kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

উত্থাপিত আইনটিতে নিরপেক্ষ ইসি গঠনের গ্যারান্টি নেই

এম হাফিজউদ্দিন খান   

২৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০৪:১৩ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



উত্থাপিত আইনটিতে নিরপেক্ষ ইসি গঠনের গ্যারান্টি নেই

গত ৫০ বছরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের জন্য আইন করার বিষয়টিকে কেউই গুরুত্ব দেয়নি। ফলে এই দীর্ঘ সময় ধরে আইন ছাড়াই নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং অনেক নির্বাচনও করা হয়েছে। এর মধ্যে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গঠন করা নির্বাচন কমিশনের অধীনে মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন হয়েছে। এর বড় কারণ হলো ওই কমিশনে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা মোটামুটি বিশ্বস্ত ও দক্ষ ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

বাকি যেসব নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে, সবই দলীয় বিবেচনায় হয়েছে এবং তাদের অধীনে নির্বাচনগুলো সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বিশেষ করে শেষের দুটি নির্বাচন একেবারেই কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে, যা অতীতে দেখা যায়নি। ২০১৪ সালের নির্বাচনটি হয়েছে একতরফা এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন হয়েছে রাতের অন্ধকারে ভোট দেওয়ার মধ্য দিয়ে। এই দুটি নির্বাচন নিয়ে মানুষ বিক্ষুব্ধ এবং দেশে-বিদেশে সমালোচনা হয়েছে।

আমরাই প্রথম দাবি ওঠালাম যে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন করতে হবে। যেহেতু সংবিধানে বলা আছে, তাই আইনটি করতেই হবে। কিন্তু এ নিয়ে কারো কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না। আমরাই সুজনের (সুশাসনের জন্য নাগরিক) পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিলাম। আমরা বিশিষ্ট আইনজ্ঞদের নিয়ে আইনের খসড়া করলাম। এতে বিস্তারিত খসড়া তৈরি করা হয়, যাতে সরকারের কিছু সময় বেঁচে যায় এবং খসড়াটি ঘষামাজা করলে একটি গ্রহণযোগ্য আইন তৈরি ও নির্বাচন কমিশন গঠন সম্ভব হয়। আমাদের এই খসড়া তৈরিতে আইনজীবী শাহদিন মালিক, বিচারপতি মো. আবদুল মতিনসহ আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ছিলেন। বিজ্ঞ লোকদের দিয়েই আমরা নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইনের খসড়াটি তৈরি করি।

গত ১৮ নভেম্বর আমরা আইনের খসড়াটি আইনমন্ত্রীর হাতে হস্তান্তর করি। আইনমন্ত্রী তখন আমাদের জানালেন যে সময় নেই, এখনই আইন করা যাবে না। অথচ তখনো যথেষ্ট সময় ছিল। তখন থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত সময় ছিল। কিন্তু সময় পর্যাপ্ত নয় বলেই তিনি দাবি করলেন। এরপর আগের মতোই রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন দলের সঙ্গে সংলাপ শুরু করলেন। রাষ্ট্রপতি প্রায় সব দলের সঙ্গেই আলোচনা করেন। সংলাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলই অন্তত একটি অভিন্ন দাবি জানিয়েছে যে নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন করা লাগবে। কিন্তু আইনমন্ত্রী বরাবরই বলতে থাকলেন যে আইন করার মতো সময় সরকারের হাতে নেই।

এরপর কোনো ধরনের কথাবার্তা বা আভাস ছাড়াই হঠাৎ করে গত ১৭ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আইনের খসড়া অনুমোদন হয়ে গেল। অথচ আগের দিন পর্যন্ত আমরা শুনতে পাইনি যে আইনটি হচ্ছে। বরাবরই শুনে আসছি যে আইনটি হবে না। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আইনের যে খসড়াটি অনুমোদন করা হয়, তাতে দেখা গেল আইনটির উদ্দেশ্যই হচ্ছে বাছাই কমিটিকে বৈধতা দেওয়া। নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আগে বাছাই কমিটি হতো আইন ছাড়া। এখন থেকে আইনের মাধ্যমে হবে। খসড়া আইনটিতে বলে দেওয়া হয়েছে কিভাবে বাছাই কমিটি করা হবে।

