kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

জাতির আবেগ ছুঁয়ে এলাম

এম নজরুল ইসলাম   

২৬ জুন, ২০২২ ০৩:৩৫ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জাতির আবেগ ছুঁয়ে এলাম

পদ্মা সেতু তো বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির এক আবেগের নাম। ‘একটি জাতি দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত’ প্রমাণ করতে দুর্ভাগ্যক্রমে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন এ দেশেরই কিছু মানুষ। সেই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ২৫ জুন শনিবার উদ্বোধন করা হলো পদ্মার বুকে মাথা তুলে দাঁড়ানো পদ্মা সেতু।

স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন হবে—এটা তো আগে থেকেই স্থির করা ছিল।

বিজ্ঞাপন

সেই দিনকে নিজের জীবনের সঙ্গে স্মরণীয় করে রাখতে পরিকল্পনা ছিল আগে থেকেই। পরিকল্পনামতো ভিয়েনা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হই ২৩ জুন সকালে। শুক্রবার ভোরে ঢাকায় পৌঁছে সকালেই কভিড টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি নিলাম। শনিবার খুব ভোরে পৌঁছে গেলাম মাওয়া প্রান্তে। সকালের আলো ফুটে ওঠার পর চারদিক ভালো করে তাকিয়ে দেখি। মাসখানেক আগেও এ এলাকায় এসেছিলাম, কিন্তু ২৫ জুন শনিবারের দিনটি তো অন্য রকম এক আবেগের দিন। সেই আবেগ ও অনুভূতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিতে এবং মানুষের উচ্ছ্বাসের সাক্ষী হতেই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বাংলাদেশে আসা।

স্বপ্নের পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। গড়ে উঠবে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা। দেশের মানুষের জন্য পদ্মা সেতু নিছক একটি বড় সেতু নয়, এটি দুঃসাহসী একটি স্বপ্নের নাম। যমুনা সেতু উত্তরবঙ্গ থেকে ‘মঙ্গা’ শব্দটি দূর করে দিয়েছে। এটিই যমুনা সেতুর একটি পরোক্ষ সুফল। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ অঞ্চলে গড়ে উঠবে পর্যটনকেন্দ্র। ঢাকা থেকে সরাসরি সেখানে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে যাবে। পণ্য পরিবহনে ব্যয় কমবে। বাড়বে বাণিজ্যিক গতি। লক্ষ্যে স্থির, বিপদে অবিচল থাকলে পাহাড়সম বাধাও যে ডিঙানো যায় তার বড় নজির পদ্মা সেতু প্রকল্প। অথচ এই সেতু নিয়ে দেশ-বিদেশে জল ঘোলা কম হয়নি। কম পড়েনি রাজনৈতিক খড়্গের আঘাত।

একটু পেছন ফিরে তাকানো যাক। ২০০১ সালের ৪ জুলাই বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের অনেক দিনের স্বপ্ন পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা আবারও সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নিয়োগ করা হয় পদ্মা সেতুর ডিজাইন কনসালট্যান্ট। ২০১০ সালে প্রিকোয়ালিফিকেশন দরপত্র আহবান করা হয়। এরপর ঘটনাবহুল সময় পেরিয়ে যায়। পদ্মা সেতুর মূল দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক নানা টালবাহানার পর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি স্থগিত করে এবং পরে চুক্তি বাতিল করে দেয়। এরপর নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘নিজেদের টাকায়ই আমরা পদ্মা সেতু গড়ব। ’

প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেওয়ার পরও সংশয় ছিল অনেকের মনে। এই সংশয়বাদীরা কী বলেছেন, সেদিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক। ড. আকবর আলি খান বলেছিলেন, বিশ্বব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের পক্ষে পরবর্তী সময়ে ঋণ সহায়তা পাওয়া খুব দুষ্কর হয়ে পড়বে। যখনই কোনো দাতা সংস্থা কোনো নতুন প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহী হবে, তারা দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশকে ভিন্ন চোখে দেখবে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছিলেন, ‘দুর্নীতি যে আমাদের পেছনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এবং দেশের উন্নয়নের ধারাকে নষ্ট করছে, এ ঘটনা তারই আরেকটি উদাহরণ। ’ বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার ১০ মাস পর যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগ এটিই প্রমাণ করে যে এ প্রকল্পে আসলেই দুর্নীতি হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, আবুল হোসেনের পদত্যাগ এটিই প্রমাণ করে যে দুর্নীতির সব অভিযোগ সত্য। তিনি যদি আরো আগেই পদত্যাগ করতেন, তাহলে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করত না। আলী ইমাম মজুমদার বলেন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিজেদের দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। দুদক যদি নিজেদের দায়িত্ব পালন করত, তাহলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিত না। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছিলেন, এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন, যা জোগান দিতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়বে। এর দায় সরকার এড়াতে পারবে না। তবে এ জন্য তাদেরও ভয়ংকর নতুন সমস্যায় পড়তে হবে। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই মুহূর্তে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু শুরু করা হলে দেশের অন্য সব অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য যে কাজগুলো করা যেত, সেগুলো আর হবে না।

প্রশ্ন তো উঠতেই পারে যে বিশ্বব্যাংক সরে গেল কেন? পদ্মা সেতুর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য প্রকৌশলী আইনুন নিশাত বলেছেন, বিশ্বব্যাংক পুরোপুরি রাজনৈতিক কারণে সরে গেছে। তাঁর মতে, সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারই এনে দিয়েছে সাফল্য।

