kalerkantho

শনিবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ৯ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ২৭ সফর ১৪৪৪

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে আস্থা ও ঐক্যের নতুন মাত্রা যুক্ত হবে

এ কে এম আতিকুর রহমান   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৪:৩২ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে আস্থা ও ঐক্যের নতুন মাত্রা যুক্ত হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার দিনের সরকারি সফরে গতকাল দিল্লিতে পৌঁছেন। সফরকালে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু ও উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। আজ তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসবেন।

বিজ্ঞাপন

আগামীকাল দুই দেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের মধ্যে যে অনুষ্ঠানটি হবে সেখানেও তিনি যোগ দেবেন। তথ্য মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আজমির শরিফ যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে যেসব ভারতীয় সেনা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ‘মুজিব বৃত্তি’র আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারেন।   

বাস্তবতা হলো, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের মতো একই রকম নয়। কারণ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তিতে রয়েছে দুটি দেশের একই ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, আস্থা ও ঐক্যের শক্তিশালী চেতনা। সেই চেতনার বহিঃপ্রকাশ দুই দেশের বন্ধনের মাত্রা বিভিন্ন সময় ও পরিস্থিতিতে দুই দেশের জনগণই প্রমাণ করেছে। তবে চলার পথে তাদের যে একেবারেই হোঁচট খেতে হয়নি তেমন নয়। যা হোক, বিভিন্ন প্রতিকূলতা পেরিয়ে সেই সম্পর্ক দিন দিন এক অনন্য উচ্চতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান সফরটি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়ার নিরলস প্রচেষ্টারই একটি অংশ।     

দুটি দেশের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফর অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। আর উচ্চ পর্যায়ের (রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান) সফরবিনিময় দুটি দেশ ও তাদের জনগণের সম্পর্কের বন্ধনকে দৃঢ়তর করার মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়ার পথ প্রশস্ত করে। এর ফলে শুধু দুই দেশের নেতাদের মধ্যেই নয়, দুটি দেশের জনগণের মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আর সেই প্রভাবে দুটি দেশ ও জনগণ যেকোনো সমস্যা সমাধানে এবং উন্নয়ন সহযোগিতার সব ক্ষেত্রে যৌথ স্বার্থেই এগিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে যখন দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আত্মার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়ে যায়, তখন তাদের মধ্যে সমস্যা প্রকট হতে পারে না। তাই বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণকে সেই মানসিকতায় এগিয়ে নিয়ে যেতে দুই দেশের নেতারা সব সময়ই উচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় সফরকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। উল্লেখ্য, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু ভারত সফর দিয়েই তাঁর বিদেশ সফর শুরু করেননি, তিনি সবচেয়ে বেশিবার ভারত সফর করেছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। অন্যদিকে ভারতের নেতারাও একইভাবে বাংলাদেশ সফর করাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। এরই প্রমাণ হিসেবে আমরা গত কয়েক বছরে দুই দেশের মধ্যে অনেক সর্বোচ্চ পর্যায়ের সফর অনুষ্ঠিত হতে দেখেছি।

আজ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দুই প্রতিনিধিদলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় নিয়েই বিশদ আলোচনা হবে। সিলেটের সীমান্তবর্তী কুশিয়ারা নদীর উজান থেকে সেচের মাধ্যমে পানি আনার ব্যাপারে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। উল্লেখ্য, দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর পরে হলেও কয়েক দিন আগে অনুষ্ঠিত দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে এ ব্যাপারে দুই দেশই সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া অভিন্ন নদীগুলো; যেমন—মনু, মুহুরী, খোয়াই, গোমতী, ধরলা প্রভৃতির পানি ব্যবস্থাপনা ও পানিবণ্টন কিভাবে হবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরো তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে আলোচনা অব্যাহত রাখার কথা উঠতে পারে। তবে এ যাত্রায় বাংলাদেশের প্রত্যাশিত কয়েক বছর ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো সম্ভাবনা নেই, আরেকটু সময় লাগতে পারে।

দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হবে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সব সময়ই ভারতের অনুকূলে রয়েছে। যেমন গত অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার হলেও বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ অবশ্যই এ কথা বলে যে বাংলাদেশ ভারতে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে, এর থেকে অনেক বেশি পণ্য ভারত বাংলাদেশে রপ্তানি করে থাকে; যদিও বর্তমানে বাংলাদেশ ২৫টি পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছে। তবে দুই দেশের বাণিজ্যিক ব্যবধান হ্রাস করার ক্ষেত্রে তা উল্লেখ করার মতো ভূমিকা রাখছে না। তাই এই বিষয়টি আলোচনায় উঠবে—এটিই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকালে দুই প্রধানমন্ত্রীর সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (সেপা) স্বাক্ষরের ব্যাপারে নেওয়া সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনা করা হতে পারে এবং ওই চুক্তিটি স্বাক্ষরের উদ্দেশ্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ সম্পন্ন করার জন্য দুই দেশের কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশ জ্বালানি এবং কয়েকটি প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ভারত থেকে আমদানি করতে পারার নিশ্চয়তা চাইতে পারে।

আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংযোগ (কানেক্টিভিটি) ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেকটাই প্রসারিত ও সহজসাধ্য হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে, আন্তরিকতা ও ভাববিনিময়ের সুযোগ বাড়ায় তারা অনেক কাছাকাছি আসতে পেরেছে। অন্যদিকে দুই দেশেরই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। ভারত তার পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যেমন যোগাযোগ সুবিধা ভোগ করছে, তেমনি বাংলাদেশও ওই অঞ্চলে যাতায়াত ও বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে উপকৃত হচ্ছে। আশা করা যায়, বর্তমান সফরে এ বিষয়ে আরো আলাপ-আলোচনা হবে এবং সংযোগের বিস্তৃতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ সময় বাংলাদেশ তার সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুবিধা ভুটান ও নেপালকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভারতের কাছে ট্রানজিট সুবিধার কথা ওঠাতে পারে।        

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের নিরাপত্তা, বিশেষ করে সীমান্ত সুরক্ষার বিষয় ছাড়াও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয় নিয়ে কথাবার্তা হবে। বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে যাতে কোনো বাংলাদেশি প্রাণ না হারায় সে ব্যাপারে দুই দেশের কর্তৃপক্ষকে আরো সজাগ থাকার বিষয়টি উঠে আসতে পারে। সীমান্ত এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা, মাদক চোরাচালান, মানবপাচার ইত্যাদি বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সামরিক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে ভারতের আরো আন্তরিক ও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করবে এবং ভারতের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি চাইবে, যদিও ভারত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে আসছে; কিন্তু বাস্তবে ভারতের পক্ষ থেকে তেমন কোনো ইতিবাচক ফলপ্রসূ পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ মনে করে, মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে সে বিবেচনায় ভারত কার্যকর ভূমিকা নিলে বাংলাদেশে আশ্রিত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের ভিটামাটিতে সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন অনেকটাই সহজ ও দ্রুত হবে।     

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে যে প্রভাব ফেলেছে, বাংলাদেশ তা থেকে মুক্ত নয়। করোনা মহামারির দুর্ভোগ না কাটতেই এই যুদ্ধ জনগণকে নতুন ভোগান্তিতে ফেলেছে। বিশ্বব্যাপী খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েই চলেছে। এমন অবস্থায় রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে ব্যবহার করে বাংলাদেশ কোনো সুবিধা (বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি) নিতে পারে কি না, তা হয়তো আমাদের প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠককালে আলাপ করতে পারেন। জানা মতে, রাশিয়া থেকে সরাসরি জ্বালানি কেনার চেয়ে ভারত থেকে রাশিয়ার জ্বালানি কম দামে (ভারত ভর্তুকি দেবে) কেনার প্রস্তাব দিতে পারে ভারত। দুই নেতা হয়তো এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছবেন।    

আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। এগুলোর মধ্যে দুই দেশের স্টাফ কলেজের মধ্যে সহযোগিতা, বিচার বিভাগীয় সহযোগিতা, কুশিয়ারা নদীর পানিবণ্টন, রেলওয়ে ক্ষেত্রে সহযোগিতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতা, তথ্য ও সম্প্রচার ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং সুনীল অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) বিষয়ক সমঝোতা স্মারক এবং নেপালের জিএমআর কম্পানির সঙ্গে ভারতের ওপর দিয়ে জলবিদ্যুৎ আমদানি সুবিধা চুক্তি ইত্যাদি রয়েছে। এ ছাড়া রূপসা নদীর ওপর নির্মিত সেতু হস্তান্তরের দলিল বিনিময়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।

দুই নেতা অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে প্রতিটি বিষয় আলোচনা করবেন এবং দুই দেশের জনগণের কল্যাণ ও উন্নতির জন্য করণীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যবস্থা নেবেন। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে একটি ঐক্যের জ্যোতি যেন চিরদিন দৃশ্যমান ও প্রাণবন্ত থাকে সেদিকে লক্ষ্য রেখে উভয়ের উন্নয়নের জন্য একত্রে কাজ করে যেতে পারে, সেই ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই সফর শুধু দুই নেতার মধ্যে বোঝাপড়াই সৃষ্টি করবে না, দুই দেশের জনগণকে নিজেদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য একসঙ্গে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে, শক্তি দেবে। আর এ অঞ্চলের শান্তির জন্য সেটি হবে এক নতুন পথের সূচনা। চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের চেয়ে যদি দুই দেশের জনগণকে আরো কাছে আনা যায়, সেটিই হবে এই সফরের সবচেয়ে বড় সাফল্য। আমরা আশা করি, এই সফর বন্ধুত্ব, আস্থা ও ঐক্যের অনবদ্য উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব



সাতদিনের সেরা