তবে আমাদের যে দাবি ছিল, অর্থাৎ আমাদের আইনের যে খসড়াটি আমরা জমা দিয়েছিলাম, তাতে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে একটি বাছাই কমিটি করার কথা উল্লেখ ছিল। এতে বাছাই কমিটি যেসব নাম সুপারিশ করবে, সেগুলো নিয়ে সারা দেশে আলাপ-আলোচনা হবে, যাতে কমিশন নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি গোপনীয় বিষয় না হয়। নামগুলো তারা প্রকাশ করবে, মানুষ তাদের নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলবে। এর মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করা সহজ হবে। আমাদের খসড়ায় আরো উল্লেখ ছিল, নামগুলো পার্লামেন্টের কমিটিতেও যাবে, সেখানে কমিটির সদস্যরা দেখবেন, পর্যালোচনা করবেন। গোপনীয়ভাবে কিছু করার সুযোগ থাকবে না, প্রকাশ্যে করা হবে, আলোচনা করেই করা হবে। এ ছাড়া উল্লেখ করা হয়েছিল, বাছাই কমিটিতে সাতজন থাকবেন। সেখানে কয়েকজন নারীও থাকবেন। তারপর সেখান থেকে অভিমত পাওয়া যাবে। এর ভিত্তিতে সব দল ও রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে।

আমাদের এই পরামর্শ মানা হয়নি। সরকারের আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, ছয় সদেস্যর একটি বাছাই কমিটি করা হবে। ছয় সদস্যের এই বাছাই কমিটির প্রধান হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। এ ছাড়া সদস্য হিসেবে থাকবেন হাইকোর্টের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

পরবর্তী সময়ে আইনটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরে সেটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। এরই মধ্যে আইনটি সংসদীয় কমিটিতেও অনুমোদন পেয়ে গেছে। সংসদীয় কমিটি দুটি পরিবর্তন এনেছে। এর একটি হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অযোগ্য উল্লেখ করা হয়েছে এবং যোগ্যতা হিসেবে ‘স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য পেশা’র লোকজনকে রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাজাপ্রাপ্ত লোকদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি বেশ ভালো হয়েছে। তবে দুটি পরিবর্তনই খুব তাৎপর্য বহন করে না, বিশেষ করে মূল দাবির কথা বিবেচনা করলে। এখন আইনটি পাস হলে দেখা যাবে এই কমিটিতে যাঁরা থাকবেন, তাঁরা নামগুলো গোপন রাখবেন, যেটি আগেও করা হয়েছিল। কারণ এর আগের বাছাই কমিটিগুলোও নাম গোপন করেছিল।

আমরা কোনোভাবে জানতে পেরেছি যে আগের সার্চ কমিটিতে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পরামর্শ পেতেন। সেটির বাইরে তাঁদের যাওয়ার পথ ছিল না। আমি নাম উল্লেখ করতে চাই না—ওই কমিটিতে থাকা এমন একজন আমাদের সেটি বলেছেন। সুতরাং এই আইনের মাধ্যমে আমাদের যে আকাঙ্ক্ষা, আমাদের যে দাবি, সেটি পূরণ হয়নি। এর মাধ্যমে দেশে ভালো নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে, সৎ ও নিরপেক্ষ লোকদের নেওয়া হবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।

নির্বাচন কমিশন নিয়োগে প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নয়। কারণ সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া আর কোনো নিয়োগেই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নেই। এই দুটি পদ ছাড়া আর সব পদেই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সুতরাং নির্বাচন কমিশন গঠনেও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নেই। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশন গঠনের আইনের খসড়ায় যে বাছাই কমিটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটিতেও রাষ্ট্রপতির এককভাবে কিছু করার সুযোগ নেই।

