kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় : কতটা শিক্ষা, কতটা বাণিজ্য

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী   

১১ মে, ২০২২ ০৩:৩৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় : কতটা শিক্ষা, কতটা বাণিজ্য

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তাদের অনেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে দেশে উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযাত্রী হিসেবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায়। দেশে তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেকেই সন্তানদের বিদেশে না পাঠিয়ে দেশেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সম্ভাবনা দেখতে পায়।

বিজ্ঞাপন

যে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় তখন যাত্রা শুরু করেছিল, সেগুলোর প্রতি দুই ধরনের আশঙ্কা শিক্ষা সচেতনমহলের ছিল। এক. বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার নামে বাণিজ্যের ফাঁদ পাড়তে পারে। দুই. উচ্চশিক্ষার মান নিচে নামিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় ভূমিকা রাখতে পারে। গত ৩০ বছরের অভিজ্ঞতায় স্বল্পসংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলকভাবে উচ্চশিক্ষা প্রদানে ভূমিকা রাখলেও বেশির ভাগই শিক্ষার চেয়ে মানহীন শিক্ষা সনদ প্রদানের সেন্টারে পরিণত হয়েছে।   

বাংলাদেশে এখন ১০৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর বাইরে বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের দুর্নীতি, অযোগ্যতা, শিক্ষার নামে লাগামহীন বাণিজ্য এবং সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এখন যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সেগুলোরও বেশির ভাগই ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধি-বিধান খুব একটা অনুসরণ করছে না। স্বল্পসংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্যাম্পাস, শিক্ষক এবং মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে অনেকেরই প্রত্যাশা পূরণ করছে। তবে স্বল্পসংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কয়েকটির শিক্ষা ব্যয় শুধুই উচ্চবিত্তের অভিভাবকরা বহন করতে পারছে। ওই সব বিশ্ববিদ্যালয় অনেক আগেই মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

ফলে অনেক আগে থেকেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও শ্রেণিবিভাজন সৃষ্টি হতে দেখা গেছে। লেখাপড়ার মানের মধ্যে যেমন রয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই এখনো সার্টিফিকেটসর্বস্ব মানের পর্যায়ে অবস্থান করছে। ওই সব প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় নাম ভাঙিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে বাগিয়ে নিচ্ছে। অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরাও মানহীন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক লাভে ভূমিকা রাখছেন। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার মানের এক ধরনের ব্যবস্থা ও আয়োজন করার ফলে উচ্চবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্তের অভিভাবকরা কিছু কিছু অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফিসহ শিক্ষাসংক্রান্ত নানা ধরনের উচ্চ ব্যয় বহন করার চেষ্টা করে থাকে। এভাবেই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোনো কোনোটি অধিকতর লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড আর্টিকলস (রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনস) অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় একটি দাতব্য, কল্যাণমুখী, অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু স্বল্পসংখ্যক কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই শর্ত কতটা পূরণ করছে সেটি মোটেও অজানা বিষয় নয়। যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপেক্ষাকৃত সুনাম সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বছরে একাধিক সেমিস্টারে ভর্তি হচ্ছেন। সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, চাকচিক্য, অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া সেমিস্টার ও টিউশন ফিসহ নানা খাতে আদায়কৃত অর্থেরই মূল উৎস—এতে কোনো সন্দেহ নয়। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দু-তিনটি ধারায় বিভক্তি রয়েছে। একটি ধারা উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের শিক্ষার চাহিদাকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিনিময়ে পূরণ করছে। আরেকটি ধারা, মাঝারি অবস্থানে শিক্ষার নামে ব্যবসাকে সমান্তরালভাবে বাগিয়ে নিচ্ছে। অন্য ধারার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রধানত অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা সনদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করছে। তিনটি ধারার মধ্যেই বাণিজ্যিক মনোভাব বিশেষভাবে কার্যকর রয়েছে। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠাকালে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার সামান্যই হয়তো কেউ কেউ পালন করার চেষ্টা করছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান, পরিবেশ, ব্যবস্থাপনাগত আয়োজন নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করার নানা উদ্যোগ নিয়ে থাকলেও আইন ও বিধি-বিধানের নানা ফাঁকফোকর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষ নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করার পথ থেকে খুব বেশি বিরত থাকছে না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই আইন কার্যকর করতে গড়িমসি এবং নানা অজুহাত দেখিয়ে চলছে। প্রায় সব কয়টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে মালিকের প্রভাব, ইচ্ছা-অনিচ্ছা এবং ফাঁকফোকরের আশ্রয় গ্রহণের মাধ্যমে। আবার কোনো কোনোটি বিধিবদ্ধ পর্ষদ কিংবা কর্তৃপক্ষের শর্ত পূরণ দেখালেও মালিকের প্রভাব এবং ইচ্ছা পূরণ করার বাইরে কোনো পর্ষদ, উপাচার্য ও অন্যান্য পদে অবস্থিত ব্যক্তিরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে মোটেও সক্ষম নন।

