kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

কৃষক আজিজের বিরুদ্ধে ভুয়া পরোয়ানা, তদন্তে পিবিআই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ১৭:৩৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কৃষক আজিজের বিরুদ্ধে ভুয়া পরোয়ানা, তদন্তে পিবিআই

কৃষক আজিজুর রহমান ওরফে আবদুল আজিজ (ডানে)।

গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার একটি মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাভারের ভাকুর্তা ইউনিয়নের ফিরিঙ্গীকান্দা গ্রামের গেদু মিয়ার ছেলে কৃষক আজিজুর রহমান ওরফে আবদুল আজিজ। এরপর আরও ৮ টি মামলার ভুয়া পরোয়ানায় তাকে ১০০ দিন জেলে থাকতে হয়।

আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে এসব জাল, মিথ্যা পরোয়ানা জারির বিষয়ে তদন্ত করে ৬০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিদবেদন দিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এসব ভুয়া পরোয়ানার বিষয়ে তদন্তের নির্দেশনা ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে ভুক্তোভোগী আবদুল আজিজের রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রুলসহ এ আদেশ দেন হাইকোর্ট।

বিজ্ঞাপন

বিচারপতি জাফর আহমেদ ও কাজী জিনাত হকের বেঞ্চ থেকে আজ বুধবার এ আদেশ হয়।

আজিজুর রহমান ওরফে আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানা থেকে জাল, মিথ্যা পরোয়ানা জারির বিষয়টি তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, সেই সঙ্গে ভুয়া পরোয়ানা জারির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।  

একই সঙ্গে ভুয়া পরোয়ানা জারির রিট আবেদনকারী অর্থাত আবদুল আজিজকে ৮০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।  

স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও বিশেষ শাখার প্রধান (অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক),  পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উপ মহাপরিদর্শক, পুলিশের গোয়েন্দা শাখার যুগ্ম কমিশনার, ঢাকা, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার, মাদারীপুর, জামালপুর, গাজিপুরের পুলিশ সুপার, জয়দেবপুর থানার উপপরিদর্শক মো. জামাল উদ্দিনকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।   

আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সৈয়দ ইউনুস আলী রবি। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, “গাজিপুরের জয়দেবপুর থানায় ২০১৭ সালের ২০ মার্চ আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলা হয়। পরে ২০১৮ সালের ৬ মার্চ তাকে গ্রেপ্তার করে সাভার থানা পুলিশ। পরে ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে সোপর্দ করে। শুনানি শেষে আদালত তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেন। কয়েক দিন সেখানে থাকার পর আবদুল আজিজকে গাজীপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। এর তিন দিন পর সেখান থেকে পাঠানো হয় কাশিমপুর কারাগারে। এভাবে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ১০০ দিন কারাভোগ করার পর ২০১৮ সালের ১৩ মে তার জামিন হয়। পরে ১২ জুন তিনি মুক্তি পান। ”

মামলার বিবরণে বলা হয়, ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুর থানার পুবাইল তালুটিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ৪০০টি ইয়াবা বড়িসহ রিপা ও আমেনা নামের দুই মাদক ব্যবসায়ীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আজিজসহ নয়জন পালিয়ে যান। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে সোপর্দ করে। শুনানি শেষে আদালত তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেন। কয়েক দিন সেখানে থাকার পর তাকে গাজীপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। এর তিন দিন পর সেখান থেকে পাঠানো হয় কাশিমপুর কারাগারে।

নথিতে দেখা যায়, কাশিমপুর কারগারে থাকা অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম কোতোয়ালি ও চান্দগাঁও থানার চারটি মামলায়, রাজধানীর মিরপুর থানার দুইটি মামলায়, জামালপুরের বকশীগঞ্জ থানার একটি মামলায় ও মাদারীপুর সদর থানার একটি মামলায় পরোয়ানার মাধ্যমে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এসব মামলায় তাকে চট্টগ্রাম কারাগার, মাদারীপুর কারাগার ও জামালপুর কারাগারে থাকতে হয়। সর্বশেষ তিনি ছিলেন কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

চট্টগ্রাম মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ তৃতীয় আদালতের বিচারক বিলকিছ আক্তার গত বছর ২৯ মে এক আদেশে বলেন, চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার মামলায় আজিজুর রহমান ওরফে আবদুল আজিজ নামে কোনো আসামি নেই। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আজিজুরের অন্তর্বর্তীকালীন হাজতি পরোয়ানার ফটোকপিতে শুধু দায়রা নম্বর ছাড়া আর কোনো কিছুর মিল নেই এবং আদালত (চট্টগ্রাম মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ তৃতীয় আদালত) থেকে তার নামে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করা হয়নি। অন্য কোনো মামলায় আটকাদেশ না থাকলে তাকে (আবদুল আজিজ) মুক্তির নির্দেশ দেন আদালত।

মাদারীপুর মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালত গত বছরের ৩১ মে এক আদেশে বলেন, আবদুল আজিজকে (আজিজুর রহমান) হয়রানির জন্য বিচারক ও আদালতের সিল-স্বাক্ষর জাল করে মাদারীপুর সদর থানার একটি মামলায় তার নামে হাজতি পরোয়ানাসহ এক পাতার আদেশনামা তৈরি করা হয়েছে। আদালতে উপস্থাপন করা ওই আদেশনামায় অনেক অসংগতি আছে বলে আদালত উল্লেখ করেন।

আদালত আজিজুর রহমানের ওই পরোয়ানা বাতিল ও অকার্যকর সাব্যস্ত করে অন্য কোনো মামলায় আটকাদেশ না থাকলে মাদারীপুর সদর থানার মামলাতেও তাকে মুক্তির আদেশ দেন। এভাবে আটটি  মামলাতেই আবদুল আজিজের মুক্তির আদেশ হয়।  

সাভারের স্থানীয় কোনো একটি প্রভাবশালী মহল ভুয়া পরোয়ানা তৈরি করে তাকে হয়রানী করছে বলে দাবি আব্দুল আজিজের। কালের কন্ঠকে তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশে ১০০ দিন হাজত খাটার পর ২০১৮ সালের ১২ জুন আমি ছাড়া পাই। ছাড়া পেয়ে হয়রানির প্রতিকার চেয়ে ২০১৮ সালের ৩ জুলাই পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে লিখিত অভিযোগ করি। পরে ভুয়া পরোয়ানা ও পুলিশি হয়রানী থেকে প্রতিকার পেতে ২০১৯ সালের ১১ জুলাই গাজীপুর পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করি। কিন্তু কারো কাছ থেকে কোনো জবাব বা প্রতিকার পাইনি। যে কারণে চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট করি। ”

আদালতের নির্দেশে সাতটি মামলা থেকে আবদুল আজিজ মুক্তি পেলেও গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার মাদকের মামলায় তিনি এখনও হাজিরা দিয়ে যাচ্ছেন। গাজিপুরের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।



সাতদিনের সেরা