এই প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। প্রথম কথা হলো, সেলিনা হায়াত আইভীর এমনিতেই যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ছিল। দ্বিতীয়ত, সরকার এখানে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করেনি। কোনো রকম প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেনি। সম্ভবত এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সামনে যেহেতু আরেকটি জাতীয় নির্বাচন আসছে, তাই মানুষকে বোঝানো যে সরকার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে না। নারায়ণগঞ্জে মোটামুটি একটি ধারণা ছিল যে সরকার হস্তক্ষেপ না করলেও আইভী নির্বাচনে জিতে যাবেন। দেখা গেল ঘুণে ধরা নির্বাচন কমিশন দিয়েই সেখানে নির্বাচন হলো।

আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশন অনেক ক্ষমতাশালী। এমনকি ভারতের চেয়েও ক্ষমতাশালী। এটি আমরা সুজন থেকে বহুবার বলেছি। ড. হুদা কমিশন যে আইনের খসড়া রেখে গিয়েছিল, আমরা সুজন থেকে সেটি তৈরিতেও সহায় করেছিলাম। আমাদের নির্বাচন কমিশন নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কারচুপি হলে, গোলমাল হলে শাস্তি দেওয়া বা নির্বাচন বাতিল করার মতো ক্ষমতা কমিশনের কাছে থাকলেও প্রয়োজনে তারা সেটি প্রয়োগ করেনি।

নির্বাচন সঠিক করতে তিনটি ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা, প্রয়োজনমতো তাদের যে ক্ষমতা আছে সেটি ব্যবহার করা। দ্বিতীয়ত, সরকারের তরফ থেকে কোনো প্রভাব বিস্তার না করা। তৃতীয়ত, নির্বাচনে জেতার জন্য দলগুলো কোনো কারচুপি বা জবরদস্তি করবে না, গুণ্ডা বাহিনী ব্যবহার করবে না। নির্বাচনের ফলকে মেনে নেওয়ার মতো তাদের মনোভাব থাকতে হবে। এই তিনটি ফ্যাক্টরের সমন্বয়ে একটি নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব হয়। কিন্তু সেটি এখানে নেই। সরকার এখানে হস্তক্ষেপ করবেই বলে মনে হচ্ছে। তারা তাদের নিজেদের লোক দিয়েই সার্চ কমিটি করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তারপর দলগুলোও নির্বাচনে জেতার জন্য মরিয়া হয়ে যাবে। এরই মধ্যে বড় দলগুলোর মধ্যে বিএনপি বলে রেখেছে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। সুতরাং ব্যাপারটি দাঁড়ায়, যেভাবে হয়ে আসছে, এবারও সেভাবেই নির্বাচন হয়ে যাবে।

এখন সরকার যদি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়, তাহলে আমাদের যে খসড়া সে রকম একটি আইন করতে হবে। সেভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠানও করতে হবে আইনের সব বিধি-বিধান মেনে। এতে সরকার কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। না হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণায়ই ফিরে যেতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আওয়ামী লীগ অনেক আন্দোলন করেছে। দিনের পর দিন হরতাল, ধর্মঘট করেছে। কিন্তু তারাই আবার এটিকে তুলে দিল। আমরা মনে করি, আমাদের দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দরকার। আমাদের দেশে যেহেতু কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার না করে থাকতে পারে না, তাই তারা এটি করবেই।

এই অবস্থায় আমরা মনে করি, আইনটি ভালো কিছু হয়নি। বিভিন্ন দলের চাপ ও আমাদের আন্দোলনের কারণে শুধু সবাইকে শান্ত করার জন্য তড়িঘড়ি করে আইনের খসড়া সংসদে তুলেছে সরকার। কারো সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা না করে তা মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে অনুমোদন, পরে দ্রুততম সময়ে সংসদীয় কমিটির অনুমোদন ভালো ঠেকছে না। ফলে সামনের দিনগুলোতে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে আশঙ্কা থেকেই গেল।

লেখক : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা



সাতদিনের সেরা