kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

সেলাই করা খোলা মুখ

‘যেমন বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুল’

মোফাজ্জল করিম   

৭ মে, ২০২২ ০৫:০৩ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘যেমন বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুল’

ঈদে, বিশেষ করে ঈদুল ফিতরে, সুবিধাবঞ্চিত হতদরিদ্র শিশুরা ব্যতীত অন্য সবাই মা-বাবার কাছ থেকে ভালো-মন্দ উপহার পায়। রঙিন জামা-জুতো, খেলনা, পছন্দের গল্পের বই ইত্যাদি। কেউ হয়তো তার দীর্ঘদিনের বায়নার বাইসাইকেল বা ল্যাপটপ। কিন্তু কলাবাগানের ধনী-গরিব সব শিশু এবার সবাইকে টেক্কা দিয়ে যে উপহারটি পেয়েছে, তা এককথায় অনন্য।

বিজ্ঞাপন

তারা ফিরে পেয়েছে তাদের হুমকির মধ্যে পড়া খেলার মাঠটি। এই বারোয়ারি মাঠটিতে তারা এবং তাদের আগে তাদের বড় ভাইয়েরা, বাপ-চাচারা খেলাধুলা করে আসছে কয়েক যুগ ধরে। হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে জেগে উঠে এই মহল্লাবাসী শিশু-কিশোররা জানতে পারল একচিলতে মাঠটি তাদের হাতছাড়া (নাকি পা-ছাড়া?) হয়ে গেছে। কী ব্যাপার? না, ঢাকার জেলা প্রশাসন এই খাসজমিটি বিক্রি করে দিয়েছে পুলিশ বিভাগের কাছে। পুলিশ বিভাগ ওই জায়গায় নির্মাণ করবে কলাবাগান থানা ভবন। শুনে শিশু-কিশোরদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তারা এখন খেলাধুলা করবে কোথায়? বড়রা বললেন, আমরা রোজ সকাল-সন্ধ্যায় জমায়েত হয়ে সুখ-দুঃখের কথা বলব কোথায়? আর এলাকাবাসী কেউ মারা গেলে তার জানাজার নামাজ পড়ব কোথায়? পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলল, সেটা আমরা কী জানি। আমরা জায়গা বরাদ্দ পেয়েছি ম্যালা কাঠখড় পুড়িয়ে। এখন আমরা দ্রুত থানা কমপ্লেক্স বানাব ওখানে। তোমরা খেলবে কোথায়, জানাজা পড়বে কোথায়, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখ ইত্যাদির অনুষ্ঠান করবে কোথায়, সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়। যাত্রাপালার বিবেকের মতো সমাজের বিবেক তাদের কাছে জানতে চাইল, বাচ্চারা খেলাধুলা না করতে পারলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে গেলে তো গাঁজা-ভাং খাওয়া শুরু করবে, কিশোর গ্যাংয়ে নাম লেখাবে, তখন কী হবে? জবাবে তারা বলল, ইস, অত সোজা? ঠ্যাঙিয়ে হাত-পা গুঁড়ো করে দেব না? ব্যস। মামলা ডিসমিস। পুলিশ বিভাগ বিপুল উৎসাহে থানা বানানোর কাজ শুরু করে দিল। আর এদিকে মহল্লাবাসী ক্ষোভে-দুঃখে ফুঁসতে লাগল। তাদের মধ্যে যাঁরা অ্যাকটিভিস্ট বলে পরিচিত, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, প্রতিরোধ করা যাঁদের সহজাত, তাঁরা সোচ্চার হলেন, সংগঠিত করলেন এলাকাবাসীকে, জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন সভা-সমিতি করে, পত্রপত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে।

এর পুরোভাগে ছিলেন সৈয়দা রত্না নামের একজন সম্মানিত পুরনারী। তিনি সামাজিক গণমাধ্যমে গিয়ে যখন জনসমর্থন আদায়ে সক্রিয় হলেন, তখন হঠাৎ একদিন সকালে পুলিশ এই ভদ্রমহিলাকে আটক করে থানায় নিয়ে গিয়ে হাজতে ঢোকায়। বিধবা ভদ্রমহিলা বাসায় রেখে আসা তাঁর একমাত্র কিশোর পুত্রটির জন্য যখন দুশ্চিন্তায় জর্জরিত হাজতের লৌহকপাটের ভেতরে, পুলিশ তখন তাঁর ১৫/১৬ বছর বয়সী ছেলেকেও ধরে নিয়ে গিয়ে থানায় পোরে। ভদ্রমহিলার অপরাধ, তিনি কেন মহল্লাবাসীকে সংগঠিত করার আন্দোলনে নেমেছেন অধিকার সংরক্ষণের জন্য। তার মানে কী? তার সহজ-সরল মানে দাঁড়ায়, এ দেশে পুরুষ হও আর মহিলা হও, কর্তৃপক্ষের কোনো অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রা কাড়তে পারবে না। ওই সম্ভ্রান্ত মহিলা ও তাঁর কিশোর পুত্রকে থানায় দুটি পৃথক কামরায় আটক রেখে অবশেষে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সৈয়দা রত্না জান বাঁচানো ফরজ মনে করে পুলিশ যেভাবে মুচলেকা দিতে বলেছে, সেভাবে মুচলেকা দিয়ে দীর্ঘ ১৩ ঘণ্টা পর থানা থেকে বেরিয়ে আসেন।

