kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

করোনার দীর্ঘ উপস্থিতি এবং নতুন স্বাভাবিকতা

মঈনউদ্দিন মুনশী   

২৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০৪:০৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনার দীর্ঘ উপস্থিতি এবং নতুন স্বাভাবিকতা

করোনা মহামারি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে। এই রোগ নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিনের ব্যবহার শুরু হয়েছে এক বছরেরও বেশি আগে। এ ছাড়া অনেক দেশে লকডাউন করা হয়েছে, অফিস-স্কুল-কলেজ বন্ধ করা হয়েছে; তবু এই রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। কখনো এর বিস্তার কিছুটা কমেছে বলে মনে হয়েছে; কিন্তু কিছুদিন পর তা আবার বেড়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে এর সংক্রমণের হার আগের তুলনায় অনেক বেশি। রোগ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ না হওয়ার ফলে বিভিন্ন ভেরিয়েন্টের উৎপত্তি ঘটছে, যেগুলোর সংক্রমণক্ষমতা বেশি। যেহেতু করোনাভাইরাস দমন করা সম্ভব হচ্ছে না এবং জীবন একটা চলমান বিষয়, তাই এটা নিয়েই বেঁচে থাকার উপায় বের করতে হবে। এই সহাবস্থানই হচ্ছে বর্তমান সময়ের ‘নতুন স্বাভাবিকতা’।

করোনা মহামারির শুরুতে এর নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সব দেশের সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল ত্রুটিপূর্ণ। রোগ নির্ণয় পরীক্ষা, রোগ নিরীক্ষণ, মাস্ক ব্যবহার, দালানের ভেতর বায়ু শোধনব্যবস্থা ইত্যাদি ছিল অপ্রতুল এবং অসম্পূর্ণ। রোগ নির্ণয় পরীক্ষার সংখ্যা এখনো অপ্রতুল। এখনো পর্যন্ত সঠিক কত লোক রোগাক্রান্ত, কতজনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে কতজন আবার আক্রান্ত হয়েছে, রোগাক্রান্তদের পরিণতি ইত্যাদির সঠিক জরিপ হয়নি। দ্রুত রোগ নির্ণয় পরীক্ষা (অ্যান্টিজেন টেস্ট) অনেক দেশে হয় অনুপস্থিত অথবা খুবই অপ্রতুল এবং এর মূল্য অনেক বেশি।

করোনাভাইরাসের বিভিন্ন ভেরিয়েন্ট নির্ণয় ও এর সম্প্রসার রোধ করতে এর জিন জরিপ করা প্রয়োজন, যা অনেক দেশে সম্পন্ন হয়নি। এ ছাড়া ২০২১ সালের মে মাস পর্যন্ত এই ভাইরাস যে বায়ু দ্বারা বাহিত হয়ে সংক্রমণ ঘটাতে পারে সেটা অজানা ছিল, যে জন্য সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহারের সুপারিশ বিলম্বিত হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই রোগ নতুন করে বেড়ে যাওয়ায় মনে হচ্ছে মহামারি আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে। তাই এই রোগ সহনীয় পর্যায়ে আনাটাই হবে যুক্তিযুক্ত। এই লক্ষ্যে রোগাক্রান্ত লোকের সংখ্যা এবং মৃত্যুহার কমাতে দ্রুত রোগ নির্ণয়, ভাইরাসের জিন জরিপ, সঠিক মাস্ক ব্যবহার এবং ঘরের বায়ু শোধনের উন্নতি করা প্রয়োজন।

