kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ জুলাই ২০২২ । ২১ আষাঢ় ১৪২৯ । ৫ জিলহজ ১৪৪৩

আওয়ামী লীগ : নতুন যুগের সূচনা হোক

আবদুল মান্নান   

২৩ জুন, ২০২২ ০২:৩৪ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



আওয়ামী লীগ : নতুন যুগের সূচনা হোক

উপমহাদেশের বৃহত্তম ও অন্যতম প্রাচীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আজ ৭৪তম বছরে পদার্পণ করছে। এই দলের জন্মের সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন, যাঁরা দলের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, জেলজুলুম সয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, আত্মত্যাগ করেছেন, তৃণমূল নেতাকর্মী—যাঁরা নিজের বর্তমানকে দলের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করেছেন তাঁদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা। স্মরণ করি দলের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, প্রথম সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক আর স্মরণ করি এই দলটি গঠনের পেছনের সেই নেপথ্য কারিগর শেখ মুজিব, পরবর্তীকালে বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ হিসেবে পাকিস্তান নামের একটি ঔপনিবেশিক দেশের শাসনামলে।

বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগের জন্মকালে দলটির নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরে দলটিকে অসাম্প্রদায়িক চরিত্র দেওয়ার জন্য তার নতুন নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। যাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আওয়ামী লীগের জন্ম, সেই বাঙালি তখন পাকিস্তানে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। বেশির ভাগই হতদরিদ্র; যদিও এই বাঙালিদেরই পাকিস্তান সৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল। বাঙালিরাই পাকিস্তান সৃষ্টির পর অনেকটা হয়ে গেল অপাঙক্তেয়। পরিস্থিতি এমন হয়ে গেল যে পাকিস্তানের বড় লাট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ফরমান জারি করলেন, নতুন দেশের সবাই তাদের নিজের ভাষা বাদ দিয়ে অনেকটা বিদেশি ভাষা (মূলত ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহার থেকে আসা উদ্বাস্তুদের ভাষা) উর্দুতে কথা বলতে হবে, দপ্তরে কাজ করতে হবে আর তা না করলে অনেকটা কপালে ভাত না জোটার মতো অবস্থা আর কি। ঠিক তখনই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতারা এটি অনুধাবন করলেন, বৈধ অধিকার আদায়ের জন্য একটি সংগঠনের প্রয়োজন। জন্ম নিল আওয়ামী লীগ। ‘আওয়াম’ অর্থ জনগণ। অর্থাৎ জনগণের লীগ বা দল। সেই পর্যন্ত দলটি তাই আছে।

