kalerkantho

রবিবার । ২৬ জুন ২০২২ । ১২ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৫ জিলকদ ১৪৪৩

বাপার সমীক্ষা প্রতিবেদন

‘আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ প্রকল্প ইলিশ প্রজননসহ প্রাণ-প্রকৃতির জন্য হুমকি’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ মে, ২০২২ ১৯:৩৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ প্রকল্প ইলিশ প্রজননসহ প্রাণ-প্রকৃতির জন্য হুমকি’

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নির্মাণাধীন আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে ইলিশ প্রজননসহ প্রাণ-প্রকৃতি ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা  প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ। এক সমীক্ষা প্রতিবেদন তুলে ধরে বলা হয়েছে, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আন্ধারমানিক নদীর ২৯ কিলোমিটার এলাকায় আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশ-প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। ইতিমধ্যে ওই এলাকায় বসবাসকারী জেলে সম্প্রদায়সহ স্থানীয় জনগণ নানা সমস্যায় পড়ছে। তারা এখন পরিবেশদূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দালালচক্রের শিকার হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে সেখানে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে সে বিষয়ে প্রাথমিক গবেষণা শেষে ‘নির্মাণাধীন আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ প্রকল্প : একটি আর্থ-সামাজিক সমীক্ষা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা উপেক্ষা করে তিনফসলি জমিতে বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ গাছপালাসহ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। যার কারণে সেই এলাকার তরমুজসহ অন্যান্য শাকসবজি পচে এবং কালো হয়ে যাচ্ছে।  

গবেষণায় ৯৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে আবহাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে তারা উদ্বিগ্ন। গবেষণায় মাঠ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আশপাশের মাটির স্বাস্থ্যের পরিবর্তন ও অবনতি ঘটছে। মাটির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে প্রশ্নে মোট ৮২ শতাংশ এই নির্মাণকাজের কারণে মাটির দূষণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।  এ ছাড়া ৭৯ শতাংশ বায়ুর মানের অবনতির জন্য উদ্বেগের সঙ্গে উত্তর দিয়েছে।  

সংবাদ সম্মেলনে বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, বিরূপ প্রভাবে ইতিমধ্যে ইলিশ মাছের সাইজ ছোট হয়ে যাচ্ছে। ইলিশ প্রজননের পথ পরিবর্তন করে ফেলছে। এটার মূল কারণ সেখানকার পরিবেশদূষণের ফলে বাস্তুসংস্থানের পরিবর্তন। তিনি বলেন, জনসাধারণের ধারণা, প্রকল্পটি শেষ হলে জলযানের ঘন ঘন চলাচল এবং দূষণ বৃদ্ধির কারণে ওই এলাকা থেকে মাছ গভীর সাগরে চলে যাবে। একই কারণে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। আর কর্মসংস্থান ও বসতভিটা হারিয়ে সেখানকার বহু মানুষ উদ্বাস্তু হবে।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওমেট্রিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আশিকুর রহমান। আশুগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট সম্পর্কে স্থানীয় নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তা-ভাবনা শনাক্ত করার জন্য একটি সত্য অনুসন্ধান মিশনের অংশ হিসেবে ওই সংক্ষিপ্ত গবেষণাটি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।  

তিনি বলেন, ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য কাঠামোগত উন্নয়ন শুরু হয়নি। ২০২২ সালের এপ্রিলে বালু ভরাটের কার্যক্রম শুরু হয়। ক্ষতিপূরণ ছিল সর্বনিম্ন ৬০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩৭ লাখ টাকা। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সর্বাধিক ৮৪ শতাংশ উত্তর দিয়েছে, ক্ষতিপূরণের আনুমানিক পরিমাণ সঠিক নয়। স্থানীয় দালালরা অবৈধ প্রক্রিয়ার অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের চেষ্টা করছে।  

অধ্যাপক আশিকুর রহমান বলেন, পুনর্বাসনের জন্য তারা ভূমি অধিগ্রহণ অফিস, ভূমি জরিপকারী এবং ভূমি অধিগ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য খাতে ঘুষ হিসেবে দালালকে সর্বনিম্ন ৪৪ হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রদান করেছে। তিনি আরো প্রকল্পের নির্মাণের কারণে অংশগ্রহণকারীদের আশঙ্কা, মাছ অনেক দূরে চলে যাবে, তাই তাদেরকে তাদের জীবিকা পরিবর্তন করতে হবে। পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে থাকা অবস্থায় নদীতে মাছ ধরা সম্ভব নয় এবং তাদের জীবিকা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।  

উপকূলীয় অঞ্চলে আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে আশিকুর রহমান বলেন, ৯৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের ক্রমবর্ধমান উত্তর এবং মিডিয়া রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে, ওই এলাকার মানুষ বঙ্গোপসাগর থেকে তীব্র আবহাওয়ার ধরন, কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের ব্যাপক ভাঙন, ডলফিন ও জলজ প্রাণীর মৃত্যু এবং সেই সঙ্গে পরিবর্তিত অভিবাসন পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। নিকটবর্তী এলাকায় ইলিশের প্রজননকেন্দ্র রয়েছে।

নির্মাণকাজের সাংস্কৃতিক প্রভাব সম্পর্কে আশিকুর রহমান বলেন, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৬০ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা সম্পর্কে উত্তর দিয়েছে। উত্তরদাতারাও সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে চিন্তিত। সমীক্ষায় ৭৯ শতাংশ জানিয়েছে, এই প্রকল্প নির্মাণের কারণে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ আক্রমণ করতে পারে এবং ৬৯ শতাংশ উত্তরদাতারা প্রকল্পের কারণে সম্ভাব্য গুরুতর শব্দদূষণ সমস্যা হবে বলে মত দিয়েছে।  

ওই এলাকার ভুক্তভোগী এক কৃষক ফরিদ তালুকদার বলেন, 'প্রকল্প এলাকায় অধিকাংশই তিনফসলি জমি। প্রকল্পে যত জমি প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীসহ বিশেষজ্ঞেরা বলেছেন কৃষিজমিতে কোনো বিদ্যুৎ নয়। প্রধানমন্ত্রী ও কৃষিবিদরা বলেন একটা, চামচারা করে আরেকটা। কিছু বললে তারা করে মামলা। আর বলে সরকারি প্রজেক্ট। স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও জমির ন্যায্য মূল্য না পাওয়াসহ আমরা নানা ধরনের সমস্যায় ভুগছি। তাই এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। '

বাপার নির্বাহী সদস্য এন এস সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তৃতা করেন সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার, নির্বাহী সদস্য ইবনুল সাঈদ রানা প্রমুখ।



সাতদিনের সেরা