kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৩০ সফর ১৪৪৪

বন্যা পরিস্থিতি

এখনো সড়ক যোগাযোগ চালু হয়নি অনেক উপজেলায়

♦ সিলেট-কুড়িগ্রামে আরো উন্নতি, তবে ভোগান্তি কমেনি
♦ সিরাজগঞ্জে যমুনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত

কালের কণ্ঠ ডেস্ক    

৩ জুলাই, ২০২২ ০৩:৩১ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



এখনো সড়ক যোগাযোগ চালু হয়নি অনেক উপজেলায়

বন্যায় সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বেশির ভাগ গ্রামের সড়ক তলিয়ে গেছে। তাই আয়-রোজগারের আশায় নৌকায় করে নিজেদের সিএনজিচালিত অটোরিকশা উপজেলা সদরে আনছেন দুই চালক। গতকাল তোলা। ছবি : শিপার আহমেদ

সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার সঙ্গে জেলা শহরের ৯টি উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ আছে। তবে বন্যায় শুধু একটি বাদে সব উপজেলার সঙ্গে জেলা শহরের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সড়ক থেকে পানি নেমে গেলেও ভাঙা-গর্ত থাকায় এখনো (গতকাল শনিবার পর্যন্ত) চারটি উপজেলার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ আছে।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৌর এলাকার রাস্তাগুলো ১৫ দিন পরও বন্যার পানির দুই-তিন ফুট নিচে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ জলাবদ্ধ অবস্থায় আছে পাঁচটি ওয়ার্ডের ১০ হাজারের বেশি মানুষ। হবিগঞ্জে বন্যায় সরকারি সড়কগুলো ভেঙে ২১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এতে জেলার যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এখনো অনেক রাস্তা বন্যার পানির নিচে।  

সিলেটে গতকাল দিনের পুরোটাই রৌদ্রোজ্জ্বল ছিল। আগের দিন থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত বেশির ভাগ নদীর পানি কমতে থাকায় জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে।

কুড়িগ্রামে ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে। তবে অর্ধশত চরের নিচু এলাকা এখনো বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদি পশুর খাদ্য সংকট প্রকট। কাজ করতে না পারায় আর্থিক সংকটে পড়ছে দিনমজুর পরিবারগুলো।

উজান থেকে আসা ঢল ও বৃষ্টির কারণে সিরাজগঞ্জ জেলায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদী তীর ও নিচু এলাকাগুলো আবার প্লাবিত হচ্ছে।   

সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ২০০ কিমি সড়ক এবং ১২০টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর এবং দোয়ারাবাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে কাজ চলছে। দুই-এক দিন পর স্বাভাবিক হবে। ’ সুনামগঞ্জ সড়ক ও সেতু বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম প্রাং বলেন, ‘দুদিন আগে আমরা দিরাই-সুনামগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুর সড়ক চালু করতে পেরেছি। এই দুটি সড়কের কয়েকটি স্থান স্রোতে ভেসে গিয়েছিল। সুনামগঞ্জ-দোয়ারাবাজার ও সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা চলাচল করতে পারছে। দুই-এক দিনের মধ্যে এই সড়কগুলোতে ভারী যান চলাচল চালু হবে বলে আশা করি। ’

সুনামগঞ্জে ভুক্তভোগীরা জানায়, গত ১৬ জুন রাতে জেলার সব প্রধান ও অভ্যন্তরীণ সড়ক ডুবে যায়। তীব্র স্রোতে স্থানে স্থানে সড়ক ভেঙে যায়। ফলে জেলা শহরের সঙ্গে শান্তিগঞ্জ বাদে অন্য উপজেলাগুলোর সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ-দিরাই, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ-দোয়ারাবাজার উপজেলার সড়কে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়। কোথাও কোথাও স্রোত সড়ক ভেঙে নিয়ে যায়। ৩০ জুন পর্যন্ত সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ-দিরাই সড়কের একাধিক স্থানে বালুর বস্তা ও কংক্রিট ফেলে সংযোগ স্থাপন করে কর্তৃপক্ষ। তবে এখনো সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ-দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর সড়কে সরাসরি বাস, মিনিবাস, ট্রাকসহ ভারী যান চলাচল করতে পারছে না। শুধু বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলায় মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা খুঁড়িয়ে চলাচল করছে। দোয়ারাবাজার ও জামালগঞ্জ উপজেলায় সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা যায়নি। জেলা শহর থেকে ভেঙে ভেঙে সড়কপথে যাতায়াত করছে সাধারণ মানুষ। তবে এখনো সব উপজেলায় নৌকায় চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে যাত্রীদের।

কুলাউড়া পৌর এলাকায় গত শুক্রবার থেকে বন্যার পানি কমছে। তবে তা খুবই ধীরে। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পৌর এলাকার মাগুরা ও থানা রোড, সাদেকপুর, সোনাপুর ও বেহালা, টিটিডিসি এরিয়া, উত্তর বাজার, আহমদাবাদ, নতুন পাড়া, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, দেখিয়ারপুর, শিবির, মনসুর এলাকা বন্যাকবলিত। এলাকার রাস্তাঘাটে দুই থেকে তিন ফুট পানি। বাসাবাড়িতেও পানি। অনেকে বাসা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছে। দীর্ঘ জলাবদ্ধতা থেকে পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে।

