kalerkantho

সোমবার ।  ১৬ মে ২০২২ । ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৪ শাওয়াল ১৪৪৩  

সুজন নেতৃবৃন্দ বললেন

সিইসি নূরুল হুদা খলনায়ক, তিনি মিথ্যাচার করেছেন

তাঁর বক্তব্য কুরুচিপূর্ণ ও মানহানিকর

বিশেষ প্রতিনিধি    

২৯ জানুয়ারি, ২০২২ ১৭:৪৩ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সিইসি নূরুল হুদা খলনায়ক, তিনি মিথ্যাচার করেছেন

নাগরিক সংগঠন 'সুজন' নেতৃবৃন্দ তাদের বিরুদ্ধে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদার অভিযোগের জবাবে বলেছেন, তিনি খলনায়ক ও মিথ্যাচর করেছেন। বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে কুরুচীপূর্ণ এবং মিথ্যা অপবাদ রটিয়েও তিনি সংশ্লিষ্টদের মানহানি করেছেন। এসব কথা বলে তিনি নিজেই মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়েছেন।

গত ২৭ জানুয়ারি রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমাক্রেসি (আরএফইডি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ 'সুজন' নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন কে এম নূরুল হুদা।

বিজ্ঞাপন

এর প্রতিবাদে আজ বেলা সাড়ে ১১টায় ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সুজন সভাপতি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে এবং কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন সুজন-এর নির্বাহী সদস্য সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য সুজন নেতৃবৃন্দের মধ্যে সুজন সহসভাপতি ড. হামিদা হোসেন, সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সহসম্পাদক জাকির হোসেন, নির্বাহী সদস্য সুপ্রিম কোটের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন, ড. তোফায়েল আহমেদ, আলী ইমাম মজুমদার, ড. শাহদীন মালিক, ড. শাহনাজ হুদা, শফিউদ্দিন আহমেদ, ফারুক মাহমুদ চৌধুরী, সুজন জাতীয় কমিটির সদস্য একরাম হোসেন ও সঞ্জীব দ্রং এবং বিভাগীয় ও জেলা নেতৃবৃন্দের মধ্যে ড. এস এম শফিকুল ইসলাম কানু, মনিরুজ্জামান নাসিম, হুমায়ুন ইসলাম তুহিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তাঁর লিখিত বক্তব্যে বলেন, যৌক্তিক সমালোচনার যুৎসই জবাব না থাকলে সমালোচনাকারীর চরিত্র হননের অপচেষ্টায় লিপ্ত হওয়া বহুল ব্যবহৃত একটি অপকৌশল। ঠিক এমনই এক অপকৌশল ব্যরহারের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। নির্বাচন কমিশনের সাথে ড. বদিউল আলম মজুমদারের ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেনের কোনো সম্পর্ক নেই এবং কোনোদিন ছিলও না। তিনি কমিশন থেকে কখনও কোনো কাজ নেননি, অসমাপ্ত রাখার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। অর্থাৎ ড. মজুমদারের বিরুদ্ধে সিইসির নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী কান কথার ভিত্তিতে উত্থাপিত এক কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ এবং কাজ নিয়ে কাজ না করার অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় হলফনামায় বর্ণিত প্রার্থীদের তথ্য প্রকাশ ও ভোটারদের মাঝে বিতরণ, পোস্টারিং এবং প্রার্থী-ভোটার মুখোমুখি অনুষ্ঠানের আয়োজনের কাজটি করার জন্য ড. শামসুল হুদা কমিশন ইউএনডিপির অর্থায়নে পরিচালিত এসইএমবি প্রকল্প থেকে সুজনকে ৯ লাখ ৫০ হাজার ৬০০ টাকা প্রদান করে। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় একই ধরনের কাজের জন্য সুজনকে তিন লাখ টাকা প্রদান করা হয়। অর্থাৎ দুটি নির্বাচনে সর্বমোট ১২ লাখ ৫০ হাজার ৬০০ টাকা সুজন নির্বাচন কমিশন থেকে পায়। নির্বাচন দুটির জন্য নির্ধারিত কাজগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করে যথাসময়ে কমিশনের কাছে বিল-ভাউচারসহ হিসাব-নিকাশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে কোনোরূপ অনিয়মের অভিযোগ ওঠা সম্পূর্ণ অমূলক। অথচ কে এম নূরুল হুদা ড. বদিউল আলম মজুমদারের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন। হলফনামার মাধ্যমে প্রার্থীদের তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা এখন আইনে অন্তর্ভুক্ত। আইনানুযায়ী এসব তথ্য না দিলে কিংবা তথ্য গোপন করলে বা ভুল তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার কথা এবং তথ্য গোপন করে নির্বাচিত হলে নির্বাচনও বাতিল হওয়ার কথা। তাই নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো হলফনামার তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা, যাতে হলফনামা সত্যিকারার্থে 'আমলনামায়' পরিণত হয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের নির্বাচনী অঙ্গন থেকে দূরে রাখে, যা করতে নূরুল হুদা কমিশন সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এমতাবস্থায় এসব তথ্য প্রকাশ, প্রচার ও বিশ্লেষণের জন্য সুজনকে যেখানে বাহবা দেওয়ার কথা, তার পরিবর্তে সিইসি হুদা তাঁর মন্তব্যের দ্বারা আমাদের কাজের প্রতি চরম তাচ্ছিল্য এবং সুজনের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ প্রদর্শন করেছেন। একই সঙ্গে প্রদর্শন করেছেন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সম্পর্কে তাঁর এবং তাঁর সহকর্মীদের সুস্পষ্ট ধারণার অভাব, যা এসব গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য তাদের অযোগ্যতারই পরিচায়ক।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আরো বলেন, সিইসি হুদা আরো অভিযোগ করেছেন যে, ড. মজুমদার কমিশন থেকে কাজ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং এ লক্ষ্যে চাপ সৃষ্টি করতে অপ্রত্যাশিতভাবে অনেক লোক নিয়ে তাঁর অফিসে হাজির হয়েছেন। তাঁর এ মিথ্যাচারে আমরা স্থম্ভিত। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ীই সুজন নেতৃবৃন্দ নির্বাচন কমিশনের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হয়েছিলেন এবং তা পদ্ধতিগতভাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেই। একটি বিতর্কিত নির্বাচনের অকাট্য কিছু প্রমাণ ও তথ্য প্রকাশ করায় সুজন ও ড. বদিউল আলম মজুমদারের ওপর কে এম নূরুল হুদার ক্ষিপ্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তা ছাড়াও ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে বৈশাখী টেলিভিশনের আট পর্বের একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে নূরুল হুদা কমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করার যে আবেদন করেন, তাতে ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ সুজন-এর অনেক নেতৃবৃন্দ ছিলেন স্বাক্ষরকারী। আর এ জন্যই সিইসি হুদার গাত্রদাহ এবং তাঁর অপকর্ম ও পক্ষপাতদুষ্টতার কলঙ্ক আড়াল করতেই যে কলঙ্ক বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছে। তিনি আমাদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন। সিইসি হুদা নির্বাচন সম্পর্কে ড. মজুমদারের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে অশালীন মন্তব্য করেছেন। তাঁর জানা থাকার কথা যে ড. মজুমদার দেশে-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু বছর শিক্ষকতা করেছেন। তিনি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল প্রফেসর ছিলেন। তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক ও গবেষক। বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে তিনি এক ডজনের বেশি বই লিখেছেন এবং লিখেছেন বহু বিদেশি জার্নালে অনেক প্রবন্ধ। গত ২০ বছরের অধিককাল ধরে তিনি নির্বাচন নিয়ে কাজ করে আসছেন এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। এমনকি আমাদের উচ্চ আদালতও এ বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি দিয়েছেন।

