kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

বাজার নৈরাজ্য বন্ধ করতে আমদানি অবারিত হোক

নিরঞ্জন রায়   

৯ মে, ২০২২ ০৩:৩৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাজার নৈরাজ্য বন্ধ করতে আমদানি অবারিত হোক

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, এক দিনে লিটারপ্রতি খোলা সয়াবিন তেলের খুচরা মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ এক দিনে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৮ টাকা করা হয়েছে। এটিকে মূল্যবৃদ্ধি না বলে মূল্য সন্ত্রাস বলাই ভালো।

বিজ্ঞাপন

কারণ মূল্যবৃদ্ধির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থাকে এবং সেই প্রক্রিয়ায় কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি হতেই পারে। এভাবে দিনে ২৯ শতাংশ মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা কোনো অবস্থায়ই মূল্যবৃদ্ধির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলা যাবে না। এ রকম আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোথাও দেখা যাবে কি না আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমাদের দেশে কারণে-অকারণে বাজারে পণ্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। আর এই মূল্যবৃদ্ধিকে যৌক্তিক হিসেবে দেখানোর জন্য আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের ছলছুতার কোনো অভাব নেই। বন্যা, খরা, রোজা, ঈদ, পূজা বিভিন্ন কারণে আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এক স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিগত দুই বছরে করোনা মহামারির অজুহাত এবং এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ কথা অনস্বীকার্য যে করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রত্যক্ষ করা গেছে। কিন্তু এর তো একটা মাত্রা আছে। এভাবে রাতারাতি ৩০-৪০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা বিশ্বের কোথাও ঘটেছে বলে জানা নেই। এর পেছনে অন্য কারণ আছে এবং তা খুঁজে বের করে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে সরকারের প্রধান কাজ।         

আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা এবং এমনকি অনেক সরকারি কর্তাব্যক্তি সব সময় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা জোরেশোরে উচ্চারণ করে থাকেন। কিন্তু যেদিন বাংলাদেশে ভোজ্য তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ৪০ টাকা বৃদ্ধি পায়, ঠিক সেদিনই টরন্টোর বাজারে সবচেয়ে উন্নত মানের ভোজ্য তেল ক্যানোলা অয়েলের তিন লিটারের ক্যান আট ডলার থেকে কমে সাত ডলার হয়েছে, অর্থাৎ প্রতি লিটার ক্যানোলা অয়েলের মূল্য বাংলাদেশি টাকায় ১৮৭ থেকে ১৬৩ টাকায় নেমে এসেছে। বাংলাদেশে এক দিনে যখন ভোজ্য তেলের মূল্য ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৮০ টাকা হয়েছে তখন টরন্টোর বাজারে সবচেয়ে উন্নত মানের ভোজ্য তেলের মূল্য ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৬৩ টাকা হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করার মতো ঘটনা হচ্ছে, বাংলাদেশের বাজারের ভোজ্য তেলের খুচরা মূল্য টরন্টোর বাজারের ভোজ্য তেলের খুচরা মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। অথচ কানাডায় প্রতি ঘণ্টা শ্রমের সর্বনিম্ন মজুরি ১৪ ডলার এবং এসব উন্নত দেশে সব কিছুর কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে এখানকার ব্যবসায়ীদের মাত্রাতিরিক্ত অপারেটিং খরচ বহন করতে হয়। এ কারণে এখানে খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্রয়মূল্যের ওপর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মার্কআপ বা মূল্যবৃদ্ধি করে খুচরা মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। অথচ এর কোনো কিছুই আমাদের দেশের বাজারব্যবস্থায় নেই। এর পরও এ রকম অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে এবং অসহায় ভোক্তারা সেখানে জিম্মি হয়ে আছে। আমার কথায় যাঁরা সন্দেহ পোষণ করবেন তাঁরা যদি অনুগ্রহ করে কানাডার রিটেইল স্টোর যেমন ওয়ালমার্ট, লব-লজ, ফুড বেসিকস, ফ্রেস ভ্যালু, সানি ফুড প্রভৃতি স্টোরের ওয়েবসাইট থেকে গত সপ্তাহের ভোজ্য তেলের খুচরা মূল্য জেনে নেন, তাইলে খুব সহজেই আমার কথার সত্যতা উপলব্ধি করতে পারবেন।

