kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

বিরল মাংকিপক্সের প্রাদুর্ভাব : আমাদের করণীয়

ড. কবিরুল বাশার   

২২ মে, ২০২২ ০৩:৩৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিরল মাংকিপক্সের প্রাদুর্ভাব : আমাদের করণীয়

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য, পর্তুগাল, স্পেন এবং অন্য কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে মাংকিপক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। শনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা বিচারে সংক্রমণ এবং বিস্তার খুব বড় নয়। এখন পর্যন্ত ৬৮ জন সন্দেহভাজন রোগী, যার মধ্যে আটজন ইংল্যান্ডে এবং ২০ জন পর্তুগালে। কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজন করে রোগী রিপোর্ট করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আফ্রিকার বাইরে একসঙ্গে এতগুলো দেশে মাংকিপক্সের সংক্রমণ এটিই প্রথম। এটি পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া, সিয়েরা লিওন এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে এন্ডেমিক। নিয়মিত স্থানীয় রোগী শনাক্ত হয়। ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত নাইজেরিয়ায় মোট ৫৫৮ জন মানুষের দেহে মাংকিপক্স শনাক্ত করা হয়েছে। নাইজেরিয়ান সিডিসি এ বছর ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৫ জন রোগী শনাক্ত করেছে, যদিও মূল আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। কঙ্গোতে এ বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এক হাজারের বেশি মাংকিপক্সের রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।

এই রোগটির সংক্রমণ ও বিস্তার সম্পর্কে পরিপূর্ণ সঠিক ধারণা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নেই। যৌন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে যে ভাইরাসটি মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে যেকোনো মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে অথবা ছড়িয়ে পড়েছে, যা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। ইউরোপ ও আমেরিকায় কিভাবে লোকজন এই ভাইরাসে সংক্রমিত হলো, জরুরি ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

মাংকিপক্স একটি ভয়াবহ রোগ হয়ে যেতে পারে। এটি জ্বর, শরীরে ব্যথা, বর্ধিত লিম্ফ নোড এবং মুখ, হাত ও পায়ে বেদনাদায়ক, তরল ভরা ফোসকা সৃষ্টি করে।

মাংকিপক্সের একটি টাইপ বেশ মারাত্মক, যেটি সংক্রমিত ১০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে। বর্তমানে ইংল্যান্ডের টাইপটি মৃদু। এর মৃত্যুর হার ১ শতাংশের কম।

পশ্চিম আফ্রিকা ও মধ্য আফ্রিকা প্রাণী থেকে মাংকিপক্সে মানবদেহে সংক্রমিত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তার লাভ করেছে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি সংক্রমণ সহজ নয়, কারণ এর জন্য শারীরিক তরলের সঙ্গে সংস্পর্শ প্রয়োজন; যেমন—কাশি থেকে লালা বা ক্ষত থেকে পুঁজ। সুতরাং সাধারণ জনগণের ঝুঁকি কম। কিন্তু ইংল্যান্ডে, আটটি ক্ষেত্রে সাতটি সাম্প্রতিক রোগীর আফ্রিকা ভ্রমণের ইতিহাস নেই। এ ক্ষেত্রে তারা ইংল্যান্ডে সংক্রমিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উপরন্তু এই ব্যক্তিরা এমন কোনো রোগীর সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে আসেনি, যারা নাইজেরিয়া ভ্রমণ করেছে। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, ভাইরাসটি কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু শনাক্ত করা হয়নি।

ভাইরোলজিস্ট অ্যাঞ্জি রাসমুসেনের ধারণা মতে, এটি আক্রান্ত দেশ থেকে আসা একজন রোগীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যাকে শনাক্ত করা যায়নি। ভাইরাসটি একটি নতুন সংক্রমণমাধ্যমে, বিশেষ করে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন পুরুষদের মধ্যে রোগটি শনাক্ত করা হয়েছে, যারা সমকামী, উভকামী বা পুরুষদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষ।

ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের বিজ্ঞানীরা ইউরোপের প্রাদুর্ভাব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁরা বলছেন, এটি সাধারণ মাংকিপক্স থেকে আলাদা।

২০১৯ সালে ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মাংকিপক্সের প্রথম ভ্যাকসিন অনুমোদন করে, যা গুটিবসন্ত থেকেও রক্ষা করে। এই ভ্যাকসিনটি স্ট্র্যাটেজিক ন্যাশনাল স্টকপাইলের (এসএনএস) অংশ, যা জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য সম্ভাব্য জীবন রক্ষাকারী ওষুধ।

নাম মাংকিপক্স হলেও এই ভাইরাসটি সত্যিকার অর্থে বানর থেকে আসে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটিকে ‘রডেন্টপ’ বলা উচিত। কারণ এটির মূল রিজার্ভার ইঁদুর শ্রেণির প্রাণী। ১৯৫৮ সালে বানরের দুটি কলোনি থেকে প্রথম মাংকিপক্স শনাক্ত করা হয় এবং বানরের রোগ হিসেবে এই নামে তখন নামকরণ হয়। ১৯৭০ সালে কঙ্গোতে প্রথম মানবদেহে এই রোগটি শনাক্ত হয়। এই ভাইরাসটির প্রধান বাহক বানর নয়। এটি কাঠবিড়ালি, থলিযুক্ত ইঁদুর, ডর্মিস বা অন্য ইঁদুরের মধ্যে থাকতে পারে।

প্রাথমিকভাবে পশুর কামড়, আঁচড় বা প্রাণীর শারীরিক তরলের সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। ভাইরাসটি কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে বা ক্ষত থেকে পুঁজের সংস্পর্শে অন্য লোকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

মাংকিপক্সের ক্ষতগুলো গুটিবসন্তের সংক্রমণের মতোই হয়। এর সংক্রমণের হার গুটিবসন্তের তুলনায় অনেক কম। বর্তমান প্রাদুর্ভাবে সংক্রমণের হার বেড়েছে কি না বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না।   

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রিমোইনের মতে, এই রোগটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হতে পারে। তবে এটিকে মোকাবেলা করার জন্য এর সঠিক সংক্রমণমাধ্যম এবং সঠিক শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গুটিবসন্ত ভ্যাকসিন আসলে মাংকিপক্স থেকে মানুষকে রক্ষা করতে বেশ ভালো কাজ করে। এটি প্রায় ৮৫ শতাংশ কার্যকর, যদিও গুটিবসন্ত ভ্যাকসিনের কিছু নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে। কারণ এটি একটি জীবন্ত ভাইরাস এবং এটি দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটাতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন ব্যবহার না করার কারণে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে মাংকিপক্সের সংক্রমণের হার বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, ২০২০ সালে প্রায় চার হাজার ৬০০ সন্দেহভাজন রোগী ছিল, যাদের শরীরে স্মলপক্সের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়নি বা যারা স্মলপক্স ভাইরাসে আক্রান্ত হয়নি, তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

এই ভাইরাস স্মলপক্স ভাইরাসের মতো এপিডেমিক বা প্যান্ডেমিক হওয়ার সামর্থ্য রাখে কি না সে বিষয়ে আরো বিস্তারিত গবেষণা করা দরকার। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদেরও সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। এ রোগের কাছাকাছি কোনো লক্ষণ দেখা দিলে মাংকিপক্সের বিষয়টিও যেন বিবেচনায় রাখা হয়। যেসব দেশে এই ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে এবং আক্রান্তের হার বাড়ছে, সেসব দেশ থেকে আসা যাত্রীদের বিশেষ নজরদারির মধ্যে রাখা প্রয়োজন। আগাম প্রতিরোধব্যবস্থাই যেকোনো সংক্রমণ ঠেকাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

লেখক : অধ্যাপক, গবেষক, কীটতত্ত্ববিদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]



সাতদিনের সেরা