ড. শাহদীন মালিক বলেন, সমালোচনার সদুত্তর না থাকলে, কৃতকার্যের কোনো ব্যাখ্যা না থাকলে সমালোচনাকীরকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করাটা হচ্ছে সবচেয়ে সহজ পন্থা। এটি একটি নিকৃষ্ট পন্থা, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য অপ্রত্যাশিত ছিল। আমি আশ্চর্য হইনি, পাঁচ বছর তিনি এভাবেই কাটিয়েছেন। অসত্য বক্তব্যই ছিল তার পাঁচ বছরের প্রধান কাজ। তাঁর কৃতকাজের বিচার চেয়ে আমরা সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠনের আবেদন করেছিলাম। আজ হোক কাল হোক এ জন্য তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে বলে আমার বিশ্বাস।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তাঁর নেতৃত্বে আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে। রাতকে দিন আর দিনকে রাত করা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তারা সব কাজ করতে পারে। আদালতের রায় আছে- নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ উঠলে ইসি তদন্ত করতে পারে। তদন্তে সেই অভিযোগ প্রমাণ হলে নির্বাচন বাতিল করতে পারে। কিন্তু তারা কোনোটাই করেনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ রকম একজন খলনায়ককে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, তারা এ কথাগুলো উঠিয়ে নিজেদের কথাকে ঢাকার চেষ্টা করছেন। সুজন কারও কাছ থেকে টাকা নেয় না, চায়ও না। নির্বাচন কমিশনের অনুরোধেই কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সুজন তথ্য প্রচারের কাজ করেছে। যারা নির্বাচন ও ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করছেন তাদের অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। আজকাল খুব বেশি মানুষ এতে আগ্রহী হয় না ব্যক্তিগত কাজ ও চাপের কারণে। তাই যেসব মানুষ এসবে এখনও লেগে আছেন, তারা সবার কাছ থেকে একটু সংবেদনশীলতা আশা করতে পারে।

জাকির হোসেন বলেন, সিইসি কথা বলার সময় সামান্য সৌজন্যতাও করেন না। উনার কথা শুনে মনে হচ্ছে যেন আমরা জোর করে উনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। অথচ উনি কমিশনে দায়িত্ব নেওয়ার পর অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেই আমরা দেখা করতে গিয়েছিলাম। কতগুলো লোক নিয়ে দেখা করতে এসেছিলেন বলে উনি দেশের সম্মানিত ব্যক্তিদের প্রতি ন্যূনতম সৌজন্যবোধ প্রদর্শন করেননি।

বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, সিইসি নূরুল হুদা যেসব কথা বলেছেন তা বড় ধরনের অন্যায়। আমি তার বক্তব্য শুনেছি। তিনি যেসব অভিযোগ করেছেন তার ভিত্তি হচ্ছে 'শোনা কথা'। 'আমার দপ্তরের কয়েকজন বলেছেন' এই কানকথার ভিত্তিতে তিনি অভিযোগ করেছেন। সাংবিধানিক এত বড় একটি পদে কে কী বলল তার কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া তিনি প্রচার করে দেবেন? নির্বাচনে এতগুলো লোক মারা গেল, আর উনি বললেন, আমাদের কোনো দায়-দায়িত্ব নেই। এটাও অপরাধ।   দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ এবং মিথ্যা অপবাদ রটিয়েও তিনি সংশ্লিষ্টদের মানহানি করেছেন। এসব কথা বলে তিনি নিজেই মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়েছেন। মানুষের আদালতই বড় আদালত। সেই আদালতে উনার বিচার হবে।

এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, সিইসি নূরুল হুদা নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করব কিনা তা সুজন-এর নেতৃবৃদ্ধের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।  



সাতদিনের সেরা