kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

চাই ইতিহাসচিন্তা ও ইতিহাসচর্চা

আবুল কাসেম ফজলুল হক   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৪:৫৭ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



চাই ইতিহাসচিন্তা ও ইতিহাসচর্চা

‘কেহ একা থাকিও না। যদি অন্য কেহ তোমার প্রণয়ভাগী না হইল তবে তোমার মনুষ্যজন্ম বৃথা। পুষ্প সুগন্ধি, কিন্তু যদি ঘ্রাণগ্রহণকর্তা না থাকিত, তবে পুষ্প সুগন্ধি হইত না—ঘ্রাণেন্দ্রিয়বিশিষ্ট না থাকিলে গন্ধ নাই। পুষ্প আপনার জন্য ফুটে না।

বিজ্ঞাপন

পরের জন্য তোমার হৃদয়-কুসুমকে প্রস্ফুটিত করিও। ’—বঙ্কিমচন্দ্রের এই উক্তির মর্মার্থ কী? কী বোঝাতে চেয়েছেন তিনি এই কথা কটির দ্বারা? মানুষের নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা কাম্য নয়। মানুষ সামাজিক জীব, সমাজে থেকেই তাকে চলতে হবে, সমাজের প্রতি তার কর্তব্য আছে, সমাজেরও তার প্রতি কর্তব্য আছে। প্রতিটি মানুষকে বাঁচতে হবে এই সচেতনতা নিয়ে এবং কাজ করতে হবে বাস্তব অবস্থা বুঝে সর্বজনীন কল্যাণে। সর্বজনীন কল্যাণের মধ্যে তার নিজের কল্যাণও অবশ্যই থাকবে। ওই কথাগুলোর পরে বঙ্কিম আরো কিছু কথা লিখেছেন এবং বক্তব্য শেষ করেছেন সমাজে সবার পারস্পরিক সম্প্রীতি কামনা করে। তিনি লিখেছেন, ‘প্রীতিই আমার কর্ণে এক্ষণকার সংসারসংগীত। অনন্তকাল সেই মহাসংগীত সহিত মনুষ্য-হৃদয়-তন্ত্রী বাজিতে থাকুক। মনুষ্যজাতির উপর যদি আমার প্রীতি থাকে, তবে আমি অন্য সুখ চাই না। ’ ব্রিটিশ-শাসিত বাংলার রেনেসাঁসের উত্তাপ এই সব লেখার মধ্য দিয়েও অভিব্যক্ত হয়েছে। বঙ্কিমের উপন্যাসগুলোর মধ্য দিয়েও তৎকালীন নবযুগের নতুন চিন্তা ও আশা অভিব্যক্ত হয়েছে। ভিন্ন বাস্তবতায় রবীন্দ্রনাথের একটি গান :
 
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।

একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো রে

যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে, সবাই করে ভয়

তবে পরান খুলে

ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা একলা বলো রে

যদি গহন পথে যাবার কালে কেউ ফিরে না চায়

তবে পথের কাঁটা

ও তুই রক্তমাখা চরণতলে একলা দলো রে

যদি ঝড়-বাদলে আঁধার রাতে দুয়ার দেয় ঘরে

তবে বজ্রানলে

আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে একলা জ্বলো রে

সুরের সংযোগে গানের কথা বেশি অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে শুধু কথা থেকে কিছু বোঝা যায়। যিনি সত্যের পূজারি তাঁকে সত্যের সপক্ষে বহু সময়ে একলা দাঁড়াতে হয়, বহুবার তাঁকে ‘পরান খুলে মনের কথা’ একলাই বলতে হয়। রবীন্দ্রনাথের আরেকটি কবিতার কয়েকটি চরণ :

