kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ অক্টোবর ২০২২ । ২১ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

বিশেষজ্ঞ মত

মিশেলের বক্তব্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রতিধ্বনি মাত্র

মো. তৌহিদ হোসেন

অনলাইন ডেস্ক   

১৯ আগস্ট, ২০২২ ০৭:৫৫ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মিশেলের বক্তব্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রতিধ্বনি মাত্র

বাংলাদেশ সফর শেষে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল বাশেলেতের যে বক্তব্য সেটা তাঁর প্রতিষ্ঠানের (জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামো) বক্তব্যেরই প্রতিধ্বনি। তিনি যেখানেই যান সেখানেই তাঁর প্রতিষ্ঠানের উৎকণ্ঠার কথা প্রকাশ করা হয়। আমার মনে হয়, এখানেও তিনি তা করে গেছেন।

যেমন ধরা যাক, গুম-খুন বা বিচারবহির্ভূত হত্যা—এগুলো নিয়ে বাংলাদেশেও কথা হয়।

বিজ্ঞাপন

সরকার নিশ্চয়ই তার অবস্থান, প্রতিক্রিয়া জানায়। এটি সরকারের দায়িত্ব। আর যাঁরা কোনো একটি মানদণ্ড ধরে এগোতে চান তার ঘাটতির অভিযোগ পেলে উদ্বেগ জানাবেনই—এটাই স্বাভাবিক।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, জাতিসংঘ বা জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার কার্যত সরাসরি কিছু করতে পারেন না। বাংলাদেশের যা যা করার দরকার বলে সংবাদ সম্মেলনে মিশেল বাশেলেত উল্লেখ করেছেন, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষমতা তাঁর বা তাঁর প্রতিষ্ঠানের নেই। সফরে কী কী কথাবার্তা হয়েছে তা নিয়ে হয়তো তিনি একটি প্রতিবেদন দিতে পারেন তাঁর দপ্তরকে। এর বাইরে প্রায়োগিক কিছু করা বা কিছু আরোপ করার ক্ষমতা তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতেই নেই।

মিশেল বাশেলেতের সফরে সরকার, ক্ষমতাসীন দল তাদের অবস্থান তুলে ধরেছে। তার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। অনেকে ভাবতে পারেন, বিদেশি বা জাতিসংঘের প্রতিনিধির সামনে আমাদের বিভক্ত সমাজ, রাজনৈতিক বিভাজন—এগুলো প্রকাশিত হয়েছে। এমন ভাবার কিছু নেই। এটি স্বতঃসিদ্ধ পন্থা। আর গত ৫০ বছরে আমরা জাতীয় কোনো ইস্যুতে বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের স্বার্থের বিষয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি কখনো একমত হইনি, হতে পারিনি।

আমাদের দেশে সুশাসনের ঘাটতি সব সময়ই ছিল, আছে। এটি ‘এখন’ বা ‘তখন’-এর বিষয় নয়। তৃতীয় বিশ্বের সব দেশেই সুশাসনের ঘাটতি আছে। আমাদের এখানে হয়তো একটু বেশি বা কম আছে।

কোনো দেশে সুশাসনে যখন ঘাটতি থাকে, তখন যারা ক্ষমতায় থাকে তারা কিছু সুবিধা পায়। আর যারা ক্ষমতার বাইরে থাকে তারা একটু অসুবিধায় থাকে। এটি আমরা সব সময় দেখে আসছি। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দুরবস্থায় ছিলেন। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন বিএনপিও ভালো থাকে না।

একভাবে চিন্তা করলে বাংলাদেশে কী ঘটছে, না ঘটছে—তা নিয়ে অল্প কিছু দেশের অল্প কিছু মানুষ ও প্রতিষ্ঠান উদ্বিগ্ন হয়। কাজেই যারা এ রকম বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয় বা বাংলাদেশকে চেনে, তারা ভালো করেই জানে যে আমাদের রাজনৈতিক মহলে বড় ধরনের বিভেদ আছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধান মিশেল বাশেলেত রোহিঙ্গা শিবিরে গেছেন মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তিনি বা তাঁর প্রতিষ্ঠান যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নয়। এপারে বা ওপারে মানবাধিকার পরিস্থিতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিস্থিতি দেখা তাঁর কাজ। কারণ সীমান্তের ওপারের মানবাধিকার পরিস্থিতি কী, তা তিনি জানেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে রাজি হবে না, এটি তিনি ভালোভাবেই জানেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধানের বাংলাদেশ সফরে বড় কোনো বার্তা আছে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশ সরকারই তাঁকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তিনি জাতিসংঘের একটি ভালো পদে আছেন। আবার তাঁর মেয়াদও শেষ হয়ে আসছে। কিছুদিন পরই তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। এসব বিবেচনায় এই সফরে বাংলাদেশের জন্য, এমনকি সরকারের জন্য উদ্বেগের বিষয় হতে পারে—এমন কোনো শক্ত কথা তিনিও বলেননি।

লেখক : সাবেক পররাষ্ট্রসচিব



সাতদিনের সেরা