নতুন নতুন সড়কের মাধ্যমে যুক্ত করার পথ খুঁজছি। ’

সদ্যোবিদায়ি ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, নতুন সংযোগের ওই প্রস্তাবগুলোর কয়েকটি আলোচনা টেবিলে আছে। তিনি বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে আসামের সংযোগ স্থাপনে কাজ করছেন। তিনি বলেন, এগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকল্পও আছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফেনী নদীর ওপর মৈত্রী সেতু দিয়ে চট্টগ্রামের সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, রামগড় থেকে সাবরুম, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার সংযোগের উদাহরণ দেন। এগুলোকে সংযুক্তির পথ হিসেবে উল্লেখ করে সদ্যোবিদায়ি ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশজুড়েও সংযোগ বাড়বে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-ভারত মানচিত্রের দিকে তাকালে পূর্ব ও পশ্চিম দিক দিয়ে খুব বেশি সংযোগ দেখতে পাবেন না। উত্তর-দক্ষিণ দিকেই যত সংযোগ, বিশেষ করে এ দেশের কৃষি অঞ্চলের সঙ্গে।   

সদ্যোবিদায়ি হাইকমিশনার বলেন, পশ্চিমবঙ্গের হিলি থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে মেঘালয়ের মহেন্দ্রগঞ্জ পর্যন্ত প্রস্তাবিত মহাসড়ক প্রকল্পটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে সংযুক্ত করার প্রস্তাবগুলোর অন্যতম। এটি বাস্তবসম্মত হলে এবং বাস্তবায়ন করা গেলে তা পুরো অঞ্চলকেই সংযুক্ত করবে। তিনি আরো বলেন, সবেমাত্র সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত এটি বেশ ব্যয়বহুল প্রকল্প হতে পারে। এর মধ্যে যমুনা নদীর ওপর প্রায় ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সেতু থাকতে পারে। এর জন্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে অর্থও চাইতে হতে পারে। সমীক্ষা শেষে ভারত বিষয়টি দেখবে।

ভারতের সদ্যোবিদায়ি হাইকমিশনার সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফর ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ। অনেকের ধারণা, এ ধরনের সফর দর-কষাকষির; কিন্তু বাস্তবে এই সফর ছিল সম্পর্কের ধারাবাহিকতার। তিনি বলেন, দুই দেশের নেতাদের নেতৃত্বের গুণাবলির কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আঞ্চলিক, অর্থনৈতিক, সড়ক ও রেলের ক্ষেত্রে উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের পাশে থাকবে ভারত।

সদ্যোবিদায়ি ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ভারত আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশকে অতিথি রাষ্ট্র হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একে অনেক বড় বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে বিক্রম দোরাইস্বামী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা বুঝতে পারবেন, এটি কেবল শীর্ষ সম্মেলন প্রক্রিয়ায় আমন্ত্রণ নয়, এটি ভারতের সভাপতিত্বে জি-২০ বৈঠকগুলোতে সামগ্রিকতার জন্য আমন্ত্রণ। ’

সদ্যোবিদায়ি ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশসহ আমন্ত্রিত অতিথি দেশগুলো জি-২০-এর ফলাফল নিয়ে বৃহৎ পরিসরে আলোচনার অংশ হওয়ার সুযোগ পাবে। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১২ বছর পর যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই সঙ্গে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে কুশিয়ারা নদীর পানির বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। দুই দেশের পরবর্তী প্রজন্ম বিদ্যমান সম্পর্কের সুফল পাবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সফরে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্দেশীয় যোগাযোগ বাড়াতে এই সিদ্ধান্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সম্পর্ক উন্নয়ন করে পরের ধাপে এগিয়ে নিতে সিদ্ধান্তগুলো রূপরেখা তৈরি করবে। বিক্রম দোরাইস্বামী বলেন, এবারের সফরের তিনটি বিষয় দুই দেশের সম্পর্ককে আরো জোরদার করবে। কুশিয়ারা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত মূলত পাঁচটা সরকার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতায় থেকেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরে জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। রাজনীতির ক্ষেত্রে পাঁচটি সরকারই নানাভাবে খুব আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তিনটি ধারা লক্ষ করা যায়। প্রথমটি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত। দ্বিতীয়টি ১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে ১৯৯৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত। আর তৃতীয় ধারাটা ২০০৯ সাল থেকে, যা এখনো বহমান। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়েই সৌদি আরব সফর করেছিলেন এবং প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি চীনে গিয়েছিলেন। ভারতের সঙ্গে বিরাজমান সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। গঙ্গার পানিবণ্টনের ব্যাপারে একটি চুক্তি হয়েছিল, যা দুটি দেশের সম্পর্ককে একটা নতুন দিগন্ত দিয়েছিল। এর পর থেকে শেখ হাসিনা যেভাবে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এগিয়েছেন এবং সেখান থেকে আজ যেখানে এসে পৌঁছেছেন, তাতে কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের মতাদর্শকে বজায় রেখে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে শেখ হাসিনা আরো শক্তিশালী করেছেন। যে মডেলটা বঙ্গবন্ধু তৈরি করেছিলেন, সেখানে ছিল গণতান্ত্রিক কাঠামোয় দলীয় কর্তৃত্ব। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি, সীমিত পরিমাণ ব্যক্তিগত খাত, বৈদেশিক নীতিতে জোটনিরপেক্ষতা আর ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি। বঙ্গবন্ধুর এই উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কিভাবে পরিচালিত হবে সে ব্যাপারে বাংলাদেশের সংবিধানেও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ২৫-এর ১, ২ এবং ৬৩, ১৪৫-ক এই ধারাগুলো মূলত বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আর সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে তো স্পষ্ট বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে বৈদেশিক নীতিতে অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানানো হবে। অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় হস্তক্ষেপ করা হবে না। যেকোনো সমস্যায় শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে যেতে হবে। জাতিসংঘ তথা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান জানাতে হবে। সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা, নিরস্ত্রীকরণ ইত্যাদির কথাও বলা হয়েছে। এই ভাবাদর্শ অনুসরণ করেই ভারত ও বাংলাদেশ—এই দুই দেশের মৈত্রী আজ এত মজবুত হয়েছে। আশা করব, জি-২০-এ আমন্ত্রিত বাংলাদেশ আর ভারত এই সম্পর্ককে আরো ইতিবাচক পথে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার নেবে।

 লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি



সাতদিনের সেরা