kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

বাজেট বিশ্লেষণ

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের রূপরেখা নেই

এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা   

১০ জুন, ২০২২ ০২:৫৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের রূপরেখা নেই

করোনা মহামারির ধাক্কা কিছুটা সামলে ওঠার পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ার সঙ্গে আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি বেশি হলে তা জিডিপি থেকে কমে। এ পরিস্থিতিতে সরকার প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে  জিডিপির প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করেছে ৭.৫ শতাংশ। বিপরীতে বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে ৬.২ শতাংশ থেকে ৬.৪ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

এটাই বাস্তবসম্মত। সরকারের ৭.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অতিরঞ্জিত বলেই মনে করি।

এ কথা ঠিক, সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চায়। এর জন্য দরকার বিনিয়োগ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে এটি করা হয়। এতে বেসরকারি খাতের অবদান বেশি। অথচ এক দশক ধরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ২২ থেকে ২৩ শতাংশে ঘুরপাক খাচ্ছে। খুব একটা বাড়ছে না। এদিকে নজর দিতে হবে।

বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসায়ীরা মনে করেন কর মওকুফ করা প্রয়োজন। জাতিসংঘে কাজ করার সময় আমি এ বিষয়ে বেশ কিছু গবেষণায় অংশ নিয়েছি। তখন দেখেছি, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে কর মওকুফ করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাজেটে কর অবকাশ সাত বছর থেকে কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়।    এর মধ্যে প্রথম দুই বছরে কর অবকাশ ছিল ৫০ শতাংশ। পরের দুই বছরে ২৫ শতাংশ এবং শেষ বছরে ২৫ শতাংশ। ওই সময়ে কিন্তু বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমেনি। বরং জাতীয় উৎপাদনের আনুপাতিক হারে ওই বছরই ছিল সর্বোচ্চ বিনিয়োগ। ফলে করের হার কমালে বিনিয়োগ বাড়বে, এটা বাস্তবসম্মত কথা নয়।

মূলত বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগের বাধাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। জ্বালানি ঘাটতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ও পরিবহন, বিশ্বব্যাংকের বাণিজ্য সহজীকরণ সূচক। এ ছাড়া সুশাসনের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান খুব একটা ভালো নয়।

দুর্নীতির ইনডেক্সেও বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে। এই বিষয়গুলোর মানোন্নয়ন করা না গেলে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ ভালো হবে না। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে এই বিষয়গুলোর প্রতি বাজেটে দিকনির্দেশনা থাকা উচিত।

সরকারি বিনিয়োগেও অনেক সমস্যা আছে। প্রথম ৯ মাসে এডিপি ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়। শেষের দিকে এসে তাড়াহুড়া করে বাকি কাজ শেষ করতে হয়। এতে কাজের মান ভালো হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজই হয় না।

আবার সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাঁচ বছরের কাজ শেষ করা হয় ১০ বছরে। এতে খরচ বেড়ে যায়। আরেকটা কাজ করা হয়, অনেক বেশি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ফলে প্রকল্পে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয় না। একটি প্রকল্প যখন তৈরি করা হয়, তখন এর জন্য সময় নির্ধারিত থাকে। অল্প বরাদ্দের ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কাল বেড়ে যায়।

এবার প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, যেসব প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেসব প্রকল্প এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত না করতে। প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বিনিয়োগের সুফল পেতে হলে এই বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য পুরস্কার ও তিরস্কার দুটিই থাকতে হবে।   

কর্মসংস্থানের সঙ্গে বিনিয়োগের সম্পর্ক নিবিড়। বিনিয়োগ ছাড়া শ্রমিকের কর্মসংস্থান করা যায় না। ফলে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে কর্মসংস্থানও বাড়ানো যাবে না। আবার বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহারে শ্রমঘণ্টা কমে এসেছে। এতে কর্মসংস্থানও কমেছে। এখন কর্মসংস্থানের জন্য কোয়ালিটি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

এ ছাড়া দেশীয় বিনিয়োগেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দেশীয় বিনিয়োগ না থাকলে বিদেশিরা বিনিয়োগ করতে চান না। তাঁরা মনে করেন, দেশটিতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ পরিবেশ নেই।

ব্যবসায় সহজীকরণ, সুশাসন নিশ্চিত করা, জ্বালানি অবকাঠামো খাতে শৃঙ্খলা না থাকলে দেশে খুব একটা বিনিয়োগ বাড়বে না।

সাম্প্রতিককালে বিনিয়োগ কিছুটা বাড়লেও জিডিপির আনুপাতিক হারে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এখনো বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কম। আমাদের অর্থনীতির সমপর্যায়ের দেশ কম্বোডিয়া কিংবা ভিয়েতনামে আমাদের চেয়ে বিদেশি বিনিয়োগ বেশি।

করোনাকালে নতুন করে দরিদ্র মানুষ বেড়ে যাওয়ায় তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়াতে হবে। কৃষি খাতে গুরুত্ব দিতে হবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল শিল্পসহ নতুন নতুন খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই খাতগুলো কর্মসংস্থানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের যেসব জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে এনে সুরক্ষা দিতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে যে পরিমাণ বরাদ্দ দেখানো হয় তা অতিরঞ্জিত। কারণ এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের পেনশনও অন্তর্ভুক্ত। সার্বিকভাবে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করতে হবে। বিনিয়োগের জন্য যেসব পূর্বশর্ত রয়েছে সেগুলোর সংস্কার করে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

অনুলিখন : সায়েম টিপু



সাতদিনের সেরা