kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ জুলাই ২০২২ । ২১ আষাঢ় ১৪২৯ । ৫ জিলহজ ১৪৪৩

বিশ্ব শরণার্থী দিবস এবং রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ

এ কে এম আতিকুর রহমান   

২০ জুন, ২০২২ ০৪:১১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিশ্ব শরণার্থী দিবস এবং রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ

প্রতিবছর ২০ জুন বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশ বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালন করে থাকে। শরণার্থীদের মর্যাদাগত অবস্থানসংক্রান্ত ১৯৫১ সালের কনভেনশনটির ৫০তম বার্ষিকী পালনকে উপলক্ষ করে ২০০১ সালের ২০ জুন প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত হয়। মূলত ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উত্থাপিত প্রস্তাব নম্বর ৫৫/৭৬ অনুযায়ী ২০ জুনকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব শরণার্থী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ওই দিনটি আগে আফ্রিকা শরণার্থী দিবস হিসেবে পালিত হতো।

বিজ্ঞাপন

দিবসটি পালনের দুটি উদ্দেশ্য আমরা লক্ষ করে থাকি। একটি হচ্ছে—শরণার্থী বা উদ্বাস্তুদের অধিকার, তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা, তাদের নিপীড়ন, অত্যাচার ও দুর্দশার কাহিনি ইত্যাদি সম্পর্কে আলোকপাত করা। অন্যটি হচ্ছে—শরণার্থীদের প্রতি প্রতিটি দেশের জনসাধারণের দায়িত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সচেতন করে গড়ে তোলা, বিশেষ করে ওই বাস্তু হারানো মানুষদের দুঃখ-কষ্ট উপশমে এগিয়ে আসতে সবাইকে উৎসাহিত করা।

গত দুই বছর করোনা মহামারির প্রকোপে সারা বিশ্বই দিবসটি তেমন একটা আড়ম্বরের সঙ্গে উদযাপন করতে পারেনি, সীমিত আয়োজনের মধ্যেই থাকতে হয়েছিল। এ বছর করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসায় আশা করা যায় যে দিবসটি পালনের আয়োজন ও ব্যাপকতা আরো বৃদ্ধি পাবে। শুধু জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট অঙ্গসংস্থাগুলোই নয়, প্রতিটি দেশের সরকার, বেসরকারি সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং মানবতাবাদী বিভিন্ন সংগঠন নানা আয়োজন ও উদ্দীপনার সঙ্গে দিবসটি পালন করে। ওই সব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আয়োজকরা দিবসটির তাৎপর্য, উদ্দেশ্য এবং করণীয় সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালনের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।    

দিবসটি পালনের জন্য একেক বছর একেকটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘যে-ই হোক। যেখানেই হোক। যখনই হোক। প্রত্যেকেরই নিরাপত্তা চাওয়ার অধিকার রয়েছে। (হুয়েভার। হয়ারেভার। হোয়েনেভার। এভরিওয়ান হ্যাজ দ্য রাইট টু সিক সেফটি। )’ প্রতিপাদ্যটির শব্দগুলো বিশ্লেষণ করলে শরণার্থীদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও সহযোগিতার একটি রূপরেখা পাওয়া যায়; যেমন—ক. তারা যারাই হোক না কেন, পালিয়ে আসতে বাধ্য হওয়া মানুষদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা উচিত। খ. তারা যেখান থেকেই আসুক, পালিয়ে আসতে বাধ্য হওয়া মানুষদের স্বাগত জানানো উচিত। গ. যখন মানুষ পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়, তাদের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার থাকে। যুদ্ধ, সহিংসতা, নিপীড়ন—যে হুমকিতেই হোক না কেন, প্রত্যেকেই সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য।

বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর যখন বিভিন্ন আয়োজনে এই দিবসটি পালন করা হয়, তখন শরণার্থীদের জন্য কত কিছু করারই না অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। জানি না, পরের বছর সেসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের পরিসংখ্যান নিয়ে বিশ্বনেতারা বিশেষ একটা উচ্চবাচ্য করেন কি না, নাকি আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রবাহে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ? রাজনীতি অবশ্যই এক বিরাট খেলা, তা হোক অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক। সমস্যা জিইয়ে না রাখলে যে নেতাদের প্রতিপত্তি আর ক্ষমতাকে জাহির করার সড়কটি ধসে পড়বে। তাইতো মূল সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা অনেকটাই গুরুত্বহীন রয়ে যায়। প্রকাশিত বা অন্তর্নিহিত সম্পর্কের আঁতাত পৃথিবীটাকেই বিভক্ত করে রেখেছে। তাই এই মিশ্র বিশ্বরাজনীতির ফলে ঐক্যের মাধ্যমে সমস্যার কোনো টেকসই সমাধান করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। শরণার্থীদের এক অনিশ্চিত জীবন বেছে নিতে হয়। বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো এবং জাতিসংঘ যদি আন্তরিক হতো, তাহলে দেশ ত্যাগ করার অবস্থা সৃষ্টির উৎসতেই ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু তা হচ্ছে কই? ভবিষ্যতেও যে তেমন কিছু ঘটবে—সেই আশাও আপাতত করা যায় না।

জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) তথ্য মতে, ২০২১ সালে বিশ্বে উদ্বাস্তুর সংখ্যা ছিল ৮৯.৩ মিলিয়ন, যা ২০২২ সালে বেড়ে ১০০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। ২০২১ সালের উদ্বাস্তুদের মধ্যে ২৭.১ মিলিয়ন ছিল শরণার্থী এবং বাকিদের কেউ রাষ্ট্রহীন, কেউ আশ্রয়প্রার্থী, কেউ আবার অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষ। তবে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা (৫৩.২ মিলিয়ন) ছিল সবচেয়ে বেশি। শরণার্থীদের ৬৯ শতাংশই পাঁচটি দেশ—যথাক্রমে সিরিয়া (২৭ শতাংশ), ভেনিজুয়েলা (১৮ শতাংশ), আফগানিস্তান (১১ শতাংশ), দক্ষিণ সুদান (৯ শতাংশ) ও মিয়ানমার (৫ শতাংশ) থেকে আগত এবং অবশিষ্ট ৩১ শতাংশ অন্যান্য দেশ থেকে আসা শরণার্থী। শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশ মাত্র ১৭ শতাংশ, মধ্যম আয়ের ৪০ শতাংশ, নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ ২১ শতাংশ এবং নিম্ন আয়ের দেশ ছিল ২২ শতাংশ। তবে বেশির ভাগ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোতে (৭২ শতাংশ)।

পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও কিছু উগ্রবাদী ধর্মীয় লোকের নিপীড়ন ও নির্যাতনে বাস্তুত্যাগী প্রায় ১২ লাখ মিয়ানমারের নাগরিক (রোহিঙ্গা)। তাদের আমরা উদ্বাস্তু বা শরণার্থী যে নামেই অভিহিত করি না কেন, তারা নিরাপদ আশ্রয়ের দাবিদার এবং বাংলাদেশ সেই ব্যবস্থা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গেই করেছে। নিজেদের নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি। এ ছাড়া বিশ্বের অনেক দেশই তাদের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছে। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এখানে নিরাপদে থাকাটাই সমস্যার সমাধান নয়। তাদের নিজেদের ভিটামাটিতে, তাদের জন্মভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়াটাই হচ্ছে মুখ্য কাজ। তাই বিশ্বসম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে মূলত বাংলাদেশ সরকারকেই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এবং সেখানে নিরাপদ পুনর্বাসনে যে বিলম্ব ঘটছে বা মিয়ানমারের অনীহা দেখা যায়, তার পেছনে অনেক কিছুই কাজ করছে। দেখা যায় যে শুধু চীন বা ভারতই নয়, মিয়ানমারকে প্রাধান্য দিচ্ছে বেশ কিছু আসিয়ান দেশ। এ ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়াও রয়েছে নিজেদের নিরাপত্তার বিভিন্ন ইস্যু। ভেটো ক্ষমতা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বড় অন্তরায় হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক চাপ তেমন কোনো ইতিবাচক ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। পাঁচ বছর পার হতে চলল, কিন্তু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করার কাজটি শুরু করা যায়নি, যদিও কয়েকবারই প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। বর্তমানে আবার কিছুটা অগ্রগতির কথা শোনা যাচ্ছে। তবে মিয়ানমারের সামরিক সরকার এ ব্যাপারে কতটুকু আন্তরিক হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন। মিয়ানমার বা বিশ্বের কোনো দেশ যদি মনে করে থাকে যে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশেই থিতু করবে, তাহলে বড় ভুল হবে। রোহিঙ্গাদের একসময় তাদের দেশে ফিরতেই হবে। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ আলাপ-আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে যাচ্ছে। বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ এবং বন্ধুত্বসুলভ পরিবেশ বজায় রেখে এ সমস্যার সমাধান চায়। তবে মিয়ানমার আন্তরিক না হলে এই সমস্যাটির সমাধান দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।   

রোহিঙ্গাদের যদি কখনো ফেরত পাঠানো না যায়, তাহলে তাদের বোঝা কে বহন করবে? বাংলাদেশের পক্ষে খুবই কষ্টকর। সাময়িক আশ্রয় দিতে গিয়ে তা যেন আশ্রয় দেওয়া দেশের জন্য বোঝা না হয় বা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, সেই বিষয়টি সবাইকে বুঝতে হবে। তাই জাতিসংঘকে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ শরণার্থীদের প্রতি দায় আশ্রয় দেওয়া দেশেরই নয়, সব দেশের। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে ভবিষ্যতে কোনো দেশই আর বাস্তুত্যাগী মানুষদের বা শরণার্থীদের আশ্রয় দেবে না, সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘ যতই নিয়ম-নীতির কথা বলুক।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস উদযাপন উপলক্ষে আসুন আমরা শরণার্থী বা উদ্বাস্তুদের প্রতি শুধু সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া বা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নয়, উদ্বাস্তু হওয়ার মূল কারণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে একটি নিরাপদ সমাধানে উপনীত হওয়ার পথ বের করি। একই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে একটি নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাক সে ব্যাপারে মিয়ানমারকে সম্মত করাই।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব



সাতদিনের সেরা