kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

টাকার মান আরো কমানো হলো, আমদানিতে লাগাম টানার পরামর্শ

মাসুদ রুমী    

২৪ মে, ২০২২ ০৮:২২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



টাকার মান আরো কমানো হলো, আমদানিতে লাগাম টানার পরামর্শ

ডলারের ঘাটতি বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি করেছে। এ অবস্থায় ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরো কমানো হয়েছে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক আন্ত ব্যাংক বিনিময় হার প্রতি মার্কিন ডলার ৪০ পয়সা বাড়িয়ে ৮৭.৯০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ছয়বার টাকার অবমূল্যায়ন করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিজ্ঞাপন

শুধু আন্ত ব্যাংক লেনদেনে ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে ৩ শতাংশের বেশি।

ডলারের দাম আরেক দফা বাড়ানোয় রপ্তানিকারক ও প্রবাসীরা লাভবান হবেন। অন্যদিকে আমদানিকারকদের খরচ বাড়বে। এ ছাড়া কাঁচামাল আমদানি ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশে পণ্য উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে।

করোনা মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যাহত হয়, যা পরবর্তীকালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থায় চলমান অস্থিরতার জন্য উচ্চ আমদানি ব্যয়কেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, দেশের আমদানি খরচ বাড়ায় ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ সেই সংকট আরো গভীর করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রবাস আয় কমে যাওয়া।

এমন পরিস্থিতিতে টাকার অবমূল্যায়নের পথকেই আপাত সমাধান হিসেবে বেছে নিচ্ছে অনেক দেশ। দেশেও স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার বিক্রি করছে। আর ডলারের চাহিদা বেশি হওয়ায় ধীরে ধীরে দামও বাড়াতে হচ্ছে। এতে টাকার মান কমছে। ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে এক বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, প্রয়োজনে টাকার আরো অবমূল্যায়ন হতে পারে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার মান সোমবার আরো কমানো হয়েছে। এটা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে করা হলো। কারণ মার্কেটে যদি বেশি গ্যাপ (ডলার ও টাকার ব্যবধান) থাকে, তাহলে যারা রেমিট্যান্স পাঠাবে তারা অস্বস্তিতে পড়বে।

পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে সিরাজুল ইসলাম বলেন, বেশির ভাগ জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। জাহাজভাড়াও বেড়েছে। যার কারণে ডলারের সঙ্গে টাকার মানের ব্যবধান বাড়ছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টাকার অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।

টাকার মান আরো কমানো হবে কি না জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ‘খুব কম সময়ে আমাদের কয়েক দফা অবমূল্যায়ন করতে হলো। সময়ই বলে দেবে কী করতে হবে। তবে  অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা অবমূল্যায়ন কম করেছি। ভারত, পাকিস্তান, চীন, জাপান, ইউরোপে অনেক দেশের তুলনায় এ ক্ষেত্রে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। ’

এর আগে গত সোমবার ৮০ পয়সা বাড়িয়ে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়েছিল। এ নিয়ে চলতি মে মাসেই তৃতীয়বারের মতো কমানো হলো টাকার মান। এতে তিন দফায় ডলারের দাম বাড়ল এক টাকা ৪৫ পয়সা।

গত জানুয়ারির শুরুতে ডলারের বিনিময়মূল্য ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮৬ টাকা করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২৩ মার্চ তা আবার ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮৬ টাকা ২০ পয়সা করা হয়। গত ২৭ এপ্রিল বাড়ানো হয় আরো ২৫ পয়সা। তখন এক ডলারের বিনিময়মূল্য দাঁড়ায় ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সা। ৯ মে ডলারের বিনিময়মূল্য ২৫ পয়সা বাড়িয়ে ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এরপর গত ১৬ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক দিনে সবচেয়ে বড় অবমূল্যায়ন করা হয় টাকার। সেদিন টাকার মান ৮০ পয়সা কমিয়ে ডলারের বিপরীতে করা হয় ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা।