বিশেষজ্ঞরাই বলছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক উৎপাদন, সেবা, পর্যটন, শিল্প-বাণিজ্যেও বিনিয়োগ বাড়বে। বাড়বে কর্মসংস্থান। আর সেটি হলে এখন যে জলবায়ু চ্যালেঞ্জের শিকার অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসে ঝুঁকিপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক কাজকর্ম করতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের সংখ্যা কমে আসবে। দক্ষিণ বাংলায় নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে।

পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ায় বাংলাদেশের লাভ হয়েছে মন্তব্য করে গত ১৮ জুন শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মসিউর রহমান বলেছেন, ‘আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার, রাষ্ট্র ও জনগণের ভেতর যে আত্মিক সম্পর্ক সেটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটি টাকা-পয়সার হিসাবের চেয়ে অনেক বড়। ’

পদ্মা সেতুকে বাংলাদেশের বিজয় ও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে একই সেমিনারে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, ‘পদ্মা আমাদের কাছে ইট-পাথরে নির্মিত একটি সেতু নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো কোটি বাঙালির আবেগ, আমাদের ভালোবাসা, গৌরব। আজ আমরা আমাদের সক্ষমতাকে উদযাপন করছি। পদ্মা সেতু আমাদের বিজয়ের প্রতীক; উন্নয়ন, ঘুরে দাঁড়ানো ও হার না মানার প্রতীক। ’

দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রথমবারের মতো পুরো দেশ একটি সমন্বিত যোগাযোগকাঠামোতে চলে আসবে। দক্ষিণ বাংলার গ্রামেও পরিবর্তনের হাওয়া লাগবে। এই অঞ্চলের ২১টি জেলার কৃষক, মৎস্যজীবী, তাঁতি, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভোক্তার সমাবেশ যে রাজধানী ঢাকা তার সঙ্গে অনায়াসে সংযুক্ত হতে পারবেন। অন্যদিকে তাঁরা রাজধানী থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে পারবেন তাঁদের গ্রামের ও আশপাশের এসএমই উদ্যোগগুলোর জন্য। দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক উৎপাদন, সেবা, পর্যটন, শিল্প-বাণিজ্যেও বিনিয়োগ বাড়বে। বাড়বে কর্মসংস্থান। ২১ জেলায় মানুষের আয়-রোজগার ও জীবনের মান বাড়ার প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতে পড়বে।

তাই স্বপ্ন দেখছে দক্ষিণ বাংলার মানুষ। প্রায় ২০ বছর আগের এক সকালে দুঃস্বপ্নের মতো নিজের বসতভিটা, গবাদি পশু, চাষের জমি বিলীন হয় পদ্মার গর্ভে—এমন একজন ইব্রাহিম হাওলাদার। জীবন ও জীবিকার তাগিদে তিনি কখনো ছিলেন প্লাস্টিক কারখানার শ্রমিক, কখনো কারওয়ান বাজারের আড়তের কর্মচারী, কখনো আবার রিকশাচালক। তাঁর ছেলে ঢাকায় মোটর মেকানিকের কাজ করেন। তিনি স্বপ্ন দেখছেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ছেলেকেও গ্রামে নিয়ে আসবেন। মোটর গ্যারেজ দেবেন পাশেই। একসঙ্গে থাকবেন। শৈশবের চিরচেনা মুখ, স্বজনদের সঙ্গে গল্প-আড্ডায় পার করতে চান বাকিটা জীবন। তাঁর মতো আরো অনেক মানুষ ফিরতে চায় গ্রামে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের জিডিপি অন্তত ৩.৫ শতাংশ বাড়বে। সামগ্রিকভাবে তখন দেশের জিডিপি বাড়বে অন্তত আরো ১.২৬ শতাংশ। একটি জরিপে বলা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যেই পাঁচ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুবিধা পাবে এই সেতুর কল্যাণে। দক্ষিণাঞ্চলের দারিদ্র্য প্রতিবছর ১ শতাংশেরও বেশি হারে কমবে।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বাঙালি বীরের জাতি। বাঙালির ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক রঞ্জিত হয়েছে ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্তধারায়। কিন্তু বাঙালি আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। ’ প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘এই সেতু শুধু ইট-সিমেন্ট-স্টিল-কংক্রিটের একটি অবকাঠামো নয়, এই সেতু আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব, আমাদের সক্ষমতা আর মর্যাদার প্রতীক। এই সেতু বাংলোদেশের জনগণের। এর সঙ্গে জড়িত আছে আমাদের আবেগ, সৃজনশীলতা, সাহসিকতা, সহনশীলতা এবং আমাদের প্রত্যয়, জেদ; যে জেদের কারণে আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণে সক্ষম হয়েছি। ’ উৎসবের এই মুহূর্তে দেশের মানুষকে ‘স্যালুট’ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের সমর্থন আর সাহসেই তিনি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কঠিন কাজটি সম্ভব করতে পেরেছেন।

লক্ষ্যে স্থির, বিপদে অবিচল থাকলে পাহাড়সম বাধাও যে ডিঙানো যায় তার বড় নজির পদ্মা সেতু প্রকল্প।    অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ সমৃদ্ধ এক আগামীর স্বপ্ন দেখছে পদ্মা সেতু ঘিরে। সেই স্বপ্ন ছুঁয়ে এলাম ২৫ জুন শনিবার। ছুঁয়ে এলাম বাঙালির আবেগ, যে আবেগের সঙ্গে জড়িত বিজয়ী জাতির আত্মবিশ্বাস। বাঙালির সেই স্বপ্ন ও আবেগ ছুঁয়ে মনে মনে বললাম, ‘আমরাও পারি। ’

লেখক : সর্বইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী
[email protected]



সাতদিনের সেরা