দুর্দিনের অশ্রুজলধারা

মস্তকে পড়িবে ঝরি, তারই মাঝে যাব অভিসারে

তার কাছে—জীবন সর্বস্বধন অর্পিয়াছি যারে

জন্ম জন্ম ধরি। কে সে? জানি না কে। চিনি নাই তারে—

শুধু এইটুকু জানি, তারি লাগি রাত্রি-অন্ধকারে

চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর-পানে

ঝড়ঝঞ্ঝা বজ্রপাতে জ্বালায়ে ধরিয়ে সাবধানে

অন্তরপ্রদীপখানি।

এতে কবি প্রকৃত সৃষ্টিশীল মানুষদের সংকল্প ও সাধনার কথা বলেছেন। তাদের চলার পথ, সৃষ্টির পথ কুসুমাস্তীর্ণ থাকে না, থাকে কণ্টকাকীর্ণ।

সঙ্গ-নিঃসঙ্গতা ও মহান সংকল্প নিয়ে এসব কথা আমার মনে জাগছে গত ১৫ই আগস্টে দৈনিক ভোরের কাগজে প্রকাশিত নূরে আলম সিদ্দিকীর একটি লেখা পড়ে। লেখাটি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের কিছু স্মৃতি নিয়ে। এতে প্রাসঙ্গিকভাবে আমাদের জাতীয় জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও রয়েছে। লেখাটির শিরোনাম ‘হৃদয়ের নিভৃত কন্দরে তিনি অমলিন’। নূরে আলম সিদ্দিকীর পরিচয় আশা করি পাঠক জানেন। তাই সে বিষয়ে যেতে চাই না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার সময়ে বাস্তবতা কেমন ছিল, সে সম্পর্কে স্মৃতিচারণা করে লিখেছেন, “মুজিব ভাইয়ের নেতৃত্বের যে আসন, সেটি মানুষের হৃদয়ে তিল তিল করে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। ...তাইতো প্রশ্ন এসে যায়, ১৫ই আগস্টের পর সারা বাংলাদেশ অগ্নিগিরির গলিত লাভার মতো বিস্ফোরিত তো হলোই না, বরং নীরব, নিথর, নিস্পৃহ, নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল কেন? এই নিস্পৃহতার কী কারণ—তার পূর্ণ বিশ্লেষণের ভার আমি ইতিহাসের কাছেই অর্পণ করতে চাই। তবু আমার নিজের ধারণা, ঘটনার আকস্মিকতা এবং নৃশংস নির্মমতায় সমগ্র জাতি হতচকিত হয়ে গিয়েছিল, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, বাকশাল গঠনপ্রক্রিয়ার প্রকোপে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। অনেক দল, বিশেষ করে ভ্রান্ত বামের সংমিশ্রণে আওয়ামী লীগ তার নিজস্ব শক্তি হারিয়ে ফেলে। ভাগের মা গঙ্গা পায় না—এমনই এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল সে সময়। অন্যদিকে যাঁদের ওপর সংগঠনগুলোর দায়িত্ব অর্পিত ছিল, তাঁরা সবাই দায়িত্ব পালনে কেবল ব্যর্থই হননি, অনেকটা অস্বীকৃতি জানানোর মতোই ছিল তাঁদের নিস্পৃহতা। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে রক্ষীবাহিনী রাজনৈতিক নির্দেশের অভাবে সেনাবাহিনী থেকে পরিত্যক্ত ২৬ জন বিকৃত মানুষকে প্রতিরোধ করার জন্য এগিয়ে আসেনি। ”

নৈতিক চেতনার অভাব এবং ভীতির ব্যাপারও ছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রাণহানির জন্য কে বা কারা কিভাবে কতখানি দায়ী, তখন দেশব্যাপী জনমনে কী রকম প্রবণতা ও চিন্তা-চেতনা ছিল, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে  inner party struggle -এর রূপ ও প্রকৃতি কেমন ছিল, আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য সব দলের মনোভাব ও কার্যকলাপ  (inter party relations)  কেমন ছিল, ইতিহাসের প্রয়োজনে পক্ষপাতমুক্ত বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তা তলিয়ে দেখা দরকার। সর্বজনীন, সর্বাঙ্গীণ জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি দরকার, সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তা সম্ভব নয়। দল যাঁরা করেন তাঁদের সামনে সর্বজনীন কল্যাণে কোনো বক্তব্য উপস্থাপন করা হলে সেই বক্তব্যের প্রতি তো তাঁদের আকৃষ্ট হওয়ার কথা। রাজনীতির উন্নতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। রাজনৈতিক দলের কোনো বিকল্প নেই। দল গঠন, দলের রূপ ও প্রকৃতি নির্ধারণ ইত্যাদি নিয়ে অনেক চিন্তা, অনেক চর্চা দরকার। নূরে আলম সিদ্দিকীর পূর্বোক্ত লেখাটিতে আরো আছে :

