kalerkantho

রবিবার । ২ অক্টোবর ২০২২ । ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

মতিঝিলে টিপু হত্যা নিয়ে ডিবি

চার্জশিটের প্রস্তুতি, জানা গেছে সব তথ্য

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৩ আগস্ট, ২০২২ ০৩:০৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চার্জশিটের প্রস্তুতি, জানা গেছে সব তথ্য

জাহিদুল ইসলাম টিপু

রাজধানীর মতিঝিলের আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যায় কারা জড়িত, কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড—চার মাসের তদন্তে সব তথ্য উদ্ঘাটনের কথা জানিয়েছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।

গত ২৪ মার্চ রাতে রাজধানীর শাহজাহানপুরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর শ্যুটার মাসুমকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিম। পরে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন মাসুম।

বিজ্ঞাপন

মাসুমের স্বীকারোক্তিতে হত্যার ষড়যন্ত্রে উঠে আসে অনেকের নাম। তদন্তেও নতুন গতি আসে, যা শেষ হয়েছে চার মাসে।

তদন্তের বিষয়ে ডিবির ভাষ্য, এ পর্যন্ত ২২ জনকে টিপু হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডে তাঁরা প্রত্যেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে এ ঘটনার নেপথ্য কারণ সম্পর্কেও অনেকটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাই শিগগিরই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।    

গ্রেপ্তারের পর রিমান্ড শেষে এই ২২ জন এখন কারাগারে। তাঁরা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিককে টিপু হত্যার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের মদদদাতা হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তাঁরা ঘটনার পরিকল্পনাকারী হিসেবে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের নাম বলেছেন।

এ বিষয়ে টিপু হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট এক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তদন্তে মতিঝিল এলাকার সব দলের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিশেষ যোগাযোগ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এলাকার অপরাধীরা বেপরোয়া হওয়ার নেপথ্যে ঠিকাদারি, চাঁদাবাজিসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট আরো অনেক বিষয় রয়েছে। ২২ জনই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের প্রতিনিধি হিসেবে এলাকায় তৎপর অনেক দিন। তাঁরা গ্রেপ্তার হওয়ায় ওই সন্ত্রাসীরা এখন নতুন প্রতিনিধি খুঁজছেন।

গোয়েন্দা প্রতিনিধির এই তথ্যের সূত্র ধরে মতিঝিল এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা পাওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক শীর্ষ নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মতিঝিল এলাকার রাজনৈতিক নেতারা বরাবরই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে চলেন। তাঁদের সব সময় আড়াল থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁদের কথা না শুনলে খুন হতে হয়। এর বড় উদাহরণ টিপু। ’

টিপু হত্যার পর পুরো মতিঝিল এলাকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘টিপু হত্যার পর এখানকার রাজনীতি পুরো এলোমেলো হয়ে গেছে। গত চার মাসে একের পর এক আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা ধরা পড়ায় এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। একই সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী এলাকার আধিপত্য

ধরে রাখতে নতুন প্রতিনিধি নিয়োগ করেছেন। তাঁদের সঙ্গে না থাকলে আরো অনেককে হত্যার হুমকিও দিচ্ছেন বলে তথ্য পেয়েছি। একে তো পুলিশের ভয়, তার ওপর সন্ত্রাসীদের হুমকি পেয়ে অনেকে এরই মধ্যে এলাকা ছেড়েছেন। ’

এলাকার চার আওয়ামী লীগ নেতাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের আরো কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় অনেক রাজনৈতিক নেতার পাশাপাশি শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও মানিকের সঙ্গে টিপুর দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ছিল। বিশেষ করে এলাকার আধিপত্য, ঠিকাদারিসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্বের কারণে টিপুকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে হত্যা করা হয়। এখন নতুন করে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা অন্তত ২১ জন প্রতিনিধি নিয়োগ করেছেন বলে জানতে পেরেছেন তাঁরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবি সূত্র জানায়, টিপু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অতি সম্প্রতি যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁদের একজন ছাড়া অন্যরা মতিঝিলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। অনেকে আগে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদে ছিলেন। আরো অনেকে তাঁদের নজরদারির মধ্যে রয়েছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও মানিকের প্রতিনিধি কিছু রাজনৈতিক নেতার যোগসাজশে টিপুকে হত্যা করা হয়।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকের ভাষ্য, মতিঝিল এলাকায় যেসব রাজনৈতিক নেতার ভবিষ্যৎ ছিল, তাঁদেরকেও এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এতে এলাকার আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীদের ‘পথ অনেকটা পরিষ্কার’ হয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, ‘এটি স্পর্শকাতর ঘটনা। তদন্তে অনেক দূর এগিয়েছি আমরা। পারিপার্শ্বিকতা, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে যাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি, তাদেরকে এখন পর্যন্ত আমরা গ্রেপ্তার করেছি। ’

রিমান্ড শেষে কারাগারে সবাই

ডিবি সূত্র জানায়, টিপু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে এ পর্যন্ত যে ২২ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই কোনো না কোনো অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্যও রয়েছে। মতিঝিল এলাকার আধিপত্য, টেন্ডারবাজি ও রাজনৈতিক পদ-পদবি নিয়ন্ত্রণের জন্য টিপুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। নেপথ্যে থেকে পুরো হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন পলাতক দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও মানিক।

টিপু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সর্বশেষ গত শনি ও রবিবার (৩১ ও ১ জুলাই) রাতে নতুন করে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাবেক সেক্রেটারি সোহেল শাহরিয়ার, ১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি মারুফ রেজা সাগর, একই ওয়ার্ডের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আরিফুর রহমান সোহেল ওরফে ঘাতক সোহেল, মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান টিটু, মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক খায়রুল আলম ও এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া জাতীয় পার্টির নেতা জুবায়ের আলম রবিন কমলাপুর এলাকার প্রগতি সংঘের সভাপতি। টিপুকে হত্যার আগে ওই ক্লাবেই বৈঠক হয়েছিল।



সাতদিনের সেরা