kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ অক্টোবর ২০২২ । ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ আগস্ট, ২০২২ ১৫:৪৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের

দেশে বর্তমান জ্বালানি সংকট আগামী দুই মাসের মধ্যে কেটে যাবে বলে সরকার আশ্বস্ত করলেও ভবিষ্যতে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশয় ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায়  স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ব্যবস্থাপনা গ্রহণের তাগিদ দেন তারা।

বুধবার (১১ আগস্ট) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এক গোলটেবিল বৈঠকে এই আশঙ্কার কথা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম।  

সুশাসনের জন্য নাগরিক আয়োজিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট : নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের মূল  প্রবন্ধে তিনি বলেন,  বিশ্ববাজারে এলএনজি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সহসা থেমে যাবে না বরং ইউরোপিয়ান দেশগুলো রাশিয়ার গ্যাস না পাওয়ার ফলে এলএনজি বাজারে নামছে একই সঙ্গে এর মূল্যবৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি ওপর অধিকতর নির্ভরশীলতা বাংলাদেশকে  আরো আর্থিক সংকটে ফেলবে। এ সংকট সমাধানের উপায় হিসেবে দেশীয় গ্যাস মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গ্যাসসম্পদ মূল্যায়ন সংস্থাসমূহ একমত পোষণ করে যে বাংলাদেশে এখনো অনাবিষ্কৃত গ্যাস পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যাবে।

ড. বদরুল ইমাম বলেন, বাংলাদেশে ১৯৭০-এর দশক থেকে ক্রমাগতভাবে বাৎসরিক গ্যাস উৎপাদন হার বেড়েছে। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরও উৎপাদন বৃদ্ধির হার অব্যাহত ছিল এবং ২০১৬ সালে তা সর্বোচ্চ ৯৭৩ বিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছে। কিন্তু ২০১৭ থেকে বাৎসরিক গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ কমতে থাকে।

গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য ২০১৮ সাল থেকে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। পরে বিশ্ববাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি এবং তারপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এলএনজি স্পটে মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে।

পেট্রোবাংলার হিসাব মতে, এলএনজি আমদানি করতে প্রতিবছর ৪৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং তা কেবল মোট গ্যাস সরবরাহের ২০% মেটায়। বাকি ৮০% সরবরাহকৃত গ্যাস আসে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন থেকে, যার জন্য খরচ হয় ২০ হাজার কোটি টাকার কম।

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয় এবং প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এলএনজি আমদানির মাধ্যমে আনা হয়। প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের গ্যাস উৎপাদন প্রতিদিন এক হাজার ৫০০ মিলিয়নে নেমে যেতে পারে এবং তখন এলএনজি আমদানির মাধ্যমে গ্যাস ক্রয় বেড়ে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছবে বলে প্রাক্কলন করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনায় মূল ভূখণ্ডে ও সাগরক্ষকে ব্যাপক গ্যাস অনুসন্ধানের আওতায় নিয়ে আসা।

এটি দুঃখজনক যে বাংলাদেশ অতি গ্যাস সম্ভাবনাময় হওয়া সত্ত্বেও এখানে অনুসন্ধান কূপের সংখ্যা বিশ্বের অন্যান্য গ্যাস ধারক বেসিনসমূহ থেকে অনেক অনেক কম। পার্শ্ববর্তী ভারতের একটি ছোট রাজ্য ত্রিপুরা (১০,০০০ বর্গকিমি) এ পর্যন্ত অনুসন্ধান কূপ খনন করেছে ১৭০টি, অথচ বাংলাদেশে (১,৪৭,০০০ বর্গকিমি) অনুসন্ধান কূপের সংখ্যা মাত্র ৯৮টি।

সমুদ্রবক্ষে অনুসন্ধান কাজের ধারা আরো হতাশাব্যঞ্জক। ২০১২ সালে বাংলাদেশি মিয়ানমার সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পর থেকে আজ অবধি মিয়ানমারের সমুদ্রবক্ষে অনেক সংখ্যক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হলেও বাংলাদেশে তা হয়নি (পরবর্তী স্লাইডে ম্যাপ লক্ষ করুন)।

তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক  আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘আজকে আমরা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে যে সংকটটা দেখতে পাচ্ছি এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে কেন্দ্র করে পুরো অর্থনৈতিক যে সংকট তৈরি হয়েছে, এটা খুব আকস্মিক বা হঠাৎ করেই হয়েছে বিষয়টা এমন না। যে সংকট এখন তৈরি হয়েছে এটা তৈরি করার মতোই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ’ 

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলছেন বিদ্যুৎ খাতে আমাদের প্রচুর ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে নাগরিক থেকে প্রশ্ন করা হচ্ছে সরকার যে ভর্তুকি দিচ্ছে এই ভর্তুকির সুবিধা কারা পাচ্ছে? গত ১১ বছরে এ রকম টাকা দেওয়া হয়েছে ৯০ হাজার কোটি টাকা। দেশি-বিদেশি ১২টা এ রকম কম্পানিকে টাকা দেওয়া হচ্ছে। ’ 

দেশ এখন খাদের কিনারে বলে মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘আমরা সংকটের মধ্যে আছি। আরো ভয়াবহ সংকটের দিকে যাব। আমরা খাদের কিনারায় এসে গিয়েছি, জানি না এর পরিণতি কী হবে। ’

তিনি বলেন, ‘দেশে এখন চলছে ভাই-ব্রাদার তন্ত্র। সেই সঙ্গে আছে মতলববাজির উন্নয়ন। যার মধ্যে আমরা নিপতিত হয়েছি। ’

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি বলেন, ‘জ্বালানির সংকট আমাদের অনিবার্য ছিল না। এটা অনিবার্য করে তোলা হয়েছে।    একসময় বলা হয়েছিল বাংলাদেশ গ্যাসের ওপরে ভাসছে। এর পেছনে একটা উদ্দেশ্য ছিল, গ্যাসটা রপ্তানি করা। এরপর বলা হলো আমাদের গ্যাস নাই এবং পাওয়ার সম্ভাবনাও অনেক কম। যদিও সরকার ২০১০ সালে নরওয়ে আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে যেই সনদটা করেছিল সেখানে শুধু স্থলভাগেই ৩৪ থেকে ৩৮টি গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। ’

 তিনি বলেন, ‘২০১২ সালে সমুদ্র বিজয়ের পর সেখানেও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। এর পরও বলা শুরু করল যে গ্যাস পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো আমাদের পুরো ব্যবস্থাটাকে আমদানিনির্ভর করে তোলা। ’



সাতদিনের সেরা