‘বঙ্গবন্ধুকে অকালে হারানোর বেদনায় ক্ষতবিক্ষত আমার হৃদয়কে দীপ্তিহীন আগুনের শিখায় দগ্ধীভূত করে যখন একান্তে ভাবি, বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের গৃহটি আক্রান্ত হওয়ার পর দুই ঘণ্টার কাছাকাছি সময় তিনি হাতে পেয়েছিলেন। এই সময়ের মধ্যে সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে এবং রক্ষীবাহিনীর যিনি রাজনৈতিক দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের সবার সঙ্গে টেলিফোনে বারবার পরিস্থিতি জানিয়ে সাহায্যের জন্য, অর্থাৎ ওদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। কিন্তু বারবার টেলিফোন করার পরও কারো কাছ থেকে তিনি কোনো সহযোগিতা পাননি শুধু কর্নেল জামিল ব্যতিরেকে। আমি প্রত্যয় দৃঢ়চিত্তে মনে করি, সশস্ত্র বাহিনী ও রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তো বটেই, ন্যূনতমভাবে তাঁদের দেহরক্ষীদের নিয়ে বের হলেও দুষ্কৃতকারীরা পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করার পথ খুঁজে পেত না। কিন্তু দুর্ভাগ্য বঙ্গবন্ধুর, মর্মান্তিক শাহাদাতের পূর্বে তিনি বুক ভরা বেদনা নিয়ে উপলব্ধি করে গেলেন তিনি কতটা একা, নিঃস্ব ও রিক্ত। ’

আওয়ামী লীগ তো তখন অনেক বড় দল ছিল। অন্য কোনো দলই তো তখন তেমন বড় ও শক্তিশালী ছিল না। তার পরও বঙ্গবন্ধু কেন এমন ‘একা, নিঃস্ব ও রিক্ত’ ছিলেন? বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে আওয়ামী লীগের  inner party struggle  এবং অন্যান্য দলের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল? মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ তো তখন ক্ষয়িষ্ণু ছিল। ন্যাপ (মোজাফফর) ও সিপিবি তো ১৯৭৩ সালের প্রায় শুরু থেকে বঙ্গবন্ধুর সমর্থক ও আওয়ামী লীগের সহযোগী ছিল। মার্ক্সবাদী দলগুলো তো তখন ভাঙতে ভাঙতে ছোট ছোট গ্রুপে পরিণত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী ছিল এবং পাকিস্তান রক্ষায় সক্রিয় ছিল, তারা তো তখন পালিয়ে পালিয়ে আত্মরক্ষা করছিল। তাদের প্রতি ১৯৭৩ সালের সাধারণ ক্ষমার ব্যাপারটিকেও বুঝে দেখার দরকার আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর শাসননীতিকে কী দৃষ্টিতে দেখত? বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির রূপ ও প্রকৃতি তখন কী ধরনের ছিল? বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্নতির জন্য সংশ্লিষ্ট সবার বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব এবং ট্র্যাজিক পরিণতি সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা অর্জন করা দরকার। সমকালীন ইতিহাস নিয়ে পৃথিবীর সব জাতির মধ্যেই মতবিরোধ থাকে। মতবিরোধ থাকলেই ইতিহাস বিকৃতি ঘটে না। ইতিহাস বিকৃতি ঘটে তখনই, যখন হীনস্বার্থে প্রকৃত তথ্যের নামে পরিকল্পিত কাল্পনিক তথ্য পরিবেশন করা হয়।

