kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

প্রতিবন্ধীদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি

ড. মো. ছাদেকুল আরেফিন   

১১ মে, ২০২২ ০৩:২৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রতিবন্ধীদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি

বর্তমানে বাংলাদেশে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতাসহ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি রয়েছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চতর স্তরে। এ ক্ষেত্রে ২০২০-২১ অর্থবছরে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা মাসিক ৭৫০ টাকা এবং ১৮ লাখ উপকারভোগী, আর বরাদ্দ এক হাজার ৬২০ কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মাসিক ভাতা প্রাথমিকে ৭৫০ টাকা, মাধ্যমিক ৮০০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক ৯০০ টাকা, উচ্চতর এক হাজার ৩০০ টাকা করে উপবৃত্তিসহ মোট এক লাখ উপকারভোগীর জন্য ৯৫.৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রতিবন্ধী ভাতা কার্যক্রমটি নিঃসন্দেহে দূরদর্শী নেতৃত্বের অনন্য উদাহরণ।

বিজ্ঞাপন

আর এটা সম্ভব হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বগুণে। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বর্তমান সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় উল্লিখিত কার্যক্রম ছাড়া আরো অনেক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। যেমন—বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, দরিদ্র মায়েদের মাতৃত্বকালীন ভাতা, কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার ভাতা, ভিজিডি কার্যক্রম, বেদে ও অনগ্রসর মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ কার্যক্রম, অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান কার্যক্রম, শিক্ষা উপবৃত্তি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, কিডনি এবং লিভার সিরোসিস রোগীদের সহায়তা কার্যক্রম, চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, গৃহহীন ও ছিন্নমূলদের আবাসন কার্যক্রম এবং সম্প্রতি সর্বসাধারণের জন্য পেনশন কার্যক্রম ঘোষণা।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সব ক্ষেত্রে সম-উন্নয়নসহ সব ব্যবধান কমিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্যতম পূর্বশর্ত। সেই আলোকে বর্তমান সরকারের গৃহীত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতির ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃত। যদিও মানুষের মৌলিক চাহিদা যথাযথ পূরণের নিশ্চয়তাসহ উল্লেখযোগ্য সামাজিক সমস্যা উত্তরণের বিষয়টি লক্ষণীয়। এ ক্ষেত্রে বেকারত্ব দূর করতে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৃদ্ধি, সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বোত্তম চেষ্টা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ, সামাজিক অস্থিরতা দূর করে সুশৃঙ্খল সামাজিক স্থিতিশীলতা আনয়নসহ দেশের উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গুরুত্ববহ। আর এই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব আজ সর্বজনস্বীকৃত। সে হিসেবে প্রাসঙ্গিক আলোচনায় বর্তমান সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নতুন নতুন কর্মসূচি গ্রহণের পদক্ষেপগুলো দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচায়ক।   

সামাজিক সমস্যা হিসেবে প্রতিবন্ধিতাকে সারা বিশ্বের মতো বর্তমানে বাংলাদেশে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রচলিত ধারণায় প্রতিবন্ধী বলতে শুধু শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষকে বোঝায়। কিন্তু বর্তমানে এই ধারণা সম্প্রসারিত হয়েছে। এখন প্রতিবন্ধিতার সংজ্ঞায় মানুষের শারীরিক, মানসিক, এমনকি আর্থ-সামাজিক অক্ষমতার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষভাবে বলা যায়, একজন মানুষের শারীরিক কাঠামোতে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, দৃষ্টি, শ্রবণ, বাকশক্তি ও মানসিক ক্ষতিগ্রস্ততা এবং অক্ষমতাকে প্রতিবন্ধিতা বলা যেতে পারে। প্রতিবন্ধিতাকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। আবার ১১টি শ্রেণিতে প্রতিবন্ধিতাকে ভাগ করা যায়। যেমন—প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা অ্যাক্ট ২০১৩ অনুযায়ী—১. অটিজম, ২. শারীরিক প্রতিবন্ধিতা,  ৩. মানসিক প্রতিবন্ধিতা, ৪. দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা, ৫. বাক প্রতিবন্ধিতা, ৬. বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা, ৭. শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা, ৮. শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা, ৯. সেরিব্রাল পালসি, ১০. ডাউন সিনড্রোম, ১১. বহুমুখী প্রতিবন্ধিতা। প্রাপ্ত তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৮ থেকে ১০ শতাংশ মানুষ আছে, যারা বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিবন্ধিতায় রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, দেশে প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ প্রতিবন্ধী মানুষ আছে, যদিও সঠিক পরিসংখ্যানের ও জরিপের তথ্য অনুপস্থিত। তবে সংখ্যা যা-ই হোক না কেন, প্রতিবন্ধিতা যে সামাজিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এই সামাজিক সমস্যা উত্তরণের সরকারি ও বেসরকারি নানা পদক্ষেপও লক্ষণীয়।

সরকারের নেওয়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা অ্যাক্ট ২০১৩ প্রবর্তন, চাকরির ক্ষেত্রে কোটা, নানা ধরনের প্রশিক্ষণ তথা আইসিটি প্রশিক্ষণ, শিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে কোটা, বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার ও গুরুত্বারোপ উল্লেখযোগ্য। প্রাপ্ত তথ্য সূত্রে অটিস্টিক শিশুদের সুরক্ষায় দেশে ২২টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ঢাকার মিরপুরে জাতীয় প্রতিবন্ধী কমপ্লেক্স ‘সুবর্ণ ভবন’ নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সম্প্রসারণ ও সুগম করার লক্ষ্যে সারা দেশে ৬২টি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুলে ২০২০ শিক্ষাবর্ষে সাত হাজার ২২৮ জন শিক্ষার্থী শিক্ষালাভের সুযোগ পাচ্ছে। নতুনভাবে আরো ১২টি বিদ্যালয়ের অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে।

২০১১ সালে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে একটি সম্পূর্ণ অবৈতনিক স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন উইথ অটিজম চালু করা হয়েছে। ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রংপুর, সিলেট বিভাগীয় শহরে এবং গাইবান্ধা জেলায় একটিসহ মোট ১১টি ‘স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন উইথ অটিজম’ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক বেসরকারি সংস্থা প্রতিবন্ধীদের জন্য নিজ উদ্যোগে প্রতিবন্ধী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং নানা ধরনের কর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সুতরাং বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিতাকে সামাজিক সমস্যা হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সরকারি ও বেসরকারি নানা পদক্ষেপ এবং কার্যক্রমের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে চলেছে।

সরকার প্রতিবন্ধিতাকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার ফলে তার ইতিবাচক প্রভাব বেসরকারি উদ্যোগকে উদ্বুদ্ধ করেছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে বর্তমান সরকারপ্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে। তবে এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগের। এই উদ্যোগের মধ্যে থাকতে হবে দেশে সব প্রতিবন্ধীর পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেইস, বেসরকারি উদ্যোগ বা কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্তীকরণ, সরকারি কার্যক্রমের আওতা ও ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ বীমা ব্যবস্থা চালু করা, সর্বোপরি আধুনিক কলাকৌশল, প্রযুক্তিভিত্তিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রচলিত প্রতিবন্ধিতার উত্তরণ। যার মাধ্যমে এই সামাজিক সমস্যার সমাধানে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সমাজের এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আছে বিপুল প্রতিভা ও সম্ভাবনা। এর যথাযথ ব্যবহার জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি ত্বরান্বিত করবে।

লেখক : উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা