kalerkantho

বুধবার ।  ২৫ মে ২০২২ । ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৩ শাওয়াল ১৪৪৩  

দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০২১

টানা চতুর্থবার দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২৬, টিআইবির উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৫ জানুয়ারি, ২০২২ ১৭:০১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টানা চতুর্থবার দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২৬, টিআইবির উদ্বেগ

বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২১-এ টানা চতুর্থবার বাংলাদেশের স্কোর (২৬) অপরিবর্তিত। বৈশ্বিক গড় স্কোরের (৪৩) তুলনায় এবারও বাংলাদেশের স্কোর অনেক কম এবং গতবারের মতোই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থানে আছে। গত এক দশকে সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ও অবস্থানের স্থবিরতা প্রমাণ করে, দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা আশঙ্কাজনক।  

এ প্রেক্ষিতে কোনো ভয় বা অনুকম্পা ব্যতিরেকে প্রধানমন্ত্রীঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’-এর কার্যকর প্রয়োগ এবং অপরাধের দায়মুক্তির চর্চা বন্ধ করে অবস্থান ও পরিচয় নির্বিশেষে দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

বিজ্ঞাপন

  

আজ মঙ্গলবার সকালে সিপিআই-২০২১-এর বৈশ্বিক প্রকাশ উপলক্ষে অনলাইনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান প্রকাশ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, ‘২০২১ সালের সূচকে ০-১০০ স্কেলে টানা চতুর্থবার অপরিবর্তিত ২৬ স্কোর পেয়েছে বাংলাদেশ। গত এক দশকের স্কোরের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ২৬-এ স্থবিরতা এবং সার্বিকভাবে অবস্থানের উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন না হওয়া হতাশাব্যঞ্জক। এবারের সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন থেকে গণনা অনুযায়ী ২০২০-এর তুলনায় ১ ধাপ উন্নতি হয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। আর সর্বোচ্চ থেকে গণনা অনুযায়ী এক ধাপ পিছিয়ে ১৪৭তম।  

একই স্কোর পেয়ে এবার নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের সাথে যৌথভাবে ১৩তম অবস্থানে মাদাগাস্কার ও মোজাম্বিক। ২০১২ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে অষ্টমবারের মতো এবারও বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্ন এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন, যা বিব্রতকর, উদ্বেজনক ও হতাশার। ’

আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মন্জুর-ই-আলমের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা- নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।  

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২১ সালের সিপিআই অনুযায়ী ৮৮ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড। ৮৫ স্কোর নিয়ে যৌথভাবে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে সিঙ্গাপুর, সুইডেন ও নরওয়ে এবং ৮৪ স্কোর পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড। আর ১১ স্কোর পেয়ে তালিকার সর্বনিম্ন দক্ষিণ সুদান, ১৩ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে তালিকার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন সিরিয়া ও সোমালিয়া এবং ১৪ স্কোর পেয়ে তৃতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে ভেনেজুয়েলা।  

এ সময় ড. জামান বলেন, "সূচকে বাংলাদেশের আরো ভালো করার সুযোগ ছিল। যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীঘোষিত ‘শূন্য সহনশীলতা’ অঙ্গীকার বাস্তবে প্রয়োগ করা যেত, দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অকার্যকরতা ও বিচারহীনতার অবসান ঘটিয়ে আইনের শাসন নিশ্চিত করা যেত এবং সরকারি ও রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্তিগত উন্নয়নের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা যেত, তাহলে আমাদের স্কোর ও অবস্থানের আরো উন্নতি হতে পারত।

কভিড-১৯ অতিমারির সংকটময় মুহূর্তে দেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রকট দুর্নীতি- বিশেষ করে, উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির বিচার না হওয়া, আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতে ভয়াবহ খেলাপি ঋণ ও জালিয়াতি, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের অবস্থান ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার ঘাটতিও আমাদের অবস্থানের উন্নতিতে অন্তরায় হয়েছে। বিভিন্ন নীতি ও তার প্রয়োগ ক্রমাগত জনস্বার্থ বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতাবানদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক শুদ্ধাচারের অবক্ষয়, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি কাজে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগসূত্রতা এবং রাঘব বোয়ালদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বাংলাদেশের আরো অগ্রগতি অর্জনের সুযোগ নষ্ট করেছে। "

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, "দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের দুই-তিন শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি খাতে সেবা নিতে গিয়ে যাঁরা ঘুষ প্রদানে বাধ্য হন, তাঁদের ৮৯ শতাংশের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবায় অভিগম্যতা অসম্ভব। দুর্নীতি এখন আমাদের সাধারণ জীবনাচারের অংশ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সুফল সাধারণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে না। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের সুযোগ ও সম্ভাবনা আছে, তবে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক ‘যদি-কিন্তু’ রয়েছে। আমাদের আইন আছে, রাজনৈতিক অঙ্গীকারও আছে। কিন্তু যাদের ওপর এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ভার, তাদের একাংশই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, দুর্নীতির ফলে লাভবান, দুর্নীতিকে সুরক্ষা দেয় এবং দুর্নীতির প্রসারে কাজ করে। তাই এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। "

‘দুর্নীতি, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র’- এবারের সিপিআইয়ের প্রতিপাদ্য উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বৈশ্বিক দুর্নীতি পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এবারের সিপিআই অনুযায়ী বৈশ্বিক দুর্নীতি পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। বিশেষ করে, গত এক দশকে ক্রমবর্ধমান মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গণতন্ত্রের ঘাটতির ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সারা বিশ্বেই একধরনের স্থবিরতা চলছে। কোনো দেশই শতভাগ স্কোর করতে পারেনি। ১৮০টির মধ্যে ১০০টি দেশ বৈশ্বিক গড় ৪৩-এর কম স্কোর করেছে।   ১৩০টি দেশের স্কোর ৫০-এর নিচে।  
২০২০-এর তুলনায় স্কোর বেড়েছে ৬৫টি দেশের, ৬৬টি দেশের স্কোর কমেছে এবং ৪৮টি দেশের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি দেশ তাদের ইতিহাসের  অপরিসর্বনিম্ন স্কোর করেছে। আর গত ১০ বছরে সার্বিকভাবে ৮৩টি দেশের স্কোর হ্রাস পেয়েছে, ৮৪টি দেশের বৃদ্ধি পেয়েছে।



সাতদিনের সেরা