সত্যি বলতে কী মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে বাংলাদেশের বাজারে সিন্ডিকেটের দাপট শুরু হয়েছে কয়েক দশক ধরে। তখন থেকেই বাজারে মূল্য নির্ধারণের যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, চাহিদা ও জোগানের অবস্থা তা অকার্যকর হয়ে এখন চলে গেছে সিন্ডিকেটের হাতে। সিন্ডিকেট যে দামে পণ্য সরবরাহ করবে অসহায় গ্রাহকদের সে দামেই কিনতে হবে। এই প্রবণতা উন্নত-অনুন্নত সব দেশে প্রায় একই রকম। কিন্তু আমাদের দেশের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কেউ কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করে না। আছে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন। এ কারণে কোনো মৌলিক বিষয়েও সব রাজনৈতিক দল এক হয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। আর এই সুযোগ অন্য সবার মতো ব্যবসায়ীরাও ভালোভাবেই কাজে লাগিয়ে ইচ্ছামাফিক দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে ভোক্তাদের বিপাকে ফেলতে পারেন খুব সহজেই। আসলে যেভাবে নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে তার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে ঘটানো হয়েছে কি না সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তা ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

আমি পেশায় ব্যাংকার, তাই সে বিবেচনা থেকেই মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কিছু বিশেষ কারণ আছে, যা এখানে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। তবে যে কারণটি সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য তা হচ্ছে দেশের আমদানি ব্যবসা গুটিকয়েক বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাওয়া। আমরা যখন ব্যাংকে চাকরি শুরু করি তখন আমদানি বাণিজ্য দেশব্যাপী অবারিত ছিল। বিভিন্ন জেলায় কিছু ব্যবসায়ী ছিলেন, যাঁরা সরাসরি নিজেদের এলাকায় সরবরাহের জন্য আমদানি করতেন। যেমন—বগুড়া, রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, খুলনা অঞ্চলের আমদানি পণ্য সেখানকার ব্যবসায়ীরা সরাসরি আমদানি করতেন। তাঁরা কখনো খাতুনগঞ্জের আমদানিকারকদের ওপর নির্ভর করেননি। পরবর্তী সময়ে সরকারের সহযোগিতার অভাব এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রতি ব্যাংকগুলো বিমাতাসুলভ আচরণ করায় এসব আমদানিকারক তাদের আমদানি ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ব্যাংকগুলো, বিশেষ করে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক অধিকসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার পরিবর্তে একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের বিশাল অঙ্কের এলসি খুলে বেশি লাভবান হওয়ার নীতি গ্রহণ করায় অঞ্চলভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি আমদানিকারক বাজার থেকে হারিয়ে যায়। ফলে বাজারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সিন্ডিকেটের হাতে। ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে যদি প্রতি লিটার তেলের খুচরা মূল্য কানাডা থেকে বাংলাদেশে বেশি হয়, তাহলে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পরিশোধিত করে বিক্রি করার কী প্রয়োজন আছে। সরাসরি রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে প্যাকেট করা তেল আমদানি করাই সাশ্রয়ী ও সহজ হবে। কানাডায় যেহেতু প্রতি লিটার উন্নত মানের ভোজ্য তেলের খুচরা মূল্য বাংলাদেশি টাকায় ১৬৩ টাকা এবং যদি ন্যূনতম মার্কআপ ৩০ শতাংশ বাদ দেওয়া হয়, তাহলে সম্পূর্ণ প্যাকেট করা তেল ১১৪ টাকা প্রতি লিটার মূল্যে সরাসরি আমদানি করা সম্ভব। রিফাইনারি কম্পানির পাশাপাশি সরাসরি প্যাকেট করা তেল আমদানি করার সুযোগ অবারিত করে দিতে পারলে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বিরাজ করবে এবং তখন কোনো একটি গোষ্ঠী এককভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আর এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন অঞ্চলভিত্তিক আমদানিকারকদের এবং ব্যবসায়ীদের এ কাজে সহযোগিতা প্রদান করা এবং এ কাজে নিয়োজিত করা। শিক্ষিত বেকার যুবকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে এ ধরনের আমদানি কাজে নিয়োজিত করে তাদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।

মোটকথা, মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ হাতে গোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী বা আমদানিকারকের ওপর ছেড়ে দিয়ে ভোক্তাদের জিম্মি করে রাখার ব্যবস্থা কোনোভাবেই চলতে দেওয়া যায় না। এ কারণেই দ্রুত ভোজ্য তেলসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর আমদানি অবারিত করার সক্রিয় পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করতে হবে। যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারলে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে এই উদ্যোগের সুফল পাওয়া যেতে পারে।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মারি লন্ডারিং বিশেষজ্ঞ ও  ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা
[email protected]



সাতদিনের সেরা