ফলে একেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস্তবতা যেমন একেক রকম, সেগুলোর ভূমিকাও যার যার মতো। কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক মানদণ্ড ও আদর্শ খুব একটা মিলিয়ে দেখার সুযোগ নেই। সুতরাং এগুলোর জবাবদিহি করার কর্তৃপক্ষ একমাত্র মালিকরাই নিজেদের মতো করে সাজিয়ে থাকেন। সেখানে রাষ্ট্রীয় আইন, ইউজিসি বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধি-বিধান খুব একটা অনুসৃত হয় না। এগুলোর মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান বোর্ড অব ট্রাস্টিজের নামে পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর সব ক্ষমতা ও আর্থিক হিসাব-নিকাশ মালিকপক্ষ নিজেদের মতো করেই ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। দুদক এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড ও ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ৩০৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলের টাকা আত্মসাতের হীন উদ্দেশ্যে কম দামে জমি কেনা সত্ত্বেও বেশি দাম দেখিয়ে তারা প্রথমে বিক্রেতার নামে টাকা প্রদান করেন। পরে বিক্রেতার কাছ থেকে নিজেদের লোকের নামে নগদ চেকের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে আবার নিজেদের নামে এফডিআর করে রাখেন এবং পরবর্তী সময়ে নিজেরা উক্ত এফডিআরের অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন। অবৈধ ও অপরাধলব্ধ আয়ের অবস্থান গোপনের জন্য উক্ত অর্থ হস্তান্তর ও স্থানান্তর মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধও সংঘটন করেন। ’

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে দেশে আগাগোড়াই দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এক. বিশ্ববিদ্যালয়টি ধনী অভিভাবকদের আকৃষ্ট করতে পেরেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার জন্য বেশ অর্থ ব্যয় করতে হয়। দুই. বিশ্ববিদ্যালয়টি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য মানবসম্পদ কিংবা সমাজসচেতন জনগোষ্ঠী তৈরির ব্যাপারে মোটেও মনোযোগী নয়। সে কারণে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশের জড়িত থাকার অভিযোগের প্রমাণ অতীতে মিলেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অনেক শিক্ষার্থী দেশের বাইরে চলে যায়। তা ছাড়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অর্থ সরিয়ে নেওয়ার নানা উপায় সম্পর্কে অভিযোগ বেশ পুরনো। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের মেধাবী যেকোনো পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারত। সেই দায়িত্ব নীতি ও আদর্শিকভাবে গ্রহণ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তথা বোর্ড অব ট্রাস্টিজ খুব একটা ভূমিকা রেখেছে বলে শোনা যায়নি।

আমরা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুর্নীতি নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক সংবাদ প্রচার হতে দেখি। সেসব অভিযোগের ভিত্তি থাকে মূলত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে নানা ধরনের অনিয়ম, কারো কারো নিয়োগ ও টেন্ডার বাণিজ্য। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের সুযোগ নেই। সেখানে নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগই হয়তো বেশি থাকে। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভ্যন্তরে টাকা লোপাটের যেসব সুড়ঙ্গপথ রয়েছে, তা নিয়ে সবাই কমবেশি অবহিত। তবে মালিকপক্ষ এখন পর্যন্ত তাদের প্রতিশ্রুত ম্যান্ডেট মোতাবেক উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব পালনকে অগ্রাধিকার হিসেবে খুব বেশি দেখাতে পারেনি। দু-একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সব শ্রেণি-পেশার মেধাবী শিক্ষার্থীকে শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার ব্যাপারে নীতিগত কিছু অবস্থান রয়েছে। তবে সেটি খুবই সীমিত আকারে। সময় এসেছে দেশের উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে পাবলিক ও বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়কেই আন্তর্জাতিক নর্মস অনুসরণ করে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার অবস্থানে যাওয়ার। আমরা এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে প্রবেশ করতে যাচ্ছি; অথচ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পড়ে আছে এমন সব দুর্নীতি, অনিয়ম এবং মানের সংকটে, যা দেশে শুধু অর্থের অপচয়ই ঘটাচ্ছে না, উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অক্ষমতা ও অযোগ্যতা প্রদর্শন করছে। সে কারণেই আন্তর্জাতিক পরিসরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে অবস্থান খুব একটা ধরা দিচ্ছে না। ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সেদিকেই বিশেষভাবে মনোনিবেশ করতে হবে।   

লেখক : বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক



সাতদিনের সেরা