kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ অক্টোবর ২০২২ । ২১ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা জরুরি

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

অনলাইন ডেস্ক   

১২ আগস্ট, ২০২২ ০৪:০৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা জরুরি

আজ আন্তর্জাতিক যুব দিবস। প্রতিবছর এই দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো—‘Intergenerational Solidarity : Creating a World for All Ages’। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে এখন জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর তাদের সংখ্যা চার কোটি ৫৯ লাখ। সাধারণ হিসাবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের তরুণ-যুবক জনগোষ্ঠী ধরা হলে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগই এখন তরুণ যুবগোষ্ঠী। বাংলাদেশে তরুণ জনগোষ্ঠী সংখ্যায় বিশাল হলেও তাদের কতটা ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে যেকোনো দেশের যুবসমাজ সেই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। যুবসমাজই একটি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।
জনশুমারির প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কিছুটা হ্রাস পেলেও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে। আবার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে তরুণ-যুবারা। তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকালে অবস্থান করছে। এখন দেখার বিষয় হলো কর্মক্ষম এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে সত্যিকার অর্থেই যথাযথ কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে কি না।

বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে যুবশক্তিকে যথাযথভাবে জনশক্তি হিসেবে কাজে লাগানো যায়নি। এর কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রমবাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত যুবক প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সে অনুপাতে সরকারি-বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়া।

আমরা সবাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রত্যাশা করি। কিন্তু কিভাবে সেই উন্নয়ন হবে তা নিয়ে যথাযথ পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন হওয়া না হওয়া নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপিত হচ্ছে। এ নিয়ে আমরা বেশ আনন্দিত। এতে প্রচুর পরিমাণ স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি এতে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কিন্তু সেই কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণের জন্য আমাদের দেশের যুব সম্প্রদায় কি যথেষ্ট প্রস্তুত আছে? তারা কি নিজেদের দক্ষভাবে গড়ে তুলতে পেরেছে? মূলত দক্ষ জনশক্তিই এ ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশীজন হতে পারে। শুধু সংখ্যা বিবেচনায় তরুণদের কাজে লাগানো মোটেও সম্ভব হবে না। সেই যুবকদের কিংবা তরুণদের কাজে লাগানো যাবে, যারা মূলত দক্ষ।

বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন থেকে তরুণ যুবগোষ্ঠীকে দক্ষ করে তুলতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে আশানুরূপ ফলাফল আসেনি। গত ৩১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তাঁর কার্যালয়ে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) প্রথম বৈঠকের বক্তব্যে বলেন, সরকার চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, যুবসমাজকে তাদের নিয়মিত অধ্যয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে পরিবর্তনশীল বিশ্ব পরিস্থিতি মাথায় রেখে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমাজে তাদের অবস্থান যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে বজায় রাখতে পারে। কোনো মতে সার্টিফিকেট অর্জনের জন্য পড়াশোনা না করে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে শুধু ঘষে-মেজে বিএ, এমএ পাস করেই চাকরির পেছনে ছুটে বেড়ায়। তারা যেন স্বতঃপ্রণোদিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যই প্রমাণ করে দেশে যথেষ্ট পরিমাণ শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠী থাকলেও তারা প্রকৃতপক্ষে উন্নয়নের অংশীজন হওয়ার মতো দক্ষ নয়। যদিও এর মধ্যেই তরুণদের কাজে লাগাতে সরকার বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। শিক্ষায় জোর দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়। তবু দেশে উচ্চশিক্ষার মান নিয়েও বড় প্রশ্ন আছে।

উল্লেখ্য, গত ২৭ জুলাই রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে অর্থনৈতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সানেম’ ও উন্নয়ন সংস্থা ‘অ্যাকশন এইড, বাংলাদেশ’ ‘যুব জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ঝুঁকির উন্নয়ন নীতি এবং বরাদ্দ পরিকল্পনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের তথ্য মতে, দেশের বেকার ৭৮ শতাংশ শিক্ষিত তরুণ মনে করেন, তাঁরা চাকরি পাবেন না। তবে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে এই হার ৮৯ শতাংশ। ধনী পরিবারের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে অবশ্য মাত্র ১৯ শতাংশ এমন আশঙ্কায় ভুগছেন। এমন আশঙ্কার পেছনে দক্ষতার ঘাটতির বিষয়টিই সামনে আসে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যেসব দক্ষতা তরুণরা অর্জন করেন, তা চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শিক্ষিত তরুণ যাঁরা আছেন, তাঁদের মধ্যে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে—তা ওই গবেষণা তথ্য থেকেই পরিষ্কার ফুটে ওঠে।

এই লেখায় উপস্থাপিত তথ্যগুলোর আলোকে পরিষ্কার ধারণা করা যায় যে তরুণ-যুবদের মনে সব সময়ই নানা ধরনের হতাশা ও আশঙ্কা কাজ করে। তাদের এই শঙ্কা ও হতাশা দূর করতে হলে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং ব্যক্তিগতভাবে জোরালো উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক খাতে যুবসমাজের জন্য শুধু বরাদ্দ বাড়ানো নয়, সেটির যথাযথ ব্যবহার করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

দেশের চার কোটি ৫৯ লাখ তরুণ-যুবগোষ্ঠীকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলে দেশকে কোনোভাবেই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। কারণ এই তরুণগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি সৃজনশীল এবং কর্মক্ষম। তাদের সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন দ্রুততর এবং টেকসই করা সম্ভব। আর এ জন্য শুধু রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ নয়, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ যদি আগামী দিনের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে চায়, তাহলে অবশ্যই যুব সম্প্রদায়কে যথাযথ এবং দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার প্রতি আন্তরিক দৃষ্টি স্থাপন করতে হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]



সাতদিনের সেরা