ইতিহাসের দিক থেকে বাইরের কিছু ঘটনা বিচার করে যদি আমরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে বুঝতে চাই, তাহলে হয়তো সেই জ্ঞান এ ব্যাপারে আমাদের স্বাভাবিক বোধশক্তির সহায়ক হবে। বাংলাদেশ এখন কি বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘর্ষের দিকে এগোচ্ছে? বুঝতে পারি না।

চীনে কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও জেদং ১৯৬৬ সালে লক্ষ করেন যে পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত সরকার ভুল পথে চলছে (তাঁর নিজের বিবেচনা অনুযায়ী)। তখন তিনি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কর্মনীতি ও কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। প্রেসিডেন্ট লিউ শাওচি, প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাইকে পেছনে ফেলে চীনের গণবাহিনীর প্রধান সেনাপতি লিন পিয়াও তখন পার্টির চেয়ারম্যান মাও জেদংয়ের একান্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে অনুষ্ঠানাদিতে মাও জেদংয়ের নেতৃত্বের সীমাহীন মহিমা কীর্তন করতে থাকেন। তিনি প্রায় ১০০ পৃষ্ঠার মধ্যে চীন বিপ্লবের একটি ইতিহাস রচনা করেন এবং তাতে তিনি শুধু গণবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ দেন। রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তার কোনো বিবরণ তাতে স্থান পায়নি। মাও জেদংকে দেখানো হয় গণবাহিনীর প্রধান রূপে। মাও জেদং তখন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের সব কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং নেতৃত্বের জন্য অপেক্ষাকৃত তরুণদের নিয়ে সব পর্যায়ে বিপ্লবী কমিটি গঠন করেন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ঘটনাবলি তখন রক্তক্ষয়ী রূপ লাভ করে। তখন মাও জেদংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পার্টির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অধিবেশনে লিউ শাওচি মাও জেদংয়ের অবর্তমানে পার্টির চেয়ারম্যান হবেন বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আসলে তখন পার্টির অভ্যন্তরে চলছিল তীব্র অন্তর্বিরোধ। লিন পিয়াও পার্টির চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য মাও জেদংয়ের মহিমা কীর্তন করে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে থাকেন। মাও জেদং তখন পারকিনসনস রোগে ভুগছিলেন। সেই অবস্থায় লিন পিয়াও মাও জেদংকে হত্যা করে পার্টির চেয়ারম্যান হওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। সামরিক গোয়েন্দারা ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেন। লিন পিয়াও তখন বিশেষ সামরিক বিমানে সপরিবারে মঙ্গোলিয়ার দিকে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। ঘটনাক্রমে এক পাহাড়ে আঘাত লেগে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় এবং লিন পিয়াওসহ বিমানের সবাই মারা যান। এর বছরখানেক পর মাও জেদং মারা যান। তাঁর মৃত্যুর এক মাস পর পার্টি থেকে বহিষ্কৃত তেন শিয়াও পিং পার্টিতে সক্রিয় হন এবং পার্টির নেতৃত্ব দখল করে নেন। তাঁরা মাও জেদংয়ের একান্ত অনুগত চারজন শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকে ‘চারের চক্র’ বলে চিহ্নিত করেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহের মামলা দেন। পার্টিতে অন্তর্বিরোধ সব সময় ছিল। বিপ্লবের (১৯৪৯) পরে  inner party struggle -ই ছিল মূল সমস্যা। তেন শিয়াও পিংরা ক্ষমতাসীন হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, মাও জেদং ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান। তিনি অনেককেই প্রতিভাবান মনে করতেন। পরে এই ধারণা ভুল ছিল।

great leap forward  নামে যে কর্মসূচি ও কার্যক্রম তিনি চালিয়েছিলেন, তা ছিল অতি দ্রুত সমাজতন্ত্রে পৌঁছার কর্মসূচি। তা বাস্তবায়নের সময় তখন হয়নি। মাও জেদংয়ের প্রতিভা ও মহত্ত্ব সম্পর্কে এবং চীন বিপ্লব সম্পর্কে তাঁদের শ্রদ্ধা অব্যাহত ছিল এবং আছে। অল্প কথায় বিষয়টি ভালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হলো      না।

