kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

বিশ্ব মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন দিবস

ঋতু হয়ে উঠুক সাধারণ বিষয়

ডা. রেজাউল করিম কাজল   

২৮ মে, ২০২২ ০৯:০৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঋতু হয়ে উঠুক সাধারণ বিষয়

ডা. রেজাউল করিম কাজল।

২০৩০ সালের মধ্যে মাসিককে একটি সাধারণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রত্যয় নিয়ে আজ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন দিবস। নারীর মাসিক চলাকালে স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং এ নিয়ে সমাজে চলমান কুসংস্কার দূর করার লক্ষ্যে প্রতিবছর ২৮ মে পালন করা হয় এই দিবস।   

২০৩০ সালে যাতে কোনো নারী মাসিক নিয়ে নেতিবাচক ধারণার কারণে পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করাই এবারে দিবসটি পালনের লক্ষ্য। দিবসটি পালনের জন্য ২৮ মে দিনটি বেছে নেওয়ারও কারণ আছে।

বিজ্ঞাপন

ঋতুচক্র ২৮ দিন অন্তর শুরু হয়।

২০১৪ সালে জার্মানভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ওয়াশ ইউনাইটেড দিবসটি পালন করা শুরু করে। দিনটিকে ঘিরে শোভাযাত্রা, প্রদর্শনী, কর্মশালা ও আলোচনার আয়োজন করা হয়, যাতে সর্বস্তরের মানুষ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে এবং মাসিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন হয়।

এখনো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাসিক নিয়ে জনসমক্ষে কথা বলাটা ট্যাবু বা নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে গণ্য। সঙ্গে কুসংস্কার তো আছেই। আমিষ বা টকজাতীয় খাবার খেতে না দেওয়া, অতিথি আপ্যায়নে বিরত থাকা, এমনকি ধর্মীয় আচার পালনে বিধি-নিষেধও সমাজে দেখা যায়। জাতিসংঘ বলছে, ঋতু চলাকালীন স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা মৌলিক অধিকার। জীবনের অন্য বিষয়গুলোর মতো এটা অত্যন্ত সাধারণ একটা বিষয়।

ইউনিসেফের হিসাবে বিশ্বে প্রতি মাসে ১৮০ কোটি নারীর মাসিক হয়। অনেক দেশে স্যানিটারি ন্যাপকিন, পানির সংকট ও ভালো মানের বাথরুম নেই। ফলে এখনো অনেক মেয়ে মাসিকের সময় স্কুলে যেতে পারে না।

পেটে ব্যথা থাকলেও কর্মজীবী নারীরা এ সময় ছুটি চাইতেও সংকোচ বোধ করেন। যেসব নারী শ্রমিক হিসেবে কারখানায় কাজ করেন, তাঁদের জন্য ঋতুকালীন দিনগুলো হয়ে ওঠে আরো কঠিন। অসুস্থবোধ করলেও ‘অসুস্থতাজনিত ছুটি’ নেওয়া সম্ভব হয় না। আবার অনেক অফিসে বাসা থেকে কাজের বিষয়টিকে আমলে নেওয়া হয় না। বিশ্বের অনেক দেশ যেমন—জাপান, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, স্পেন ও জাম্বিয়ায় ঋতুকালীন সময়ে ছুটি দেওয়া হয়। স্কটল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্সে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিনা মূল্যে দেওয়া হয় অথবা তা করমুক্ত রাখা হয়।

ঢাকা শহরের অনেক বস্তিতে মেয়েদের জন্য আলাদা বাথরুম নেই, থাকলেও তা অপ্রতুল। এমন অবস্থায় নারীরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন ঋতুকালীন সময়ে। এখনো দেশে শুধু কিশোরী নয়, বয়স্ক নারীদের মধ্যেও মাসিক চলাকালে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে সচেতনতা আসেনি। পিরিয়ডের এই ট্যাবু ভাঙতে দেশে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যসচেতনতা

মাসিক চলাকালে জীবাণুমুক্ত স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু সবার পক্ষে স্যানিটারি প্যাড কেনা সম্ভব নয়। তাই যেকোনো সুতি কাপড় মাপমতো কেটে, ধুয়ে নিয়ে ও শুকিয়ে ব্যবহার করা যাবে।

চার থেকে ছয় ঘণ্টা পর পর প্যাড বা কাপড় পরিবর্তন করতে হবে। ছয় ঘণ্টার বেশি স্যানিটারি প্যাড পরে থাকলে তাতে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে, যা পরে প্রস্রাবের নালিতে বা প্রজননতন্ত্রে ইনফেকশন ঘটিয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এর ফলে তলপেটে ব্যথা, গায়ে জ্বর, মাসিকের রাস্তায় চুলকানি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা হিসেবে বন্ধ্যাত্ব সমস্যাও হতে পারে। মাসিকের সময় ৩০ মিলিলিটার থেকে ৮০ মিলিলিটার পর্যন্ত রক্ত যেতে পারে। রক্ত একটু বেশি গেলে ঘন ঘন প্যাড পরিবর্তন জরুরি।

প্রতিবার প্যাড পরিবর্তন করার সময় অবশ্যই আশপাশের এলাকা ভালোমতো ধুয়ে নিতে হবে। সাবান ব্যবহার করা উচিত নয়। যোনি এলাকা পরিষ্কার করার জন্য এখন বাজারে কোমল সাবান বা সলিউশন পাওয়া যায়।

যেখানে-সেখানে স্যানিটারি প্যাড ফেলা উচিত নয়। ব্যবহৃত প্যাডকে ভালোভাবে মুড়িয়ে নির্ধারিত স্থানে ফেলতে হবে, যেন একজনের জীবাণু অন্য কাউকে সংক্রমিত করতে না পারে। কখনোই টয়লেটের কমোডে প্যাড ফেলা উচিত নয়। অনেকেরই প্যাড ব্যবহারে ফুসকুড়ি বা র‌্যাশ দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।

সঠিক মাসিক ব্যবস্থাপনার ভুলে নারীর প্রজননস্বাস্থ্যে মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের উচিত নারীর মাসিক ব্যবস্থাপনাকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করা। দেশের অফিস-আদালতগুলোতে মাসিক চলাকালে নারীদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য সহায়ক পরিবেশ ও অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। মেয়েদের মাসিক চলাকালে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় সহযোগিতা করার বিষয়ে পুরুষ সহপাঠী, সহকর্মীদেরও সচেতন হওয়া দরকার।

 

লেখক :

সহযোগী অধ্যাপক (প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা



সাতদিনের সেরা