kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

চিম্বুকে পাঠাগার ও ম্রোদের অস্তিত্বের সংগ্রাম

আবু তাহের খান   

১৪ আগস্ট, ২০২২ ০৩:৫০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চিম্বুকে পাঠাগার ও ম্রোদের অস্তিত্বের সংগ্রাম

বাংলাদেশ প্রধানত সমতল ভূমি নিয়ে গঠিত হলেও এর প্রায় ১০ শতাংশ এলাকাজুড়ে রয়েছে পাহাড়। আর নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীই মূলত ওই পাহাড়ি এলাকার প্রধান বাসিন্দা। সাম্প্রতিক সময়ে অন্য ধারার লোকজনের আবাসও সেখানে ক্রমেই জোরদার হয়ে উঠেছে। উল্লিখিত পাহাড়ি এলাকায় বর্তমানে প্রায় ২৭টি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকজন বসবাস করছে।

বিজ্ঞাপন

এসব নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমা ছাড়া বাদবাকি গোষ্ঠীগুলোর বেশির ভাগ মানুষ লেখাপড়া ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত পশ্চাৎপদ এবং তাদের বেশির ভাগ সদস্যই মানবেতর অবস্থার ভেতর দিয়ে জীবন যাপন করছে। এর মধ্যেও আবার সর্বাধিক মানবেতর অবস্থার মধ্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী হচ্ছে বান্দরবানের ম্রোরা, যাদের মধ্যে রাষ্ট্রস্বীকৃত আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রচলন না থাকলেও নিজস্ব ম্রো ভাষায় প্রাথমিক পাঠ গ্রহণের রীতি চালু রয়েছে। আর সেই রীতির ওপর ভর করেই তাদের শিক্ষার আলোয় খানিকটা হলেও আলোকিত করে তোলার লক্ষ্যে চিম্বুক পাহাড়ের রামরিপাড়ায় সম্প্রতি একটি পাঠাগার গড়ে তুলেছেন ম্রো ভাষার লেখক ইয়াংঙান ম্রো। গত ৫ আগস্ট চিম্বুকের চূড়ায় স্থাপিত ওই গ্রন্থাগারের উদ্বোধন করেন তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা লংঙি ম্রো। এ নিয়ে—পাহাড়চূড়ায় ‘গল্পের ঘর’ শিরোনামে একটি ফিচারও ছাপা হয়েছিল কালের কণ্ঠের অবসরে পাতায়।

বিশ্বজুড়েই সাম্প্রতিক সময়ের একটি বহুল আলোচিত প্রসঙ্গ এই যে পৃথিবী থেকে বহু জাতিগোষ্ঠী যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভাষাও। ভাষা হারিয়ে যাওয়ার এ ঘটনা দূর-অতীতের তুলনায় নিকট-অতীতেই ঘটেছে বেশি হারে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার নিষ্ঠুর মুনাফার আগ্রাসী থাবার নিচে পড়ে গত কয়েক শ বছরে পৃথিবী থেকে যে ভাষাগুলো হারিয়ে গেছে, সেটি শুধু কিছু লিপি বা উচ্চারিত শব্দের বিলুপ্তি মাত্র নয়, একই সঙ্গে তা মানুষের যাপিত জীবনের আচার, মূল্যবোধ, সৌন্দর্য ও অধিকারেরও বিলুপ্তি। বস্তুত মুনাফাকে একচ্ছত্র ও লাগামহীন করতে গিয়েই শেষোক্ত ওই মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলোর বিলুপ্তি সাধন করা হয়েছে এবং ১৯৯০ দশকের গোড়ায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর থেকে সেই ধারা আরো বেগবান হয়েছে। আর বিলুপ্তমানতার ঝুঁকিতে থাকা সেসব ভাষা এবং ওই সব ভাষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লিখিত ম্রোরাও রয়েছে বৈকি!

উল্লিখিত পরিস্থিতিতে বিলুপ্তমানতার ঝুঁকিতে থাকা ম্রো জনগোষ্ঠীর ভাষাকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যেই বস্তুত চিম্বুকের চূড়ায় ইয়াংঙান ম্রোর পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ। ওই পাঠাগারের তরুণ শিক্ষার্থী-পাঠকরা সেখানে রাষ্ট্রস্বীকৃত আনুষ্ঠানিক ভাষায় রচিত বইপত্র পড়ার পাশাপাশি ম্রো ভাষা এবং সেই ভাষায় রচিত পুস্তকাদিও যে পড়তে পারবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আর সেই কার্যক্রমকে সেখানে ধারাবাহিক ও জোরদার করতে পারলে ঝুঁকিতে থাকা ম্রো ভাষা প্রকৃতপক্ষেই অনেকখানি শক্তি খুঁজে পাবে। ফলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের উচিত হবে উল্লিখিত গ্রন্থাগারের কার্যক্রমকে সহযোগিতাদানের পাশাপাশি বাংলাদেশের অপরাপর নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ভাষাকে টিকিয়ে রাখা এবং সেসবের বিকাশের লক্ষ্যে অনুরূপ সহযোগিতা নিয়ে তাদের পাশে গিয়ে হাজির হওয়া। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের এ পর্যন্ত সময়ের ভূমিকা কি এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত?

আপাতদৃষ্টে মনে হতে পারে, ম্রোপল্লীতে পাঠাগার স্থাপনের মাধ্যমে ইয়াংঙান ম্রো বস্তুত তাঁর নিজ জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটিই শুদ্ধ জ্ঞানচর্চার অংশ হিসেবে করে যাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি এটা যতটা না করছেন জ্ঞান ও সংস্কৃতিচর্চার অংশ হিসেবে, তার চেয়ে অনেক বেশি করছেন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম হিসেবে। বস্তুত বাংলাদেশের অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীই এখন সেই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত। এই যে কয়েক মাস আগে নিজেদের সামান্য ফসলের জমিতে পাম্পচালকের অসহযোগিতায় সেচজল দিতে না পেরে আত্মহত্যা করলেন নওগাঁর দুই সাঁওতাল কৃষকভ্রাতা কিংবা ইকোপার্ক স্থাপনের নামে গারো কৃষকদের তাঁদের জমি থেকে ওই যে উচ্ছেদ করা হলো মধুপুরে ইত্যাদি ঘটনা বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের ঝুঁকিতে থাকা জীবনেরই দু-একটি উদাহরণ মাত্র। ইয়াংঙান ম্রোকে অভিনন্দন সেই ঝুঁকি মোকাবেলার অস্ত্র হিসেবে পাঠাগারকে বেছে নেওয়ার জন্য। চিম্বুক চূড়ার এই পাঠাগার ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের সব আদিবাসী জনপদে, পাহাড়ে ও সমতলে ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : সাবেক পরিচালক, বিসিক
শিল্প মন্ত্রণালয়
[email protected]



সাতদিনের সেরা