রাশিয়ার বিপ্লবের (১৯১৭) পরে কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে সংগ্রাম  (inner party struggle)  অনেক বেশি এবং জটিল ছিল। লেনিন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং পায়ে গুলি লাগার ফলে তাঁর চলাফেরা করা অত্যন্ত দুরূহ ছিল। ট্রসকি রাশিয়ার বাইরে গিয়েও আত্মরক্ষা করতে পারেননি, তাঁকে হত্যা করা হয়। ১৯৫৩ সালে স্তালিনকেও বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এসবই  inner party struggle-এর মধ্যে ঘটেছিল।

আমি এ বিষয়গুলো উল্লেখ করলাম শুধু। কেউ আগ্রহী হলে এসব বিষয়কে গভীরভাবে জানার জন্য অনুসন্ধান চালাতে পারেন। সমস্যার সমাধানের জন্য মানবচরিত্র সম্পর্কে জানা দরকার।

বঙ্গবন্ধু হত্যার ব্যাপারটিকে বুঝতে হলে তখনকার আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধের গতি-প্রকৃতি তলিয়ে দেখতে হবে। মুহসীন হলে ছাত্রলীগের এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের সাতজন ছাত্রনেতাকে হত্যা করেছিল। এর ধারাবাহিকতায় পরের দিন ছাত্রলীগের আরো দুজন কর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল। তখন শুনেছি, ছাত্রলীগের ওই দুই গ্রুপের পেছনেই আওয়ামী লীগের পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী তরুণ কিছু নেতা গোপনে সক্রিয় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু পরিবার, সেরনিয়াবাত পরিবার, ফজলুল হক মনি পরিবার কেন, কিভাবে আক্রান্ত হয়েছিল সে বিষয়ে পক্ষপাতমুক্ত বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অনুসন্ধান দরকার। এ ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই ৩ নভেম্বর ঘটে জেলহত্যা। সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন, মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান জেলখানার ভেতরে প্রাণ হারান। জানার জন্য তথ্যনিষ্ঠা ও সত্যনিষ্ঠা দরকার। অতীতে যা কিছু ঘটে গেছে তার কোনোটাই বদলানো যাবে না। তবে তথ্যনিষ্ঠা ও সত্যনিষ্ঠা নিয়ে অতীতের মর্মান্তিক ঘটনাবলি সম্পর্কে জানতে পারলে সেই জ্ঞান সহায়ক হবে ভবিষ্যতে যাতে সেই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে তার বাস্তবতা সৃষ্টিতে। প্রতিহিংসার মনোভাব শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই ক্ষতিকর হয়। আমাদের ইতিহাসচেতনা ও ইতিহাসচর্চা যাতে সুস্থ ও স্বাভাবিক হয় তার জন্য জাতীয় পরিসরে চিন্তা ও চেষ্টা দরকার। নিরন্তর চিত্তশুদ্ধির অনুশীলন দরকার। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও বাংলাদেশের ৫০ বর্ষ পূর্তির অনুষ্ঠানাদি লক্ষ করে অনেকের মনে অনেক প্রশ্ন জাগছে। সেগুলো নিয়ে অনুসন্ধান ও বিচার-বিবেচনা দরকার। স্বাধীন চিন্তাশীলতা দরকার। যাঁরা বিশিষ্ট নাগরিক বলে আত্মপরিচয় দেন, তাঁদের মধ্যে কি স্বাধীন চিন্তাশীলতা লক্ষ করা যায়? দমননীতি নিয়ে সরকার বিপদে পড়বে।

লেখক : বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, আহমদ শরীফ চেয়ার অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা