kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

ভিন্নমত

কর সংগ্রহে আরো উদ্যোগী হতে হবে

আবু আহমেদ   

১০ মে, ২০২২ ০৪:০৫ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কর সংগ্রহে আরো উদ্যোগী হতে হবে

বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বিপরীতে কর আদায়ের পরিমাণ খুব কম। বিশ্বে কর-জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে। ভারত, পাকিস্তান, নেপালের মতো দেশগুলোর কর-জিডিপির অনুপাত বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র শ্রীলঙ্কার কর-জিডিপির অনুপাত বাংলাদেশের কাছাকাছি।

বিজ্ঞাপন

দেশটির অর্থনীতি এখন ধুঁকছে। বাংলাদেশ কেন কর আদায়ে পিছিয়ে—এ নিয়ে নানা কথা হয়। এ ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ব্যর্থতা যেমন আছে, তেমনি এর সঙ্গে দেশি ও রপ্তানি শিল্পে বিপুল পরিমাণ কর অব্যাহতি দেওয়ার মতো রাষ্ট্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্তের ব্যাপারও জড়িত। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার এখনো ততটা বড় হয়নি—এটিও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে এ ধরনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এনবিআরের হাত গুটিয়ে বসে থাকারও সুযোগ নেই। কারণ কর-জিডিপির অনুপাত বৃদ্ধি টেকসই উন্নয়নের একটি শর্ত।

এটি সত্য যে বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত তাড়াতাড়ি বাড়বে না—একলাফে বাড়ানো ঠিকও হবে না। হঠাৎ করে বাড়াতে হলে গণহারে কর ধার্যের বিষয় এসে যাবে, করহার বাড়াতে হবে। এর চেয়ে করের আওতা বা করজাল বাড়ানোর যে সুযোগ রয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হবে। প্রতিবারই করজাল বাড়ানোর কথা হয়, কিন্তু কেন বাড়ে না, কাদের গাফিলতি আছে, এই না বাড়ার পেছনে কাদের সুবিধা-অসুবিধার প্রশ্ন রয়েছে—সেগুলোর জবাব খুঁজতে হবে।

বেশি কর আদায় মানে বেশি করহার—এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, করের হার বাড়াতে গেলে কর ফাঁকিও বাড়ে। কর ফাঁকি তখনই বেশি দেখা যায়, যখন দেশে করের হার বেশি হয়। দেখা গেছে, ব্যক্তি পর্যায়ে আয়কর বাড়ানো হলে অনেক মানুষ আয়কর দিতে চায় না। আবার কম্পানির ক্ষেত্রে যেগুলো শেয়ারবাজারের তালিকায় নেই, তারা আয় ঘোষণাই (ইনকাম ডিক্লারেশন) করবে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অডিট কাঠামোর দুর্বলতার সুযোগ নেয় অনেকে। তাই অডিট কাঠামো আরো শক্তিশালী করতে হবে এনবিআরকে।

সরকারকে মনে রাখতে হবে, যেসব কম্পানি কর ফাঁকি দিচ্ছে, সেগুলোকে বাজেট সুবিধা দিয়ে লাভ নেই। যারা কর দেয় না, তাদের কেন সুবিধা অব্যাহত রাখা হবে, তা ভাবতে হবে। দেখা গেছে, করপোরেট করের ৮০ শতাংশই দিচ্ছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলো। এর কারণ তাদের আয় ঘোষণা দিতে হয়, স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হয়। সুতরাং কোনো কম্পানিকে কর সুবিধা দিতে হলে তাকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার শর্ত দিতে হবে। তালিকাভুক্ত কম্পানির ক্ষেত্রে কর কমানো উচিত—এ কথা আমাদের অর্থনীতিবিদরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে রাজস্ব বোর্ড বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তারা উচ্চ হারে কর সংগ্রহে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। অথচ করের হার বেশি রাখলে কর ফাঁকিও বেশি হয়।

প্রসঙ্গক্রমে বলব, যদি সরকার চায় যে শেয়ারবাজার অংশগ্রহণমূলক হোক, মধ্য ও উচ্চমধ্যবিত্ত এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হোক, তাহলে তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলোর করপোরেট আয়কর কমাতেই হবে। তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলোকে বার্ষিক প্রতিবেদনসহ একাধিক প্রতিবেদন দিতে হয়, স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হয়। এসব করে শেয়ারবাজারে এসে যদি তারা কোনো উপকার না পায়, তাহলে তারা আসবে কেন? তাই তাদের সুবিধা দেওয়া উচিত। তাহলে মানুষ বিনিয়োগে আরো আগ্রহী হবে এবং এটি দেশের অর্থনীতির জন্যই ভালো।   

মোদ্দাকথা হলো, কর আদায় বাড়াতে হলে করের আওতা বা জাল বিস্তৃত করার কোনো বিকল্প নেই। উপজেলা পর্যায়ে করের আওতা বাড়ানোর সুযোগ ধারণার চেয়েও বেশি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আয়কর ফাইল ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায়ের পরিমাণ দুটিই বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কর সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য ভ্যাট মেশিন তথা ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) স্থাপনে কেন গতি আসেনি—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এর আগে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার (ইসিআর) স্থাপন করা হলেও তাতে ভ্যাট ফাঁকি রোধ করা যায়নি এবং অল্প কিছু দোকান ছাড়া চালু করা যায়নি। গত দুই বছরে ইএফডি মেশিন দোকানে দোকানে চালু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এটি চোখে পড়ে না। সুপার স্টোর বা চেইন শপের বাইরে বেশির ভাগ দোকানেই ভ্যাট মেশিনটি দেখা যায় না। এ ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

বড় বড় শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত লাখ লাখ ‘সেল ইউনিট’ বা দোকান রয়েছে। সেখান থেকে যদি সামান্যও ভ্যাট আসত, তাহলে সেটি মোট অঙ্কে বিশাল অর্থ হবে। বিক্রেতারা ইএফডি মেশিন ব্যবহার করবে এবং সরকার ভ্যাটের টাকা পেয়ে যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এমন একটি সুবিধা থাকার পরও ভ্যাট মেশিনের পরিমাণ কেন প্রত্যাশিত পরিমাণ বাড়ছে না? আমরা সুপার স্টোরগুলো থেকে কেনাকাটা করলে ভ্যাটের চালান পাই, বড় রেস্টুরেন্টগুলোতে ভ্যাটের চালান পাই। কিন্তু মাঝারি বা ছোটখাটো দোকান বা রেস্টুরেন্টগুলো থেকে কেন চালান পাওয়া যায় না? সেখানে নিশ্চয়ই কোনো অনিয়ম হচ্ছে। যাদের আদায় করার কথা, তাদের আন্তরিকতা ও সততার প্রশ্ন এখানে আসে। বেশির ভাগ দোকানপাটেই লেনদেন রেকর্ডের ব্যবস্থা নেই। লেনদেনের রেকর্ড যদি না থাকে, তাহলে কর সংগ্রহ কঠিন হওয়াই স্বাভাবিক।

শুধু মূল্য সংযোজন কর নয়, উপজেলা পর্যায়ে আয়কর আদায়েও এনবিআরকে একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে অনেক ধনী লোক আছেন। তাঁরা বছর বছর দামি গাড়ি ক্রয় করেন এবং দামি ও বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেন। অনেকে বাগানবাড়ি বা বাংলো বানান। কিন্তু তাঁদের কতজনের আয়কর ফাইল আছে? এ ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানো উচিত। উপজেলা পর্যায়ে বহু সোনা ব্যবসায়ী রয়েছেন, তাঁরা ঠিকমতো কর দিচ্ছেন কি না খতিয়ে দেখা উচিত।

উপজেলা পর্যায়ে আয়কর কর্মকর্তাদের তৎপরতা বাড়াতে হবে। কারা বড় বড় ব্যবসা করেন, সেটি স্থানীয় পর্যায়ে কে না জানে? তাহলে স্থানীয় আয়কর কর্মকর্তারা তাঁদের হদিস পাবেন না কেন? এই কর্মকর্তাদের জেলা পর্যায়ে বসে থাকলে চলবে না। এখন উপজেলা পর্যায়ে ভালো ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে। কোটিপতির অভাব নেই। তাই উপজেলা পর্যায়ে গিয়ে দেখতে হবে বড় ব্যবসা কাদের, বড় বড় ভবন কারা বানাচ্ছেন। তাঁদের আয়কর ফাইল আছে কি না, তাঁদের আয়ের সঙ্গে এসব ব্যয় সংগতিপূর্ণ কি না দেখতে হবে। এটি ঠিকমতো করতে পারলে কর সংগ্রহ অনেক বাড়বে।

আমাদের সমপর্যায়ের দেশগুলোর কর-জিডিপির অনুপাত ২০-এর বেশি। অথচ আমাদের এই অনুপাত দশের ঘরে আটকে আছে। এটিকে ১৫-১৬তে নিতে পারলেও অনেক ভালো হবে। তবে এটি নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন হওয়ারও দরকার নেই। কর-জিডিপি বাড়াতে গিয়ে করহার যেন বেড়ে না যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। এর চেয়ে বরং করজাল বাড়াতেই মনোযোগী হতে হবে। লেনদেনে অটোমেশন বাড়াতে হবে, নগদ লেনদেন কমাতে হবে। চেকের মাধ্যমে লেনদেন বাড়াতে হবে। নগদ লেনদেন হলেই ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। নগদ লেনদেন অনেক দেশই কমিয়ে দিয়েছে, আমাদেরও কমাতে হবে।

শুধু আয় বাড়ানো নয়, সরকারের ব্যয় নির্ধারণের বিষয়েও সতর্ক হওয়া উচিত। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান যে বিপদে পড়েছে, বাংলাদেশ যেন সে বিপদে না পড়ে। প্রকল্প অর্থায়নের নামে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া, তারপর অর্ধেক করে আর এগোনো যায় না, তারপর প্রকল্পের সময় বাড়ানো হয়, আকার বাড়ানো হয় এবং এসব করতে করতে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এর ফলে বিদেশি ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বাড়ে। এটি পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় ঘটছে। তারা এখন পুরনো ঋণ ফেরত দিতে গিয়ে নতুন ঋণ করছে। বাংলাদেশকে যেন এই পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। বাংলাদেশকে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে নিজের সক্ষমতার ভিত্তিতে।

ব্যয় প্রশ্নে আরেকটি বিষয় বলা উচিত। সরকার যদি অতিরিক্ত খরচ না কমায়, তাহলে যতই কর সংগ্রহ করুক, লাভ হবে না। সরকার অনেক ক্ষেত্রে লোকজনকে বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিচ্ছে। কাজ নেই অনেকের। এর পরও শুনতে হয় পদ শূন্য আছে। অর্থনীতি এমনটা করতে বলে না। অর্থনীতি বলে, রাষ্ট্রের লোকজন পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে কি না, তা দেখা। রেলওয়ের দিকে তাকালেই এর জবাব পাওয়া যাবে। রেলওয়েতে হাজার হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এর ফল কী?

কর আদায় বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব ব্যয়েও সতর্ক হতে হবে। কারণ সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা না থাকলে কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে না, ওপরে উঠতে পারে না। দেশের অর্থনীতি এখন যেভাবে চলছে, তাতে কিছু লোক সুবিধা নিচ্ছে। এটি কাম্য নয়।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক



সাতদিনের সেরা