kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

ছুটির দিনগুলো বেহাত হয়ে গেছে

হায়দার মোহাম্মদ জিতু   

২৪ জুলাই, ২০২২ ০৪:৩৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ছুটির দিনগুলো বেহাত হয়ে গেছে

ক্ষেত্র অনুযায়ী রাজনীতির চরিত্র, ভাষা ও আচরণ ভিন্ন হয়। সেই সঙ্গে বদল হয় প্রতিপক্ষের আক্রমণ তরিকা। উদাহরণ হিসেবে মির্জা গালিব প্রসঙ্গ আসতে পারে। এই পাঠকপ্রিয় কবি ও দার্শনিককে অপ্রিয় করা এবং দাবিয়ে রাখার জন্য তাঁর রচনাকে ওই সময়ের সাহিত্য প্রতিযোগীরা দুর্বোধ্য লেবেল লাগিয়ে প্রচার করার সর্বাত্মক ব্যবস্থা করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

তাঁরা সফল হলে মির্জা গালিবকে হারাতে হতো। নিরীক্ষার বিষয় হলো, সেই টেনে ধরার কৌশল বাস্তবায়নের জন্য পাল্টা কিছু সাহিত্য রচনা করা হয়েছিল।

কিন্তু এখনকার বাস্তবতা বড় অদ্ভুত। বিস্তৃত অর্থে, কিম্ভূতকিমাকার, কদর্য। কারণ এখন সব কিছুকে শক্তি প্রয়োগ করে মোকাবেলা করার প্রবণতা দেখা যায়। এর বাইরে যে বিষয়টি প্রবল সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে, তা হলো সর্বস্তরে সব্যসাচীদের উৎপাত। কবিরা বিজ্ঞান নিয়ে মনগড়া মন্তব্যে নেমেছেন। শিল্পীরা রাজনীতিতে নামতে উতলা হয়ে উঠছেন। রাজনীতিবিদদের মনোযোগ অর্থ-ব্যবসা ও মুখরোচক সমালোচনায়। ব্যবসায়ীরা ব্যবসার আখের গুছিয়ে নিয়ে বসতে চাইছেন ছোট-বড় গদিতে। কেউ কেউ দায়িত্বকে ক্ষমতার লেবেনচুস বানিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখতে নোংরা খেলায় মেতেছেন।

খেলোয়াড়দের মনোযোগ বিজ্ঞাপন, সিনেমায়। অর্পিত দায়িত্ব পালনের চেয়ে ফ্রেন্ডলি খেলাধুলায় কিংবা চেয়ারের পেছনে ছুটতে ব্যস্ত দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। গুরুজনরা বিজ্ঞান, গবেষণার ধারে না ঘেঁষে ছুটছেন পদের পেছনে। অন্যদিকে সৃজনশীলতাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে পাইরেসির আফিমে মগজ ধোলাই করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো গবেষকরা বিদেশে ছুটছেন। কারণ বিজ্ঞানকে মোকাবেলা করতে একদল প্রতিক্রিয়াশীল নেমেছেন বিশ্বাস দিয়ে তাকে ধরাশায়ী করতে, কিন্তু আদতে দুটি দুই বিষয়। এই বিষয়গুলোকে পক্ষে-বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেশের অভ্যন্তরে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টিরও পাঁয়তারা চলছে।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বিশ্বের কাছে বিস্ময়কর, অনুসরণীয়। কিন্তু এই যে সমন্বিত এগিয়ে আসা কিংবা এগিয়ে চলার পথ, এটিকে কাছে-দূরের বহু ব্যবস্থাই মেনে নিতে পারেনি, পারছে না। এ কারণে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হওয়া দেশের রক্ত-রন্ধ্রে প্রতিক্রিয়াশীলতা, উগ্রতা ঢুকিয়ে এখানে এক ধরনের ধর্মান্ধতাকেন্দ্রিক উন্মাদনা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে।

এত এত প্রতিক্রিয়াশীলতা, ধর্মান্ধতা সবই তো সমস্যা। তবে এর থেকেও মুক্তির পথ আছে, যদিও তা কঠিন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই ‘কঠিনেরে’ ভালোবাসাও সম্ভব। জাতির জীবনে বেহাত হওয়া ছুটির দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে পারলেই সেটি সম্ভব। সে জন্য সাংস্কৃতিক শূন্যতাকে ভাগাড়ে পাঠাতে হবে। গ্রামীণ জীবনে ছুটির দিনকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আয়োজন, উঠান গল্প, একসঙ্গে বসে নাটক-সিনেমা দেখা, পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া—এই বিষয়গুলো ফিরিয়ে আনতে হবে।

উৎসব হিসেবে আরোপিত ভিনদেশি আয়োজন হটিয়ে নিজেদের নৌকাবাইচ, পুতুলনাচ, আউল-বাউল সংস্কৃতি চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে। শহুরে সংস্কৃতিতে অবশ্যই পার্ক, বিনোদনকেন্দ্র এবং সিনেমা হলকেন্দ্রিক সুস্থ বিনোদনের আচরণ ফিরিয়ে আনতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ড এনে দিয়েছেন। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা এনেছেন অর্থনৈতিক মুক্তি, যদিও ক্ষেত্রবিশেষে পিতার চেয়েও কন্যার পথ অতি দুর্গম। কারণ বঙ্গবন্ধু একটি লড়াকু মধ্যবিত্ত শ্রেণি পেয়েছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার এই সময়ে আপস ও ভোগবাদী চিন্তাকারীর সংখ্যাই বেশি। তাদের ভিড় শিল্পকলা একাডেমি চত্বর নয়, শপিং মলমুখী।

ইউরোপের রেনেসাঁ বা জাগরণের যুদ্ধে মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু এটি এখন এখানকার ক্ষেত্রে তা কিছুটা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কারণ এখানকার মধ্যবিত্ত ৫০ বা ১০০ টাকা দিয়ে বই না কিনে ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা লোন নিয়ে আইফোন কেনে! অর্থাৎ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চলা অর্থনৈতিক মুক্তির পথে সরাসরি বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পেরে কৌশলে জনগণের মধ্যে ভোগের মাত্রা বাড়ানোর মার্কেটিং চলছে। আয়ের চেয়ে ক্রয়ক্ষমতাকে ঊর্ধ্বমুখী করে টেনে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ ভেতরে ভেতরে একটি ঋণগ্রস্ত জাতি বিনির্মাণের পরিকল্পনা প্রতীয়মান। এটি করতে পারলে মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। কারণ ঋণগ্রস্ত মানুষের চিন্তা নিম্নমুখী হয়ে থাকে।

জাতিকে এই ভোগের সীমানায় নিয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে এখানকার সাংস্কৃতিক শূন্যতা অর্থাৎ বেহাত হওয়া ছুটির দিনগুলোকে টার্গেট করেছে প্রতিপক্ষ। চোখের সামনে আয়ের চেয়ে ক্রয়ক্ষমতাকে ঊর্ধ্বমুখী করে তেলা হচ্ছে। ফলাফল, চিন্তা-চেতনা চলেছে ভোগের ভাগাড়ে। এর থেকে মুক্তির একমাত্র পথ নিজেদের লাগাম নিজেরা টেনে ধরা। ভোগবাদিতার চাকচিক্য হটিয়ে বাঙালির প্রাণ সহজিয়া সংস্কৃতির সাগরে পাড়ি জমানো। এটি করতে পারলে এখানকার ছুুটির দিনগুলো আবারও ফিরে আসবে। এতেই আসবে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এককথায় সার্বিক মুক্তি।

লেখক : প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ
[email protected]



সাতদিনের সেরা