kalerkantho

সোমবার ।  ১৬ মে ২০২২ । ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৪ শাওয়াল ১৪৪৩  

এক বছরে শতাধিক বাংলাদেশিকে জার্মানি থেকে জোরপূর্বক ফেরত

আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়া বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠাচ্ছে জার্মানি। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো বাংলাদেশিদের সংখ্যা শতাধিক। স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের সুযোগ নিয়েছেন অনেকে।

অনলাইন ডেস্ক   

২৯ জানুয়ারি, ২০২২ ১৯:৪০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এক বছরে শতাধিক বাংলাদেশিকে জার্মানি থেকে জোরপূর্বক ফেরত

গত বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু করে অন্তত ১১৯ বাংলাদেশিকে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন করেছে জার্মানি। আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়ার পর স্বেচ্ছায় ফেরত না যাওয়ায় এই ব্যবস্থা নেয় দেশটি। জার্মানির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাশা লাওফরে ইনফোমাইগ্রেন্টসকে এমন তথ্য জানান।

নিয়ম অনুযায়ী কোনো অভিবাসীর বসবাসের অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বা আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে তিনি জার্মানি ছাড়তে বাধ্য।

বিজ্ঞাপন

এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ দেশটি না ছাড়লে পরবর্তীতে কোনো সময় না দিয়ে কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে তাকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়।

এই প্রক্রিয়ায় গত ১৮ জানুয়ারি একটি চার্টার্ড ফ্লাইটের মাধ্যমে ২৬ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়। সাশা বলেন, 'প্রত্যাবর্তনকারীদের জোরপূর্বক দেশত্যাগ করানোর বাধ্যবাধকতা ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বিমানবন্দরে নিয়ে আসে এবং ফ্লাইটেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের সঙ্গে ছিলেন'।

এর আগে গত বছরের অক্টোবরে ৩৩ জনকে ঢাকায় ফেরত পাঠায় বার্লিন। জার্মানির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, '২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট ৯৩ জন বাংলাদেশি নাগরিককে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে ডিসেম্বরের পরিসংখ্যান এখনও পাওয়া যায়নি'।

সামনের দিনে আর কতজনকে ফেরত পাঠানো হতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে সাশা বলেন, 'আগে থেকে এই তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়'।

তবে, জানুয়ারির মাঝামাঝিতে ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, 'আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়া ৫০ থেকে ৬০ জন বাংলাদেশির ট্রাভেল পারমিট সম্প্রতি ইস্যু করেছে দূতাবাস। বাংলাদেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ক্লিয়ারেন্স প্রতিবেদন পাওয়ার পরে আমরা তাদের ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করেছি'।

এর আগে গত অক্টোবরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো 'আট শতাধিক বাংলাদেশিকে জার্মানি থেকে ঢাকায় ফেরত পাঠাচ্ছে' বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানান, এদের মধ্যে অনেকে এর মধ্যে জার্মানি ছেড়ে চলে গেছেন। ফলে ফেরত পাঠানোর প্রকৃত সংখ্যাটি আরো কম হবে।

স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনে সহায়তা
গত এক বছরে আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়া আরো অনেকে জার্মান কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে ফিরে এসেছেন। তাদেরই একজন মনসুর (ছদ্মনাম)। ২০১৩ সালে ইরাকে যান ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার এই বাসিন্দা। কিন্তু সেখানে পরিস্থিতি ভালো না থাকায় ইউরোপ পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কুর্দিস্তান, তুরস্ক, গ্রিস, মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, অস্ট্রিয়া হয়ে ২০১৫ সালে পৌঁছান জার্মানিতে। ২০২১ সালে তার আশ্রয় আবেদন সম্পূর্ণ বাতিল করে দেশটি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরতে বাধ্য হন তিনি।

তিনি বলেন, 'আমাকে বলা হয়েছে নিজের থেকে না ফিরলে জোর করে ফেরত পাঠানো হবে। আমি এ জন্য আইওএম এর সহায়তায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিই।

আশ্রয়প্রার্থীদের স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তনে উৎসাহ দিতে আরইএজি/জিএআরপি নামে জার্মানির সরকারের একটি প্রকল্প রয়েছে। এর অধীনেই আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা-আইওএম প্রত্যাবর্তনকারীদের নানাভাবে সহযোগিতা করে। ফ্লাইট টিকেট, যাত্রাকালীন খরচ হিসেবে ২০০ ইউরো, এমনকি এককালীন নগদ এক হাজার ইউরো অর্থ সহায়তাও বুঝে পান তারা। মনসুরসহ স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়া আরো কয়েকজনও এই সহায়তাগুলো পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ইনফোমাইগ্রেন্টসকে। এককালীন টাকা তারা বুঝে পেয়েছেন ফ্লাইটে ওঠার আগে। তবে যাদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয় এই সুবিধাগুলো পান না তারা।

চার বছরে ফেরত ৪৫০ অনিয়মিত অভিবাসী
জোরপূর্বক বা স্বেচ্ছায় যেভাবেই আসেন না কেন প্রত্যাবাসনকারীরা বাংলাদেশে নামার পর দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে সহায়তা পেয়ে থাকেন, যা থেকে ফেরত আসার মোট সংখ্যাটিও জানা যায়। এর মধ্যে ১৬টি ইইউ দেশের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্প ইউরোপীয় রিটার্ন অ্যান্ড রিইন্টিগ্রেশন নেটওয়ার্ক বা ইরিন। অন্যটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে আইওএম পরিচালিত 'প্রত্যাশা'।

দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গেই যুক্ত বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। ইরিন প্রকল্পের অধীনে গত বছর জার্মানি থেকে ফিরে আসা ২৯ জনকে সহায়তা দিয়েছে তারা। অন্যদিকে, প্রত্যাশার অধীনে সহায়তা পেয়েছেন ১৬৮ জন। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে জার্মানি থেকে ফিরে আসা প্রায় ২০০ জন গত বছর এই দুই প্রকল্পের সহায়তা নিয়েছেন। গত চার বছরে এই সংখ্যাটি প্রায় ৪৫০। এরা সবাই ২০১৫ সালের পর ফেরত এসেছেন।

যোগাযোগ করা হলে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগামের প্রধান শরিফুল হাসান ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, 'বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস (এসওপি) চুক্তি স্বাক্ষর করেছে আনডকুমেন্টেড বাংলাদেশিদের ফেরত আনার জন্য। এর মানে বাংলাদেশ চায় না অনিয়মিত পন্থায় লোক বিদেশ যাক'।

শরিফুল জানান, গত কয়েকবছরে ইউরোপ থেকে ফেরত আসা সবচেয়ে বেশি লোক তারা পেয়েছেন ইটালি, গ্রিস ও জার্মানি থেকে। 'যারা ফেরত এসেছেন তাদেরকে বিমানবন্দরে জরুরি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও পরে অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া হয় যাতে তারা ফের ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। পাশাপাশি এভাবে ঝুঁকি নিয়ে যেন লোকজন ইউরোপে না যায় সে জন্য সারাদেশে আমরা সচেতনতা তৈরির কাজ করছি। আসলে দেশে বিদেশে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সংকটের সমাধান করতে হবে'-  বলেন তিনি।
সূত্র : ডয়চে ভেলে



সাতদিনের সেরা