সৈয়দা রত্না ও তাঁর কিশোর পুত্রের পুলিশের হাতে নিগৃহীত হওয়ার সংবাদটি মৌচাকে ঢিলের মতো কাজ করে। সারা দেশের বিবেকসম্পন্ন মানুষ সরবে-নীরবে এত বড় অন্যায়ের প্রতিবাদ জানায়। এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় সাংবাদিকদের বলেন, বিকল্প কোনো জায়গা পেলে তেঁতুলতলার জায়গা থেকে পুলিশ সরে যাবে। এটি ছিল একটি খুবই সুবিবেচনাপ্রসূত ঘোষণা। এর ফলে পুলিশ বনাম জনগণের সম্ভাব্য লড়াই মোটামুটি থেমে যায়। কিন্তু কলাবাগানবাসী তাদের আন্দোলন থেকে পিছু হটেনি। আন্দোলনের তুষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলতেই থাকে।

পাঁচ অঙ্কের এই নাটকের শেষ দৃশ্যে কী আছে, এটার সমাপ্তি কী রকম, ট্র্যাজেডি না কমেডি, তা দেখার জন্য দেশবাসী নিঃশ্বাস বন্ধ করে ছিল মাহে রমজানের শেষ সপ্তাহে। আর আমাদের সব সমস্যার সমাধান কোথায়, তা-ও জানে দেশবাসী। ‘অল রোডস লিড টু রোম’-এর মতো এ দেশে ‘অল প্রব্লেমস মাস্ট গো টু পি.এম.’। এটা অবশ্যই আমাদের এক ধরনের দুর্ভাগ্য। এত এত মন্ত্রণালয়-যন্ত্রণালয় আছে, জনগণের টাকায় দিব্যি গায়ে ফুঁ দিয়ে চলছেন শত শত আমলা-কামলা, প্রত্যেকের কার্যপরিধি নির্ধারণ করা আছে সুস্পষ্টভাবে, তবু কেন ‘কানু বিনে গীত নেই’? এতে শুধু যে সিদ্ধান্তগ্রহণ বিলম্বিত হয় তা নয়, জনদুর্ভোগও বাড়ে। আর আমাদের প্রশাসনব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রকার অকথা-কুকথা বলার সুযোগ পায় লোকে। এই তেঁতুলতলার তেঁতুল বাহিনী আর লাঠ্যৌষধি খ্যাত বুনো ওলের মুখোমুখি অবস্থান জঙ্গিরূপ ধারণের আগেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঈদের উপহারস্বরূপ মাঠটি শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও অন্যান্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য আগের মতো ব্যবহারের সিদ্ধান্ত দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ‘শরবত হইয়া গেল যা ছিল জহর’। (সৈয়দ মুজতবা আলীর কাছে ক্ষমা চেয়ে) শিশু-কিশোরদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল, তাদের মা-বাবারা ফেললেন স্বস্তির নিঃশ্বাস।

এখানে আমার ‘দুইখান কথা’ আছে। ঢাকা শহরে (এখন তো মফস্বলের সব শহরেও) যেখানে খেলার মাঠ, পার্ক ইত্যাদির এত ক্রাইসিস, সেখানে একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য একটুখানি খালি জায়গার ওপর কর্তৃপক্ষের (বদ) নজর দেওয়াটা কি অপরিহার্য? জেলা প্রশাসনই বা কী করে এই জমি বরাদ্দ দিতে পারল অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে। এ ধরনের সিদ্ধান্তে যেখানে জনসাধারণের স্বার্থ জড়িত, যেখানে জাতির ভবিষ্যৎ নাগরিকদের বেড়ে ওঠার বিষয়টি বিবেচ্য, সেখানে যাদের জন্য এই থানা-পুলিশ, এই প্রশাসন, তাদের অনুকূলেই তো সিদ্ধান্ত নিতে হবে, নাকি? আর যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে নিতে হলো, তা কি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে নেওয়া যেত না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সিদ্ধান্তটি নাকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘পরামর্শে’ নেওয়া হয়েছে। এটি কেমন কথা। আমরা তো জানি প্রধানমন্ত্রী যিনি সরকারপ্রধান ও দেশের প্রধান নির্বাহী, তিনি আদেশ বা নির্দেশ দেন, তাঁর অধীন অন্যরা তাঁকে পরামর্শ দেন। এখানে মনে হচ্ছে বিষয়টি যেন কেমন উল্টো হয়ে গেল। যা হোক, বিষয়টির মধুরেণ সমাপয়েৎ হতে দেখে আমরা খুশি। আলহামদুলিল্লাহ, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। থাক ভিক্ষা... ইত্যাদি।

