kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

বাস মালিকদের সামনে সবাই দুর্বল

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই পাল্লা দিয়ে বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়। সেবার মানসহ অন্য সব দিক বিবেচনায় ভাড়া বাড়ানোর হার কতটুকু যৌক্তিক হয়, এসব নিয়ে কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজিব ঘোষ

১৪ আগস্ট, ২০২২ ০৮:১৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাস মালিকদের সামনে সবাই দুর্বল

কালের কণ্ঠ : বাসের বর্ধিত ভাড়া কতটুকু যৌক্তিক হলো?

হাদিউজ্জামান : যখনই ডিজেলের দাম বাড়ে তখনই ভাড়া বাড়ানো হয়। শুধু ২০১৩ সালে ডিজেলের দাম বাড়ার পর ভাড়া বাড়ানো হয়নি। সম্প্রতি তেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে যে ভাড়াটা বাড়ল, কাগজে-কমলে যৌক্তিক। তবে বাস্তব প্রেক্ষাপটে একেবারেই অযৌক্তিক।

বিজ্ঞাপন

কারণ এই ভাড়া যখন নির্ধারণ করা হয়েছে, তখন ১৮টি খাতে খরচ দেখানো হয়েছে। এই খাতের খরচ এমনভাবে দেখানো হয়েছে, যাতে বোঝা যাচ্ছে যাত্রীরা উন্নত সেবা পাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা তো এমন নয়। উন্নতমানের সেবা যদি যাত্রীরা পেত, তাহলে নির্ধারিত ভাড়া বাস্তবে যৌক্তিক হতো। কাগজে খরচের খাত বিলাসী হলেও যাত্রীরা নিম্নমানের সেবা পাচ্ছে।

কালের কণ্ঠ : তাহলে কি বাসের ভাড়া নির্ধারণের প্রক্রিয়াটা অস্বচ্ছ? সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি কই?

হাদিউজ্জামান : প্রাথমিকভাবে তিনটি অংশ তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বাসভাড়া বৃদ্ধি এবং নতুন ভাড়া বাস্তবায়ন—এই তিনটি ধাপেই অস্বচ্ছতা আছে। কারণ যারা আসলে বাসভাড়া নির্ধারণ করছে, কমিটিতে দর-কষাকষি করছে, তারা (সরকারি কর্তৃপক্ষ) বাস মালিকদের সামনে অনেকটাই দুর্বল। ফলে মাঠের বাস্তবতা মাথায় নিয়ে যে হারে ভাড়া নির্ধারণ করার কথা, সে হারে তারা পারছে না। বাস মালিকদের সামনে বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ), ডিটিসিএ (ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ), ভোক্তা অধিকারসহ অন্য যারা অংশীজন আছে, তারা দুর্বল।

কালের কণ্ঠ : কেন দুর্বল?

হাদিউজ্জামান : কারণ হচ্ছে, যাঁরা এই ভাড়া নির্ধারণ কমিটিতে বসে আছেন, বিশেষ করে বাস মালিকরা, তাঁরা নিজেরাই তো সুবিধাভোগী। যাঁরা সুবিধাভোগী তাঁরাই বাসভাড়া নির্ধারণ করছেন! আবার তাঁরাই সরকারের মধ্যে বসে আছেন এবং এটা হচ্ছে ভাঙতে না পারার মতো শক্তি। এ কারণেই অতিরঞ্জিত খরচ দেখিয়ে বাসভাড়া বাড়ানো যায়। যেমন—নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। অথচ আমাদের বাসে জানালা ভাঙা, লুকিং গ্লাস নেই, ইন্ডিকেটর নেই, সিট কভার ময়লা। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হলে তো এসব সমস্যা থাকত না। তাঁরাও জানেন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না, তবু এমন অনেক খাতে খরচ দেখানো হয়েছে।

কালের কণ্ঠ : কমিটিতে যাত্রীদের পক্ষে কথা বলার কেউ আছে?

হাদিউজ্জামান : জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একজনকে দিয়েই এখানে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া যাত্রীদের জন্য কথা বলার কেউ নেই। তবে যাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধি থাকা দরকার। কমিটিতে বাস মালিক ছাড়া সবাই দুর্বল। বাস মালিকরা সরকারের পক্ষে আছেন, তাঁর সুবিধাভোগী। তাঁরাই আবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কমিটিতে বসে আছেন। একটি চক্র এতটাই শক্তিশালী, সেটা ভাঙা যাচ্ছে না।

কালের কণ্ঠ : সরকারের ব্যর্থতা কোথায়?

হাদিউজ্জামান : গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রে উন্নত দেশে সরকার থাকে। সরকারের দায়িত্ব হলো সব কিছু ঠিক করে দেওয়া। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা হচ্ছে না। পরিচালন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যাঁরা আছেন, তাঁদের উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা করে আসা দরকার। তাহলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাবে। আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় কোনো ব্যাবসায়িক মডেল নেই। এ জন্যই এমন দুষ্টচক্র নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু ব্যাবসায়িক মডেল নিয়েই তো বাস রুট রেশনালাইজেশনের অধীনে ঢাকা নগর পরিবহনের পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হলো, আমরা কি তাতে সুফল পাচ্ছি?

হাদিউজ্জামান : সুফল পাচ্ছি না। কারণ হলো, আমরা সেটাও শতভাগ বাস রুট রেশনালাইজেশনের ধারণার মতো পরিচালনা করতে পারছি না। ওই রুটে অন্য কোনো বাস চলার কথা ছিল না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এমনকি রুট পারমিটবিহীন অবৈধ বাসও ওসব রুটে চলছে।

কালের কণ্ঠ : বিআরটিএ যেসব অভিযান পরিচালনা করছে সেগুলো কী পর্যাপ্ত?

হাদিউজ্জামান : পর্যাপ্ত নয়। যদি পর্যাপ্ত হতো তাহলে অসংখ্য রুট পারমিটবিহীন বাস চলতে পারত না। তাদের মনিটরিং ব্যবস্থায় কমতি আছে।

কালের কণ্ঠ : সব কিছু মিলিয়ে গণপরিবহনের এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় কী?

হাদিউজ্জামান : আমাদের কোনো গণপরিবহন কর্তৃপক্ষ নেই। এটা করা দরকার। গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ, নগরবিদ ও ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারকে পরিকল্পনায় আরো যুক্ত করতে হবে। সব কিছু বাস মালিকরা ঠিক করতে পারেন না। ঢাকা শহরে বাস চলার রাস্তাই আছে মাত্র আড়াই শতাংশ, সেটাও একটা কারণ। অনেকেই পদাধিকারবলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আর গণপরিবহনকে রাজনীতিমুক্ত করা দরকার।



সাতদিনের সেরা