এই উপমহাদেশে যে কয়টি প্রাচীন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে শুরুতে তাদের কোনোটিই রাজনৈতিক দল ছিল না। এসব সংগঠন গঠিত হয়েছিল ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য। ভারতের অন্যতম প্রাচীন ‘রাজনৈতিক’ সংগঠন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় একজন ইংরেজ রাজকর্মচারী অ্যালেন অক্টোবিয়ন হিউমের উদ্যোগে ১৮৮৫ সালে। ভারতের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধ (ইংরেজদের ভাষায় সিপাহি বিদ্রোহ) ১৮৫৭ সালে শেষ হয়েছে। হতাহত হয়েছেন অনেক ভারতীয় সৈনিক। ভারতের শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের দুই নাবালক সন্তানকে ইংরেজরা হত্যা করে। তাঁকে নির্বাসিত করা হয় রেঙ্গুনে। ভারতের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির হাত থেকে সরাসরি ইংরেজ সম্রাটের অধীনে চলে যায়। তখন ইংরেজ শাসকরা মনে করলেন ভারতে ভবিষ্যতে যেন স্বাধীনতার জন্য আর কোনো আন্দোলন না হয় সে জন্য ভারতের উচ্চশ্রেণির শিক্ষিত কিছু মানুষের সমর্থন তাঁদের সব সময় প্রয়োজন হবে, যাঁরা বলবেন ভারতে ইংরেজ শাসনের কোনো বিকল্প নেই। এর ফলে ভারতে ইংরেজ উপনিবেশবাদ আরো পাকাপোক্ত হবে। এই তথাকথিত উচ্চবিত্ত বা কুলীন শ্রেণিকে নিয়ে হিউম সাহেব গঠন করলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। এই কংগ্রেসের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অবিভক্ত বাংলার উচ্চবিত্ত মুসলমানরা মনে করলেন তাঁরা কেন পিছিয়ে থাকবেন? ১৯০৬ সালের ২৭ থেকে ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার নবাব পরিবারের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন। এখানেও জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। উদ্যোক্তাদের কেউ বাঙালি নন। নবাব পরিবারের সদস্যরা এই মুল্লুকে এসেছিলেন কাশ্মীর থেকে। ইংরেজদের কাছ থেকে জমিদারি কিনে হয়ে গেলেন ঢাকার নবাব। এরই মধ্যে বাংলা ভাগ হয়েছে। এই সম্মেলনে প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ। অংশীজন সবাই ঢাকার উচ্চবিত্ত মুসলমান আর নবাব পরিবারের সদস্য। উদ্দেশ্য একটাই, তাঁদের গোষ্ঠীস্বার্থ সংরক্ষণ করা। সাধারণ মানুষ আগের মতোই ছিন্নমূল, শ্রমিক শ্রেণি, বর্গাচাষি। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সূত্রপাত ঘটল ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লব বা সর্বহারাদের উত্থান। প্রতিষ্ঠিত হলো বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই ঢেউ লাগল ভারতবর্ষে। একদল ভারতীয়, যাঁরা আগে থেকে মার্ক্সীয় দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন, তাঁরা কানপুরে ১৯২৫ সালে গঠন করলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি। প্রথম সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন এস ভি ঘাটে। পরে সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এম এন রায়, এস এ ডাঙ্গে, শওকাত ওসমানি, গুলাম হোসেন, মুজফ্ফর আহমদ। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠার পেছনে মূলত কাজ করেছিলেন ভারতে মার্ক্সীয় দর্শন প্রচার করা আর লেনিনবাদকে জনপ্রিয় করা। জাতীয় রাজনীতিতে এসেছেন আরো পরে। উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বর্তমানে মুসলিম লীগ বিলুপ্তপ্রায়। কংগ্রেস কোনো রকমে টিকে আছে। অথচ এই দুটি দলই ভারতকে ইংরেজ শাসনমুক্ত করতে একসময় নিজ নিজ অবস্থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সূর্যও অস্তমিত প্রায়। এসব রাজনৈতিক দলের অনেক পরে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ টিকে আছে। এর পেছনে কাজ করেছে অনেক কারণ। প্রথমত, এটি একমাত্র দল, যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাঙালির স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে। যখনই বাঙালির স্বার্থের প্রসঙ্গ এসেছে দলটি কখনো কোনো ব্যক্তি বা সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। দলটি ভেঙেছে একাধিকবার। বিভিন্ন সময় নিষিদ্ধ হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর ক্ষমতা দখলকারী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়া শুধু দলটি নিষিদ্ধ করে ক্ষান্ত হননি, বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়াটা পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হলো। ১৯৫৭ সালে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি। মূল উদ্দেশ্য চীনের কমিউনিস্ট শাসনের প্রতিষ্ঠাতা মাও জেদংয়ের দর্শন প্রচার করা। ১৯৬৬ সালে ছয় দফাকে কেন্দ্র করে দলে আবার ভাঙন ধরে। দল থেকে বের হয়ে যান দলের সভাপতি আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ। এরপর দলের হাল ধরেন শেখ মুজিব।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো সামরিক শাসন জারি করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা। দুই সপ্তাহের মাথায় তাঁকে পিস্তল ঠেকিয়ে দেশটির শাসনভার গ্রহণ করেন সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান। প্রথম সুযোগেই তিনি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ করেন। আটক করেন সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের। ১৯৬৮ সালে দলের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে রুজু করা হয় তথাকথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলা। অভিযোগ রাষ্ট্রদ্রোহিতা। প্রমাণিত হলে একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুকে কারামুক্ত করা হয়। এরপর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা আর আওয়ামী লীগ বাঙালির শেষ আশ্রয়স্থল। বাঙালি বুঝতে পারে তাদের মুক্তির একমাত্র আশ্রয়স্থল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আবারও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয় আর শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। আবারও তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। সেই মামলা থেকে তিনি মুক্ত হন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর।