রোগ নির্ণয়
করোনাভাইরাসের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ভাইরাসজনিত (ইনফ্লুয়েঞ্জা, আরএসভি) সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুহার জানা প্রয়োজন। কতজন ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত হয়েছে, কতজন করোনা রোগ নির্ণয় পরীক্ষা করিয়েছে—সেটার সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রোগ নির্ণয় পরীক্ষা সুলভ এবং অল্প খরচে হওয়া জরুরি। বাড়িতে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কতজন সংক্রমিত তা জানা প্রয়োজন, যাতে তাদের কোয়ারেন্টিনে রেখে সংক্রমণ কমানো যায়। সব ভাইরাসজনিত ফুসফুসের রোগের ব্যাপকতা জানা প্রয়োজন, তাতে করে করোনা ভ্যাকসিনের সঙ্গে সঙ্গে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে মানুষের শ্বাসকষ্টজনিত অসুখ নিয়ন্ত্রণের জন্য।

রোগ জরিপ   
নতুন ভেরিয়েন্ট দ্বারা অসুখের শুরুতেই আক্রান্তের ব্যাপকতা জানা প্রয়োজন। এটা লক্ষ করা গেছে যে গতানুগতিক জরিপের ফল জানার আগেই রোগ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী যথাযথ প্রতিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নতুন ভেরিয়েন্টের জিন জরিপ করে দেখতে হবে বর্তমান ভ্যাকসিন রোগ প্রতিরোধে কার্যকর কি না। এটা খুবই জরুরি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য। জরিপের তথ্য সংরক্ষণের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রয়োজন, যেখানে ভ্যাকসিনপ্রাপ্তদের সংখ্যা (দুই ডোজ এবং তিন ডোজ), আবার আক্রান্তের সংখ্যা, মনোক্লনাল অ্যান্টিবডিপ্রাপ্তদের সংখ্যা, মানুষের শরীরে ভ্যাকসিন অ্যান্টিবডি টাইটার কমে যাওয়ার তথ্য ইত্যাদি সংরক্ষিত থাকবে।

রোগ প্রশমন কৌশল 
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মতো করোনাভাইরাসও বায়ু দ্বারা প্রবাহিত হয়ে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এর নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যেমন—মাস্ক ব্যবহার, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, বায়ু সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, অসুস্থ লোকদের বাড়িতে থাকার পরামর্শ এবং রোগ নির্ণয় পরীক্ষা সবার আওতায় আনা। বাড়িতে, অফিসে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, বাসে, রেস্টুরেন্টে বায়ু শোধনব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। এর জন্য সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। এটা যারা নিজ দায়িত্বে করবে তাদের ট্যাক্স সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। সব নতুন ভবনে বায়ু শোধনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকারি নির্দেশ প্রদান করতে হবে।

জনসাধারণকে উৎসাহ প্রদান করতে হবে উন্নত মানের মাস্ক ব্যবহার করতে, যেমন—এন-৯৫ অথবা কেএন-৯৫ মাস্ক, যাতে উন্নত মানের ফিল্টার ব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলো সব ভাইরাসজনিত ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধে সক্ষম। আমদানীকৃত অনেক এন-৯৫ মাস্ক গুণগতভাবে নিম্নমানের, যা নির্ধারণের জন্য সরকারি ব্যবস্থা থাকতে হবে। রোগ সংক্রমণ রোধে জনস্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনাবলি সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করতে হবে যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের স্থায়ী উপস্থিতিই বর্তমান সময়ের নতুন স্বাভাবিকতা। এটা সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য শুধু করোনা নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না, সমসাময়িক অন্যান্য ভাইরাস, যেমন—ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মাস্কের যথাযথ ব্যবহার এবং ভ্যাকসিন এগুলো নিয়ন্ত্রণে সক্ষম। ভাইরাসজনিত ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধে সবাইকে তিন ডোজ করোনা ভ্যাকসিনের সঙ্গে এক ডোজ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিনও নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও মাস্ক পরিত্যাগ করা যাবে না এবং মাস্কের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জনসচেতনতার বিকল্প নেই।     

লেখক : মেডিক্যাল ডিরেক্টর, সংক্রামক ব্যাধি বিভাগ, সুমা হেলথ সিস্টেম, বারবারটন, ওহাইও, যুক্তরাষ্ট্র; ফেলো, আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ানস



সাতদিনের সেরা