kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ আগস্ট ২০২২ । ১ ভাদ্র ১৪২৯ । ১৭ মহররম ১৪৪৪

কর্মমুখী শিক্ষার আধুনিকায়ন জরুরি

ড. মো. শফিকুল ইসলাম   

৩ আগস্ট, ২০২২ ০৪:৪২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কর্মমুখী শিক্ষার আধুনিকায়ন জরুরি

কর্মমুখী শিক্ষা অর্থাৎ হাতে-কলমে শিক্ষাকে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সময় আসছে। কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কর্মমুখী শিক্ষাকে যত বেশি কার্যকর করা যায় তত বেশি দেশের উন্নয়নকে গতিশীল করা যাবে। আমরা শুধু হাজার হাজার ডিগ্রি দিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু আমরা কতটুকু কাজের সুযোগ করে দিতে পারি, সেই ক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যায়।

বিজ্ঞাপন

সবাইকে কিন্তু কর্মক্ষেত্র দিতে পারি না। আমাদের দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। সেখানে বিদেশি শ্রমিক কাজ করেন প্রায় পাঁচ লাখ, যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যাঁরা বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ৬০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স বাবদ নিয়ে যাচ্ছেন, যা আমাদের জন্য খুবই নেতিবাচক। এসব কর্মী ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এসে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় কাজ করেন। এটা হয়ে থাকে, কারণ  আমাদের দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন লোকের অভাব রয়েছে।

সরকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় চালু করেছে। কারিগরি বা কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য এই প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ বিষয় বিভাগ চালু করে। এগুলো বন্ধ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকনিক্যাল বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সরকার এবং আমাদের উচিত সব পেশাকে সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা। কারণ আমরা অনেকেই একজন ইলেকট্রিশিয়ানের পেশাকে অনেক নিচু মানের কাজ মনে করি। বাস্তবে কিন্তু তাঁর পেছনে সরকারের টাকা খরচ কম হয়। অন্যদিকে একজন শিক্ষার্থীকে হাজার হাজার টাকা খরচ করে মাস্টার ডিগ্রি করার পর বেকার থাকেন। তার মানে কী- রাষ্ট্রের টাকার অপচয় হচ্ছে। এসব বিষয়ে অধিকতরভাবে চিন্তা ও পরিকল্পনা করা সময়ের দাবি।

আজ যদি শিক্ষিত বেকারকে কারিগরি বা প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ বা দক্ষ করে তুলতে পারতাম, তাহলে আমাদের মেগাপ্রকল্পে বিদেশি শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর প্রয়োজন হতো না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে হবে এবং কর্মমুখী শিক্ষাকে বেশি আকর্ষণীয় করতে হবে। এর মাধ্যমে শুধু শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কমানো হবে তা নয়। বরং কর্মমুখী শিক্ষায় দক্ষ শ্রমিক বা শিক্ষার্থীকে বিদেশে পাঠিয়ে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দারিদ্র্যবিমোচনে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।

অনেকেই আবার কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অন্য পেশায় কাজ করেন, যা দেশের জন্য ক্ষতিকর। যেমন—ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়াররা বিসিএস দিয়ে সাধারণ ক্যাডারে জব করেন, যা খুবই দুঃখজনক। এটা মোটেই কাম্য নয়। তাঁদের পেছনে সরকার লাখ লাখ টাকা খরচ করে।

শিল্পে পরিবর্তন ও কাজের জন্য দক্ষতার নিরিখে কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেশি গুরুত্ব পাওয়া দরকার। জাপানে উচ্চতর বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নথিভুক্ত ছাত্র ২০ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ায় বৃত্তিমূলক বা প্রশিক্ষণ খাত এমনভাবে বিকশিত, যেখানে টারশিয়ারি শিক্ষার ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী জুনিয়র বা পলিটেকনিক কলেজে ভর্তি হন। চীনে বিশ্বের বৃহত্তম বৃত্তিমূলক বা কারিগরি শিক্ষা রয়েছে। যেখানে প্রায় ১১ হাজার ৩০০টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিবছর সেখানে মোট ৩০.৮৮ মিলিয়ন শিক্ষার্থী ভর্তি হন এবং ১০ মিলিয়ন শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। চীনের উন্নয়নের পেছনে তাদের এই নীতি অনেক বেশি কার্যকর মনে হচ্ছে।   

সেখানে বাংলাদেশে এই হার অনেক কম। তাই আমাদের করণীয় হলো বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা নিশ্চিত ও দারিদ্র্য হ্রাস করা ইত্যাদি। এর মানে এই নয় যে কারিগরি শিক্ষার সংস্কার, মানে কারিগরি শিক্ষার আকার প্রসারিত করা। বরং প্রসারের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার মান উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ছে। কর্মমুখী বা কারিগরি শিক্ষায় বেশি শিক্ষার্থী যাতে ভর্তি হন সে বিষয়ে আমাদের কার্যক্রম প্রসারিত ও উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। উদ্যোগ গ্রহণ করলেই হবে না, তা যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে। তাহলেই দেশের টেকসই উন্নয়ন করা সম্ভব।   

এটা স্পষ্ট যে উন্নত দেশগুলোর কর্মমুখী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছে। কিন্তু জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও অভূতপূর্ব বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার আবির্ভাবের ফলে প্রতিটি দেশ কিছুটা পরিবর্তনের সম্মুখীন হচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন আনতে হবে, যা দেশের জিডিপি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে। সচেতন ও শিক্ষিত অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তাঁদের উচিত সন্তানকে সাধারণ বা গতানুগতিক কোনো বিষয়ে লেখাপড়া না করিয়ে কর্মমুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ



সাতদিনের সেরা