kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হবে

ড. নিয়াজ আহম্মেদ   

৩ জুন, ২০২২ ০৫:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিতে হবে

নেদারল্যান্ডস উন্নত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। সেখানে ২৭  শতাংশ মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম বাইসাইকেল। বিশ্বে বাইসাইকেলে চড়া মানুষের মধ্যে দেশটি প্রথম। ৮৫ শতাংশ মানুষের অন্তত একটি করে বাইসাইকেল আছে।

বিজ্ঞাপন

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বাইসাইকেল চালিয়ে অফিসে যান। একসময় তাদের অনেক গাড়ি ছিল। ব্যাপক হারে দুর্ঘটনা ঘটায় গাড়ি পরিবহনকে নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বাইসাইকেলের প্রতি গুরুত্ব দেয়। সেই অনুযায়ী রাস্তার লেন তৈরি করে। সাইকেলে চড়তে কেউ কিছু মনে করে না। পরিবেশবান্ধব এই পরিবহন তাদের আরো উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাবে, তা-ই স্বাভাবিক। তাদের পরিবহন ব্যবস্থায় কোনো নৈরাজ্য বিরাজ করছে না। কিন্তু ব্যতিক্রম আমাদের দেশে। এখানে অনেক আগে থেকেই যাতায়াতের মাধ্যমগুলোয় নৈরাজ্য বিরাজ করে আসছে এবং ক্রমান্বয়ে তা চরম আকার ধারণ করছে। যার করুণ পরিণতি আমাদের প্রতিদিনকার সড়ক দুর্ঘটনা। পত্রিকার পাতা খুললে প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১০ জনের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবর আমাদের চোখে পড়ে। হালে যানবাহনের ধরনের মধ্যে মনগড়া পরিবর্তন তৈরি হচ্ছে। ব্যক্তিগত পরিবহনকে আমরা গণপরিবহন এবং মহাসড়কের বাহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছি। গত ঈদে মানুষ ব্যাপকহারে মোটরসাইকেল চালিয়ে গ্রামে চলে গেছে। পরিবহন ভাড়া বেশি হওয়ায় অনেকে এমন করেছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। মহাসড়কে এমন পরিবহন দুর্ঘটনার মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষের যাতায়াতকে স্বাচ্ছন্দ্য, সহজ ও নিরাপদ করার জন্য আমরা মেট্রো রেল কিংবা উড়াল পথ তৈরি করছি; কিন্তু তা কতটুকু আমাদের সুফল দিতে পারবে। যানবাহনের মাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ এবং সড়কের উন্নয়ন না করতে পারলে কোনো কিছু দিয়েই আমরা ভালো ফল পাব না।
যোগাযোগের জন্য সড়কের আওতা এখন অনেক বেড়েছে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য সড়কপথ তৈরি হচ্ছে। ইউনিয়নের সঙ্গে উপজেলা, উপজেলার সঙ্গে জেলা এবং জেলার সঙ্গে বিভাগীয় ও রাজধানীর যোগাযোগের মাধ্যম সড়কপথ এখন সহজ হয়েছে; কিন্তু সড়কের মানের উন্নতি হয়নি। সড়কে যানবাহনের মাধ্যমগুলোর কোনো গুণগত মান বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়নি। এখানে রয়েছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দৌরাত্ম্য। গ্রামে এবং আমার জানা মতে ঢাকা ও সিলেট বাদে সব বিভাগীয় শহরে এখনো ব্যাটারিচালিত রিকশা ও আটো চলছে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ এবং মারাত্মক দুর্ঘটনাপ্রবণ এই পরিবহন আমাদের মৃত্যুর মুখোমুখি করছে। অপেক্ষাকৃত সহজ এবং ভাড়া কম বিধায় টিকে আছে এজাতীয় পরিবহন। মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে এবং এদের জন্য বিকল্প তৈরি না করে আমরা বন্ধও করতে পারছি না। বিকল্প ভাবতে হলে প্রথমেই রাস্তাঘাট বড় করা এবং পরে গণপরিবহনের কথা ভাবতে হয়। আমরা তা কতটুকু করতে পারব, তা ভাবার বিষয়। আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত মহাসড়কে সিএনজি অটোরিকশা চলবে না, কিন্তু আমরা রোধ করতে পারিনি। এ কারণেও প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। আমাদের যানবাহনের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু ফিটনেসবিহীন গাড়ি আমাদের দুর্ঘটনার দিকে ঢেলে দিচ্ছে। এ ছাড়া রয়েছে ট্রাফিক আইন মেনে না চলার প্রবণতা। একই রাস্তায় সব ধরনের পরিবহন আমাদের যানজট ও দুর্ঘটনার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। শহরের রাস্তাঘাট প্রশস্ত করা অনেকটা অসম্ভব। এ ছাড়া পরিবহনের সংখ্যাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কেননা প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য মানুষ আসছে শহরে। ফলে শহরের ওপর চাপ পড়ছে। পরিবহনের মাধ্যমগুলোর মধ্যে পরিবর্তন, গুণগত মান বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা শুধু যানজটেই পড়ব না, রাস্তাঘাটও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