তথ্য বলছে, সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে নিজস্ব মুদ্রার মূল্যমান কম হ্রাস পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে এশিয়াসহ বিশ্বে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে আর বিশ্বের সব উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম স্থানে আছে। বাংলাদেশি টাকার মূল্যমান কমেছে ৩.৪১ শতাংশ, ভারতীয় রুপির কমেছে ৬.৮৩ শতাংশ, পাকিস্তানি রুপির ৩০.৬৩ শতাংশ, নেপালি রুপির ৬.৪৮ শতাংশ, মিয়ানমার কিয়াটের ১২.৬৭ শতাংশ, চীনা ইউয়ানের ৫.৪ শতাংশ, থাই বাথের ৯.৬৬ শতাংশ, জাপানি ইয়েনের ১৭.৩২ শতাংশ, দক্ষিণ কোরীয় উয়ানের ১২.০৭ শতাংশ, মালয়েশিয়ান রিংগিতের ৩.৯ শতাংশ ও ফিলিপিনো পেসোর ৯ শতাংশ।

এ ছাড়া টার্কিশ লিরার ৮৯.৩৭ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ান ডলারের ৯.১৭ শতাংশ, ব্রিটিশ পাউন্ডের ১১.৮৬ শতাংশ, ইউরোর ১৩.৪০ শতাংশ, সুইস ফ্রাঙ্কের ৮.৫৫ শতাংশ, সুইডিশ ক্রোনারের ১৯.৬৭ শতাংশ, নরওয়েজিয়ান ক্রোনের ১৬.৫৪ শতাংশ, ডেনিশ ক্রোনের ১৫.৩৯ শতাংশ, কানাডিয়ান ডলারের ৬.৩২ শতাংশ, আর্জেন্টাইন পেসোর ১১.৫ শতাংশ ও চিলিয়ান পেসোর কমেছে ১৫.৪৪ শতাংশ।

খোলাবাজার বেশি অস্থির

খোলাবাজারে সম্প্রতি ডলারের দাম ইতিহাসের রেকর্ড ভঙ্গ করে ১০৪ টাকায় উঠে যায়। যদিও গতকাল কার্ব মার্কেটে ৯৮ টাকা থেকে ৯৯ টাকা ছিল ডলারের দর। বাংলাদেশে বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান মুদ্রাটির আন্ত ব্যাংক লেনদেন হার বা মান ৮৭.৫০ টাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে খোলাবাজারে আন্ত বাজার বিনিময় হার ছিল ৯৭.৫০ টাকা।

ব্যয় সংকোচন এবং ডলারের ওপর চাপ কমাতে অতি জরুরি প্রকল্প ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে অর্থায়নে সতর্কতা অবলম্বন করছে সরকার। পাশাপাশি কর্মকর্তা ও ব্যাংকারদের বিদেশ ভ্রমণও সীমিত করা হয়েছে। বিলাসপণ্যের পেছনে খরচ কমিয়ে আনতে আমদানিতে এলসি মার্জিন বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

পরামর্শ

বর্তমান সংকট মোকাবেলায় টাকার অবমূল্যায়নের পাশাপাশি আরো কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংককে টাকার অবমূল্যায়নের পাশাপাশি আমদানিতে আরো লাগাম টানতে হবে। অপ্রয়োজনীয় আমদানি একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে। অর্থপাচার হচ্ছে কি না, সেটি শক্তভাবে মনিটর করতে হবে। রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে আশপাশের দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, আমদানি ব্যয়বহুল হলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। আবার রপ্তানিকারকরা খুশি হবে বলে টাকার অবমূল্যায়ন করে যাব—এটাও ঠিক নয়। শুধু অবমূল্যায়নের পাশাপাশি বর্তমান সমস্যা সমাধানের জন্য কার্ব মার্কেটের সঙ্গে ব্যবধান কমাতে হবে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এমন সংকট আগে কখনো হয়নি। করোনা ও যুদ্ধের কারণে এটা হয়েছে। আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয়ের ব্যবধান বেশি হয়ে গেছে। তাই এখনই বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিতে হবে।



সাতদিনের সেরা