kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

বাজেট বরাদ্দ বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বাড়াতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ জুন, ২০২২ ২১:২৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাজেট বরাদ্দ বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বাড়াতে হবে

বিগত কয়েক অর্থ-বছর ধরে প্রতিবার স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য টাকার অংকে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও মোট জিডিপির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ অর্থ-বছরের বাজেটে তা দশমিক ৫ শতাংশ কমে গিয়েছে। মোট বাজেট বৃদ্ধি ও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায়ও এ বরাদ্দ কম। অন্যদিকে এ বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একেক ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা একেকরকম।  

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা জাতীয় সরকারের বরাদ্দের উপর নির্ভরশীল, নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহ ও সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে, আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ব্যতিরেকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। তাই করোনা-উত্তর আর্থ-সামাজিক পুনরুদ্ধারেও স্থানীয় সরকারকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। এরজন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে।  

আজ রবিবার প্রস্তাবিত বাজেটকে কেন্দ্র করে রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জাতীয় বাজেটে স্থানীয় সরকারের জন্য বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব বলেন। গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরামের চেয়ারপার্সন ও পিকেএসএফের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ’র সভাপতিত্বে এ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি। গভার্নেন্স এডভোকেসি ফোরামের সমন্বয়কারী মহসিন আলীর সঞ্চালনায় এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম।  

এ সভায় সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. জেবউননেছা; পরিকল্পনা কমিশনের রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অনুবিভাগের উপ-প্রধান মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান সরকার; ইউএনডিপির ডেমোক্রেটিক গভার্নেন্স পোর্টফলিওর প্রোগ্রাম এনালিস্ট মো. মোজাম্মেল হক; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ শাহান প্রমুখ।  

পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, আজকের এ আলোচনা আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আমাদের সক্ষমতাকেন্দ্রিক ও আমলাতান্ত্রিক বিন্যাসের অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় এগিয়ে আসতে হবে।

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, সরকারের দিক থেকে এ বিশ্লেষণকে মেনে নিয়ে এগিয়ে গেলে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।  

ড. আসিফ শাহান বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় লক্ষ করা য়ায়, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার কারণে আমালাতন্ত্র শক্তিশালী হচ্ছে। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক কোঅপারেশন প্রয়োজন, কনফ্লিক্ট নয়। বাস্তবতার আলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করে স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমাদের অগ্রসর হতে হবে।  

ড. জেবউননেছা বলেন, আমরা ক্ষমতার চেয়ারে বসলে জনগণের কথা ভুলে যাই। আমাদের এ মানসিকতা পাল্টাতে হবে— কেন্দ্র ও স্থানীয় উভয় পর্যায়ে। সকল ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। এলাকায় জাতীয় ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যেই সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, সেটাকে দূর করতে হবে।

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান সরকার বলেন, ২০৩০ সালে এসডিজি অর্জনের উদ্দেশ্যে সরকারের যে মাইলস্টোন রয়েছে, তা অর্জনে পরিকল্পনা অনুযায়ী সরকার অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এসডিজির স্থানীয়করণে সরকারের উদ্যোগ আরো বৃদ্ধি পাবে। এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটালাইজেশন ঘটেছে। বরাদ্দের জন্য জাতীয় সরকারের উপর স্থানীয় সরকারগুলোর নির্ভরতা আগের তুলনায় বেড়ে গেছে বিগত বছরগুলোতে, প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ভাগ। এখানে রাজস্ব বৃদ্ধি ও সেবার বিনিময়ে ফি গ্রহণ বা নিজস্ব অর্থায়নের ব্যাপারে নজর দিতে হবে স্থানীয় সরকারগুলোকে। স্বনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমেই বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাতে হবে। জাতীয় পরিকল্পনা ও স্থানীয় পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।     

মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে বেসিক ব্লক গ্রান্ট ও পারফরমেন্স গ্রান্ট দেয়া হয়। দক্ষতার ভিত্তিতে তারা দ্বিতীয় ধরনের বরাদ্দটি পায়। কিন্তু উপজেলা ও জেলা পরিষদ পর্যায়ে কীভাবে বাজেট খরচ হয় আমরা স্পষ্টভাবে জানি না। সকল ইউনিয়ন পরিষদ উপজেলা থেকে সমান বরাদ্দ পায় না। অর্থাত্ এখানে সমন্বয়ের অভাবে রয়েছে।  

মহসিন আলী বলেন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হলে জবাবদিহিতা বাড়বে, দুর্নীতি কমবে। দুর্নীতি বেশি হয় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে, বড় বড় প্রকল্পে। সে অর্থে স্থানীয় সরকার খুব কম সংখ্যক ও কম অঙ্কের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে চিন্ত্মা ভাবনার পরিধি বাড়াতে হবে।  

অমিত রঞ্জন দে বলেন, জাতীয় বাজেট এবং স্থানীয় বাজেট উভয় ড়্গেত্রে সমন্বয় এবং বাজেট বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দক্ষতার উন্নয়ন প্রয়োজন।

ড. কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতি এখন একাধারে করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও বৈষম্য, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন— এরকম বৈপরিত্যমূলক সঙ্কট ও সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে। এ পরিস্থিতিতে আর্থ-সামাজিক পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা, সামর্থ্য ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় সরকারকে সহযোগী ভূমিকা পালন করতে হবে, যথাযথ বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। বরাবরের মতো এ অর্থ-বছরেও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় তা ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা বেশি।  

যদিও মোট জিডিপির তুলনায় তা আসলে কমে গিয়েছে। উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদের বরাদ্দই কেবল বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ ২ শতাংশের আশেপাশে বা তারও কম থাকছে সাম্প্রতিককালে, যা খুবই অপ্রতুল। বাজেট বাসত্মবায়ন সড়্গমতার ক্ষেত্রে নগর স্থানীয় সরকারগুলো গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় এগিয়ে আছে। তিনি প্রস্তাব করেন, করোনা-উত্তর পুনরুদ্ধার কার্যক্রম এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর স্থানীয়করণে স্থানীয় সরকারকে যুক্ত করার পাশাপাশি গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রকৃতঅর্থে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বমর্যাদা ও সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।



সাতদিনের সেরা