kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ জরুরি

মো. শফিকুল ইসলাম   

১৯ মে, ২০২২ ০৪:৩১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ জরুরি

সমাজে দিন দিন আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা বর্তমানে মারাত্মক পর্যায়ে রয়েছে, যা সমাজ, দেশের জন্য বড় ক্ষতি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু জরিপভিত্তিক গবেষণায় বিষয়টি উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

করোনাকালে আত্মহত্যার সংখ্যা অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত সম্পর্কের টানাপড়েন, পারিবারিক কলহ, পড়ালেখার চাপ, আর্থিক অনটন ইত্যাদি কারণে আত্মবিধ্বংসী পদক্ষেপ নিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আত্মহত্যার কারণের মধ্যে বেশ কিছু উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সম্পর্কের অবনতির কারণে আত্মহনন করেছেন ২৪.৭৫ শতাংশ এবং পারিবারিক সমস্যার কারণে ১৯.৮০ শতাংশ। মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ১৫.৮৪ শতাংশ, পড়াশোনাসংক্রান্ত কারণে ১০.৮৯ শতাংশ, আর্থিক সমস্যায় ৪.৯৫ শতাংশ, মাদকাসক্ত হয়ে ১.৯৮ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণে ২১.৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। করোনাকালে অনিশ্চয়তা এসব টানাপড়েনকে আরো প্রকট করে তোলে। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পরিসংখ্যানে। শুধু যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, তা নয়, স্কুল, কলেজ ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ২০২১ সালে ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে, ৬১.৩৯ শতাংশ, ৬২ জন। এ ছাড়া মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন (১১.৮৮ শতাংশ), প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন (৩.৯৬ শতাংশ) এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩ জন (২২.৭৭ শতাংশ) শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

একজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা একটি পরিবারের স্বপ্ন হত্যা। আমাদের অবহেলা বা কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় অকালে আমরা আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের হারাচ্ছি, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

অনেক আত্মহত্যার পেছনে রয়েছে মানসিক রোগ। অনেক শিক্ষার্থীকে তাঁর শারীরিক গঠন, উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি বা অন্য অনেক কারণে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। এমনকি তাঁর পোশাক নিয়ে ঠাট্টা করতে দেখা যায়, যা একসময় ওই শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। ছেলেমেয়েরা কী করে এবং কোথায় যায় সে ব্যাপারে অভিভাবকদেরও অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

সর্বশেষ ২০১৮-১৯ সালে মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ বা দুই কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নানা ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত। ১০০ জনের মধ্যে সাতজন ভুগছেন বিষণ্নতায়। অথচ অবাক করা বিষয়, এর ৯২ শতাংশ রয়েছে চিকিৎসার আওতার বাইরে। অন্যদিকে ১৩.৬ শতাংশ শিশু মানসিক রোগে ভুগছে বলে এক জরিপে উঠে এসেছে, যাদের ৯৪ শতাংশ কোনো চিকিৎসা পাচ্ছে না। তাই চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে হবে। আবার আমাদের অনেক মানুষ রয়েছে, যারা পরিস্থিতি অনেক গুরুতর হলে চিকিৎসকের কাছে যায়।

পরিবর্তিত পরিস্থিতি, পারিবারিক ও সামাজিক সহযোগিতার অভাবকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পড়াশোনার পদ্ধতি অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীবান্ধব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও প্রয়োজনীয় অনেক কিছু এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। আমরা শিক্ষার্থীদের বনিয়াদি শিক্ষা দিতে পারছি না। আবার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিংয়ের নামে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করে থাকে, যা এক পর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। র‌্যাগিংয়ের দায়ে আমার কর্মস্থান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও অন্য সব ধরনের কার্যক্রম থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় দুটি মেসে দুই শিক্ষার্থীকে র‌্যাগিং করা হয়। এতে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ রকম ঘটনা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে থাকে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে র‌্যাগিংবিরোধী আইন হওয়া জরুরি।

আত্মহত্যা স্বাস্থ্য বা দেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হলেও সমাজ বা রাষ্ট্র বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক মিলিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য। আমরা অন্য রোগ প্রতিরোধে যেভাবে কাজ করছি, আত্মহত্যা প্রতিরোধে গবেষণা বা তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। তাই আত্মহত্যার প্রতিরোধে ব্যাপক গবেষণা হওয়া জরুরি এবং সে বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।

সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বাস্তবমুখী কিছু জ্ঞান, যেমন—আর্থিক সহযোগিতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাসফর ব্যবস্থা করা, আনন্দের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা, উদ্যোক্তা তৈরিতে নিয়মিত কর্মশালা, ক্যারিয়ারবিষয়ক দক্ষতা উন্নয়ন আত্মহত্যা কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করি। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে এখনই পদক্ষেপ নিতে না পারলে ভবিষ্যতে আমাদের অনুশোচনা করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সংখ্যক শিক্ষক বা শিক্ষার্থী রয়েছে তাতে প্রতি বিভাগ বা অনুষদে একজন মনোবিজ্ঞানী থাকা একান্ত প্রয়োজন। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানী নেই বললেই চলে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে একজন মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দেওয়া জরুরি হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোবিজ্ঞানী নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। আইন প্রণয়ন করে মনোবিজ্ঞানী পদ সৃষ্টির মাধ্যমে খুব দ্রুত প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজিস্ট নিয়োগের ব্যবস্থা করা হোক।

লেখক : সাবেক সভাপতি, শিক্ষক সমিতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ



সাতদিনের সেরা