স্থানীয় আতিকুর রহমান, শিপন দেব, মাহবুব আলম, শাকির হোসেন বলেন, এখনো কোমর ও হাঁটু পানির মধ্যে চলাচল করতে হচ্ছে। পানিতে চুলকানিসহ নানা সমস্যা হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নতি ও পৌর এলাকায় যাতে হাওরের উপচে পড়া পানি ঢুকতে না পারে সে জন্য পৌর কর্তৃপক্ষকে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া উচিত।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ইয়াকূব তাজুল মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক রজত কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, যেভাবে হাকালুকি হাওরের গভীরতা কমছে ও নদী-খাল ভরাট হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতেও এমন বন্যা দেখা দেবে। কুলাউড়া পৌর এলাকার মরা গুগালিছড়া খালটি দখল-দূষণে বিলীনের পথে। অনেক ড্রেন খুবই সংকীর্ণ ও পুরনো। অনেক ড্রেনের পানি নামার পথ বন্ধ। খালটি উদ্ধার ও খনন করা খুব প্রয়োজন। পুরনো ড্রেন সংস্কারসহ প্রশস্ত করতে হবে। পাশাপাশি শহর রক্ষা বাঁধের প্রয়োজনীয়তা চিন্তা করা উচিত।

কুলাউড়া ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মঈনুল ইসলাম শামীম বলেন, এবারের বন্যায় সবচেয়ে দীর্ঘ সময় উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় আছে।

কুলাউড়া পৌরসভার মেয়র অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মরা গুগালিছড়া খালটি খননকাজ ডিসেম্বরে শুরু হবে। পানি নিষ্কাশনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রকল্পের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছি। শহর রক্ষা বাঁধেরও প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রকল্প আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে। ’

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রাম সদর ও উলিপুর উপজেলার চরাঞ্চলে পানিবন্দি রয়েছে অন্তত ৪০ হাজার মানুষ। প্লাবিত রয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকার পাট, ভুট্টা, বীজতলা, সবজিসহ ফসলের ক্ষেত। গতকাল কুড়িগ্রাম সদরের ধরলার চরসারডাবে গিয়ে দেখা যায়, এখনো অনেক ঘরবাড়িতে পানি। দুই দিনমজুর খোকা মিয়া ও দেলোয়ার হোসেনের ঘরে কোমরসমান পানি। তাঁরা ঘরে তালা দিয়ে আত্মীয়র বাড়িতে চলে গেছেন। কৃষক আব্দুল আউয়াল জানান, তাঁর এক বিঘা ক্ষেতের ব্রি ধান-২৯ পাকার আগেই পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। পচা শীষগুলো ভেসে উঠেছে। এই ধান আবাদে সাত হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পাশাপাশি ৫০ শতক জমির পাট নষ্ট হয়েছে, ভেসে গেছে খড়। গরুর খাদ্যসংকট প্রকট হওয়ায় তা বিক্রির কথা ভাবছেন তিনি। চরের ফর্দি মিয়া জানান, দুই সপ্তাহেও কোনো ত্রাণসামগ্রী পাননি। শনিবার বিকেলে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কিছু পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে।

সদর উপজেলার হলোখানা ইউপির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম রেজা বলেন, তাঁর ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় তিন হাজার পরিবারের মধ্যে দুই হাজার ১০০ পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের হাতে কাজ নেই। ভিজিএফ চাল দিলে বানভাসিদের ঈদের আনন্দে শরিক করা যেত।

সিলেট পয়েন্টে সুরমা নদী ছাড়া জেলার বাকি সব পয়েন্টে নদীর পানি কমেছে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় গতকাল পর্যন্ত পানি স্থানভেদে ছয় ইঞ্চি থেকে এক ফুট নেমেছে। পাউবো সিলেট সূত্রে জানা গেছে, কানাইঘাট পয়েন্টে নদীর পানি আগের দিনের তুলনায় ১৯ সেন্টিমিটার কমে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিপৎসীমার ৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

সিলেট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে। আগের দিনের তুলনায় গতকাল ২১ সেন্টিমিটার বেড়ে নদীর পানি সেখানে বিপত্সীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জকিগঞ্জের অমলসিদে কুশিয়ারার পানি ২৪ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বিয়ানীবাজারের শেওলা পয়েন্টে নদীর পানি ৯ সেন্টিমিটার কমে ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সারি নদীর পানি আরো ৪১ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৬৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

হবিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানায়, জেলায় তাদের রাস্তা রয়েছে ৩৩০ কিলোমিটার। এর মধ্যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৯ কিলোমিটার। ক্ষতির পরিমাণ ১৪০ কোটি টাকা।  

হবিগঞ্জ-বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ সড়কে সবচেয়ে বেশি ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া বাল্লা-জগন্নাথপুর-আউশকান্দি সড়কে ৩০ কোটি টাকা, লাখাই-বামৈ সড়কে ৩০ কোটি টাকা এবং বানিয়াচং-নবীগঞ্জ সড়কে ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এলজিইডি সূত্র জানায়, জেলায় তাদের মোট রাস্তা রয়েছে এক হাজার ৮৩৫ কিলোমিটার। এর মাঝে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৭৩ কিলোমিটার। ক্ষতির পরিমাণ ৫৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এ ছাড়া জেলায় এলজিইডির সড়ক সেতু রয়েছে ২৪ হাজার ৭০.৭৯ মিটার। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩০২ মিটার। ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি ৩৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। হবিগঞ্জ এলজিইডির জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী শফিকুর রহমান জানান, জরুরি ভিত্তিতে রাস্তাঘাট মেরামত না করতে পারলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে।

সিরাজগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, শনিবার সকাল থেকে যমুনার পানি শহরের হার্ডপয়েন্ট এলাকায় ২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপত্সীমার ৫৭ সেন্টিমিটার এবং কাজিপুর পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। গত বুধবার থেকে পানি বাড়ছে। তবে হার কম থাকায় বন্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই।

{প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট এবং সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি}



সাতদিনের সেরা