প্রথমত, গণপরিবহনকে আধুনিক এবং একে ঢেলে সাজাতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলোকে বাদ দিয়ে মানসম্মত নতুন নতুন গাড়ি রাস্তায় নামাতে হবে। গাড়ির সংখ্যা কমাতে হবে। বিভাগীয় শহরগুলোতে আলাদা লেন তৈরি করে বাইসাইকেল চালানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। মানুষকে বাইসাইকেল চালাতে উৎসাহিত করতে হবে। এতে গাড়ির ওপর চাপ কমবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের জন্য বড় আতঙ্ক মোটরসাইকেল। বাস্তবতা হলো, আমাদের গণপরিবহন ভালো নয় বিধায় সহজলভ্য এবং একসঙ্গে তিনজন চড়া যায় বিধায় মোটরসাইকেলকে অনেকে যাতায়াতের বড় মাধ্যম হিসেবে মনে করছে। এটি যেকোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একটি ব্যক্তিগত পরিবহন যেন গণপরিবহনে রূপান্তরিত না হয় তার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির অনুমোদন সীমিত করতে হবে। একটি পরিবারে হয়তো তিন কিংবা চারটি গাড়ি রয়েছে। এ গাড়িগুলো যানজটের জন্য বড় কারণ। নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আবারও গণপরিবহনের দিকেই নজর দিতে হবে। আমাদের অভ্যাসের মধ্যেও পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা স্বল্প পথ যেখানে হেঁটে যেতে পারি, সেখানে পরিবহনের সাহায্য নেওয়া কেন। আমাদের অভ্যাসের মধ্যে বাইসাইকেল চালানো কিংবা গণপরিবহনে যাতায়াতকে প্রাধান্য দিতে হবে। এ কাজগুলো করার জন্য একটি সুন্দর পরিকল্পনা দরকার, যা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। অনেকে দেশে রিং রোডের মাধ্যমে মানুষের যাতায়াতকে সহজ করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা সেই দিকেও হাঁটতে পারি। আমদেরই ভাবতে হবে আমরা কী করব।

যোগাযোগব্যবস্থা একটি দেশের প্রাণ। কিন্তু সেই যোগাযোগব্যবস্থা যদি আরামদায়ক ও নিরাপদ না হয়, তাহলে মানুষের কষ্টের শেষ থাকে না। আমাদের রাস্তাঘাটের আয়তন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে সত্য; কিন্তু আমাদের যাতায়াত আরামদায়ক ও নিরাপদ আজও হয়নি। আমরা নেদারল্যান্ডসের মতো ২৭ শতাংশ মানুষকে সাইকেলে চড়াতে হয়তো পারব না; কিন্তু আলাদা লেন তৈরি করে মানুষকে সাইকেল চালানোর সুযোগ তৈরি করে দিতে পারি। আমরা ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটো বন্ধের ব্যবস্থা করতে পারি। আমরা ব্যক্তিগত গাড়ির  ব্যবহার সীমিত রাখতে পারি। আমরা মোটরসাইকেল সীমিত করতে পারি। বিপুল জনগোষ্ঠীর দেশে আমরা যেখানে গণপরিবহনকে বড় মাধ্যম বিবেচনায় নিয়ে কিভাবে এ পরিবহনকে ঢেলে সাজানো যায় তার ব্যবস্থা করতে পারি। যেখানে প্রয়োজন সেখানে রাস্তাঘাট প্রশস্ত করতে পারি। আমরা ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে পারি। আমরা মানুষকে শহরমুখী হওয়া রোধ করতে পারি। আমরা অনেক কিছুই পারি, দরকার মাত্র ইচ্ছাশক্তি।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



সাতদিনের সেরা