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ৩ নভেম্বর কারা অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। দলটি আবারও নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। দলের কিছু নেতা জিয়ার দলে যোগ দেন। কেউ কেউ জিয়ার উপদেষ্টা বা মন্ত্রীর পদ বাগিয়ে নেন। এক কথায় বলতে গেলে দলটি অনেকটা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ঠিক এই সময় দলের হাল ধরেন বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী, কারাগারে নিহত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের স্ত্রী বেগম জোহরা তাজউদ্দীন। তিনি সঙ্গে পান দলের কিছু নিবেদিত তৃণমূল নেতাকর্মী। আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মী। তাঁরাই সব সময় দলের ক্রান্তিকালে দলের হাল ধরেছেন। কিন্তু দুঃখের কথা হচ্ছে, তৃণমূলের এই নেতাকর্মীরা সব সময় অবহেলিত থাকেন।

আওয়ামী লীগের নানা ধরনের অন্তর্নিহিত শক্তির সঙ্গে যোগ হয়েছে দলটি, সব সময় সুষ্ঠু রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করেছে। দেশে নানা ধরনের বৈরী পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও দলটি রাজনীতিকে বাদ দিয়ে  পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যেতে চেষ্টা করেনি। নির্বাচনে হারবে জেনেও সেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। যেমন—১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়ার আমলে। আবার যখনই মনে করেছে কোনো নির্বাচনে জনগণের সম্পৃক্ততা নেই, সেই নির্বাচনী তামাশার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পিছপা হয়নি। যেমন ঘটেছে ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার আমলে। আওয়ামী লীগের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, দলটি যখনই মনে করেছে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে, তখনই তারা রাজপথে নেমেছে। এটা ঠিক, এরশাদ হটাও আন্দোলন শুরু করেছিল এই দেশের ছাত্রসংগঠনগুলো। পরে যোগ দিয়েছে সাংস্কৃতিককর্মী, শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু সেই আন্দোলন নতুন মাত্রা পায় তখনই যখন আওয়ামী লীগ এই আন্দোলনে যোগ দেয়। আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা ছাড়া এই দেশে কোনো আন্দোলন সফল হয়নি।

আওয়ামী লীগের আমলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি অনুন্নত দেশ (ঁহফবৎ ফবাবষড়ঢ়বফ) থেকে স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশে উন্নীত হয়েছিল। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার আমলে সেই দেশ দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর এই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে একটি মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উঠে এসেছে। সব শেষে বলতে হয়, আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশ কল্পনা করা যেতে পারে না, আবার এও প্রমাণিত, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হলে আওয়ামী লীগের বিকল্পও এখনো দৃশ্যমান হচ্ছে না। তবে এই প্রাচীন দলটি বর্তমানে একটি রোগে আক্রান্ত আর সেই রোগটি হচ্ছে দলে অনুপ্রবেশকারীর প্রাদুর্ভাব। এদের যদি ছেঁটে ফেলা না যায়, তাহলে আগামী দিনে ঘটে যেতে পারে বড় কোনো বিপর্যয়। ৭৩ বছর শেষে পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে আওয়ামী লীগের নাম জড়িত আছে, যা আগামী দিনেও থাকবে বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে তা হতে হলে দল থেকে সব পরগাছা উপড়ে ফেলতে হবে। এই কাজটি একমাত্র শেখ হাসিনাই করতে পারেন। কাজটি হয়তো তাঁর জন্য কঠিন, তবে অসম্ভব নয়।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক



সাতদিনের সেরা