তবে সেই সম্মানিত পুরনারী সৈয়দা রত্না ও তাঁর ছেলেকে অকারণে হয়রানি করার ব্যাপারে পুলিশ কর্তৃপক্ষ কী বলবে? পুলিশ বলে—এবং এটি তাদের স্লোগানও বটে—পুলিশ জনগণের বন্ধু। অবশ্যই পুলিশ জনগণের বন্ধু। বন্ধু বলেই তাদের সুকৃতি দ্বারা ধনী-গরিব সব মানুষের হৃদয় জয় করে তারা। কিন্তু সৈয়দা রত্নার প্রতি যে আচরণ করা হয়েছে, তা কি বন্ধুত্বের পরিচায়ক? ওই ভদ্রমহিলার জায়গায় নিজের মা-বোনকে কল্পনা করুন। ১৩ ঘণ্টা কোনো মানুষকে—মহিলা হলে তো কথাই নেই—অপরাধ না করেও যদি পুলিশ হেফাজতে থানায় আটক থাকতে হয়, যদি পাশের কামরায় তাঁর কিশোর পুত্রটিকেও বিনা দোষে আটকে রাখা হয় এবং এই দীর্ঘ সময় মা ও ছেলে কেউ কারো সঙ্গে দেখাটুকুও করতে না পারে, তাহলে এদের তো মানসিক বৈকল্য সৃষ্টি হওয়ার কথা। কিছুদিন আগে একজন নারী সাংবাদিকও এ রকম পরিস্থিতির শিকার হন। এগুলো দেশে-বিদেশে তাত্ক্ষণিকভাবে যে ‘রং সিগন্যাল’ দেয়, তা কি আপনারা কেউ খেয়াল করবেন না? এর পাশাপাশি ক্রসফায়ার ও গুমের বদনাম তো আছেই। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত আরজ : বিষয়গুলো জরুরি ভিত্তিতে দেখুন এবং যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিন, যেন ভবিষ্যতে এমনটি না হয়। সেই সঙ্গে অবশ্যই সৈয়দা রত্নার কাছে পুলিশ কর্তৃপক্ষের ক্ষমা চাইতে হবে।

আইন-শৃঙ্খলার এসব দিকে আশু পরিবর্তন আনতে না পারলে আমাদের এত উন্নয়ন সব বিফলে যাবে। উন্নয়ন টেকসই হবে না। আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে এবং আরো হচ্ছে। এগুলো দেখে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আমাদের দেশে বিনিয়োগে উৎসাহী হওয়ার কথা। কিন্তু দেশে আইনের শাসন না থাকলে, ক্রসফায়ার, গুম ইত্যাদির বদনাম লেগে থাকলে, সর্বোপরি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হলে বিদেশিরা মুখ ফিরিয়ে নেবে। কারণ তারা যদি দেখে এ দেশে ঘুষের বাণিজ্য অনিয়ন্ত্রিত, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নড়বড়ে, পাঁচ বছর পর নির্বাচন না হয়ে হয় প্রহসন, তাহলে তারা বিনিয়োগের আগে দশবার ভেবে দেখবে আসবে কি আসবে না।

উপসংহার : দেশে একটি পুরনো প্রবচন আছে, ‘যেমন বুনো ওল, তেমনি বাঘা তেঁতুল। ’ বুনো ওল খেলে গলায় ভীষণ চুলকায়, কুটকুট করে। এর টোটকা হচ্ছে তেঁতুল। কলাবাগানের তেঁতুলতলার নাটকে আমরা দেখলাম ওল যতই বড়াই করুক তার ক্ষমতা নিয়ে, বাঘা তেঁতুল কিন্তু এক নিমেষে তাকে ঠিকই হিরো থেকে জিরো বানিয়ে ফেলতে সক্ষম। শেষমেশ এটিই ভরসা।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি
[email protected]



সাতদিনের সেরা