kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

স্মরণ

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : সংস্কারমুক্ত আধুনিক মানুষ

সৌমিত্র শেখর   

১৪ মে, ২০২২ ০৩:৪৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অধ্যাপক আনিসুজ্জামান : সংস্কারমুক্ত আধুনিক মানুষ

আলোকিত মানুষ অনেকেই আছেন, কিন্তু আলোক-মানুষ আছেন খুব কম। আনিসুজ্জামান একজন আলোক-মানুষ; যাঁর নিজেরই ছিল গভীর দীপ্তি আর প্রগাঢ় উজ্জ্বলতা। তাঁর নামটি আমি প্রথম দেখেছি বাবার বইয়ের তাকে থাকা কাপড় দিয়ে বাঁধানো একটি বইয়ে, যেটি এখন আমার প্রযত্নে। ভারতভাগ-উত্তর দাঙ্গা, মুক্তিযুদ্ধকালে লুট—এসব কারণে ঘরবাড়িসহ অনেক কিছু জলাঞ্জলি দেওয়ার পরও বাবা যে সম্পদগুলো শেষ পর্যন্ত অন্যের হাত থেকে উদ্ধার করতে পেরেছিলেন, সেখানে ছিল ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’ (১৭৫৭-১৯১৮) নামের একটি কাপড়ে বাঁধাই করা গ্রন্থ।

বিজ্ঞাপন

১৯৩৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা আনিসুজ্জামান দেশভাগের পর চলে আসেন পূর্ব বাংলায়। মাত্র ১৫ বছর বয়সে যুক্ত হন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে। ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনগ্রন্থে লেখেন ‘দৃষ্টি’ নামে একটি ছোটগল্প। এটিও ঐতিহাসিক সংশ্লিষ্টতা। এরপর পূর্ব পাকিস্তানে সাংস্কৃতিক আন্দোলন-সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্রবর্জন পরিকল্পনার প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। ১৯৬৮ সালে সম্পাদনা করেন ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামে একটি বিপুলায়তনের গ্রন্থ। এর পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি চলছিল বেশ আগে থেকে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত প্রকাশিত সব দিক থেকে রবীন্দ্রনাথকেন্দ্রিক সেরা গ্রন্থ এটি। লিখেছিলেন : মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, রণেশ দাশগুপ্ত, জসীমউদ্দীন, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, হায়াৎ মামুদ প্রমুখ। আর যুক্ত হয়েছিল মরমিবাদ থেকে মার্ক্সবাদকেন্দ্রিক রবীন্দ্র-মূল্যায়ন। সেই সময় এই গ্রন্থটি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামীদের প্রাণে রবীন্দ্রালোক প্রজ্বলিত করে। মুক্তিযুদ্ধকালে আনিসুজ্জামান কলকাতায় গিয়ে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করেন। সে সময় প্রবাসী শিক্ষক সমিতি গঠন করে শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধও করেন তিনি। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচনার সঙ্গে যুক্ত হন। বঙ্গবন্ধু গঠিত কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সদস্যও ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেশে যে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনা হয়, এর প্রতিবাদকারী সুধীসমাজের একজন হয়ে এগিয়ে আসেন সামনের সারিতে। পত্রপত্রিকায় তাঁর সেই কর্মকাণ্ডের সংবাদ আর লেখালেখি পাঠ করে আমিও কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পৌঁছাই। বিশ শতকের আটের দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন, নয়ের দশকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির সমাবেশ, পরে বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষার লড়াই—সর্বত্র অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের অবস্থান আমাকে তাঁর প্রতি অনুরাগী করে তোলে। তাঁর ছাত্র না হয়েও ‘বাংলার ছাত্র’ হিসেবে গর্ব হতো। এই গর্ব গগনস্পর্শী হয়েছিল, যখন (২০১২) তিনি আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। সমাবেশ বা সেমিনার কোনো বক্তৃতায় তিনি উত্তেজনা ছড়াতেন না; কিন্তু মনে প্রতিবাদের আগুন পুরে দিতেন।   

তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয় ১৯৯৬ সালে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যখন আমি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মধ্যে আনিসুজ্জামানের ছিল প্রায় দেবতুল্য প্রভাব। বাংলা বিভাগেও তা ছিল। ‘বাঘ-হরিণের এক ঘাটে জল’ খাওয়ার কথা বইয়েই পড়েছিলাম, বাস্তবে দেখিনি। বাংলা বিভাগে পরস্পর চরম শত্রুভাবাপন্ন সহকর্মীও কিন্তু অভিন্নভাবে আনিসুজ্জামানভক্ত—এটি বাঘ-হরিণের সেই প্রবাদকেই মূর্ত করেছিল। এমনটিই ছিল তাঁর সম্মোহনী শক্তি। বাঘ আর হরিণের সখ্য হয়নি শেষ পর্যন্ত; কিন্তু আনিস-সরোবর থেকে দুই পক্ষই পেয়েছিল পিপাসার বারি। তিনি দুই পক্ষকেই ধারণ করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, স্নেহের কমতি তাঁর ছিল না।

আনিসুজ্জামান মিতবাক ছিলেন, ছিলেন স্বভাবে অকপট। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যেমন প্রভাবে দেবতুল্য ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রভাবটি তেমন ছিল না। অবশ্য প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাও তিনি করেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে তিনি যুক্ত হননি। সেটি বরং ভালোই ছিল। আনিসুজ্জামান ছিলেন জাতীয় ব্যক্তিত্ব, তিনি কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র শিক্ষক রাজনীতিতে জড়াবেন? ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাই সব দল-মতের শিক্ষকই শ্রদ্ধা করতেন তাঁকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তিনি যোগদান করেছিলেন ১৯৫৯ সালে। ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে আবার ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন।

বিশ্ববিদ্যালয় পরিমণ্ডলের বাইরে নানা ধরনের আড্ডা আর বৈঠকে তাঁর সঙ্গে বহুবার আমি বসার সুযোগ পেয়েছি। তখন পরিচয় পেয়েছিলাম তাঁর সংস্কারমুক্ত আধুনিক মনের। আচরণে প্রগলভতা তিনি দেখাননি, কিন্তু পেয়েছি তাঁর মধ্যে আন্তরিকতার সুস্নিগ্ধ সুরস। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গভীরভাবে স্মৃতিধর ছিলেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো দিনক্ষণ, নামধাম যথাযথভাবে বলে যেতে পারতেন। জ্ঞান আহরণপথে নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনো সন্দেহ জাগলে স্যারকে জিজ্ঞেস করে ঠিকই পথ পেয়ে যেতাম আমি। ব্যস্ততার কারণে ফোন ধরতে না পারলে পরে তিনি ফিরতি ফোন করতেন। তাঁর এই গুণটি আমাকে মুগ্ধ করত সব সময়।

অনেকেই মনে করেন, তিনি শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়েই ভাবিত। কিন্তু নজরুল-সাহিত্য, বিশেষ করে বাঙালি সমাজে নজরুলের উপযোগিতা সম্পর্কেও অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন গভীরভাবে আস্থাশীল। নিয়ম ও সময়ানুবর্তিতার চলমান দেবতা ছিলেন তিনি, ছিলেন লেখা ও বলায় গভীরভাবে সংযমী। বড় বড় লেখা তিনি লিখতেন না; বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রচুর বলতেনও না। কিন্তু তাঁর ছোট লেখায়ও থাকত অনুসন্ধান আর সিদ্ধান্তের আলো, স্বল্প কথার বক্তব্য শেষ হওয়া মাত্র শ্রোতার মূলকথাটি জানা হয়ে যেত। এমনই চৌম্বকশক্তি ছিল তাঁর বলায় ও লেখায়।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তাঁর রচন, বচন ও আচরণে যে আলোক-জীবন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তা বাঙালি সমাজকে পথ দেখাবে বহুদিন।

লেখক : উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ



সাতদিনের সেরা