kalerkantho

বুধবার ।  ১৮ মে ২০২২ । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৬ শাওয়াল ১৪৪৩  

মঙ্গলালোকে

কিছু মামুলি ঘটনা যখন রোমহর্ষক হয়ে ওঠে

মিরাজুল ইসলাম   

২৫ জানুয়ারি, ২০২২ ০৪:১৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কিছু মামুলি ঘটনা যখন রোমহর্ষক হয়ে ওঠে

গল্প বা সিনেমায় কোনো থ্রিলারধর্মী দৃশ্যে শরীরের লোমকূপে শিহরণ অনুভূত হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। এ ছাড়া প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কিংবা বিশেষ মুহূর্তে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাওয়ার বিষয়টির সঙ্গেও সবাই কমবেশি পরিচিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই ‘শিহরণ’ অনুভূতি একটি স্বাস্থ্যকর শারীরিক প্রক্রিয়া। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীদের ক্ষেত্রে এটি বেশি ঘটে থাকে।

বিজ্ঞাপন

সংগীত কিংবা চলচ্চিত্র ছাড়াও লোম বা রোমহর্ষণের সংবেদনশীলতা জড়িত থাকে সরাসরি চাক্ষুষ করা ঘটনার সঙ্গে, যা সরাসরি মস্তিষ্ককে আঘাত করে।
আবার মানসিকভাবে অপ্রস্তুতকর কোনো বিষয় অবলোকন করলেও গা ছমছম অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এই অনুভূতিলব্ধ অভিজ্ঞতা ব্যক্তি বা সামাজিক পর্যায়ে না থাকলে এক ধরনের বোধশূন্যতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

গত সপ্তাহে বাস্তবজগতে ঘটে যাওয়া এমন বিশেষ কিছু ঘটনা অবলোকন করে ব্যক্তিগতভাবে শরীরের লোম একাধারে হর্ষ ও বিষাদে শিহরিত হয়েছিল। জানি না, ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়ায় অন্য কারো এমন অভিজ্ঞতা হয়েছে কি না!

এর মধ্যে তিনটি ঘটনা এই পরিসরে উল্লেখ করতে চাই। এমন নয়, ঘটনাগুলোর কারণে অন্য কারো মধ্যে একই অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে কিংবা হবে। এটি সম্পূর্ণ নিজস্ব মনোবৃত্তির ব্যাপার।

প্রথম ঘটনাটি হলো, সোশ্যাল মিডিয়া মারফত তুরস্কের কোটিপতি আইসক্রিম বিক্রেতা শিলগিন দমদুরমাজেকে ঢালাওভাবে নকল করার ব্যর্থ চেষ্টা।

ঢাকা বাণিজ্য মেলায় আইসক্রিম বিক্রির এমন প্রচেষ্টা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের শিক্ষার্থীদেরও একই সুরে দল বেঁধে নাচতে দেখা গেল। বিচ্ছিন্নভাবে আরো অনেকেই সেই তুর্কি নাচন নকল করার চেষ্টা করেছেন। তা অবলোকন করে রোমহর্ষণের অনুভূতি সৃষ্টি ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার।

বিসদৃশ কোরিওগ্রাফের এই নকলকাণ্ডটি বিশ্বায়নের উদ্ভট প্রতিক্রিয়া। প্রজন্ম সম্ভবত ঠিক পথে হাঁটছে না, কিংবা এটাই হয়তো তাদের যুগের ধর্ম। দেশীয় সংস্কৃতিকে এমন ধারা বিঘ্ন করছে কি না এজাতীয় সস্তা ধারণা পোষণ না করেও বলা যায়, প্রজন্মের রুচি নানা কারণে বিপন্নপ্রায়। সম্ভবত এই নৃত্যপটীয়সী প্রজন্ম যেমন উদয়শংকর বা বিরজু মহারাজকে চেনে না, তেমনি চেনে না স্বদেশি লুবনা মরিয়মকে। মোবাইল স্ক্রিনের নির্দিষ্ট ‘ভাইরাল’ ফ্রেমে বন্দি তাদের মনন এবং মানসিকজগৎ।

দ্বিতীয় ঘটনাটি চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনসংক্রান্ত। এমন নজিরবিহীন নির্বাচন টালিউডে আগে কখনো হয়নি। সিনেমার কাহিনির মতোই হাসি-কান্না-সংঘাত-ট্র্যাজেডি কোনো কিছুরই কমতি ছিল না।

সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের নির্বাচন কায়দায় পরিশীলিত শিল্প ছিল মোটাদাগে অনুপস্থিত। বাস্তবে দেখা গেছে, স্লোগানমুখর উপজেলা নির্বাচনের পরিবেশ। যেখানে নায়ক রিয়াজ ‘ধান্দাবাজ গাড়িতে চড়ে, শিল্পীরা সব ভাতে মরে’ স্লোগান দিলেন। তারপর কাঁদলেন, আবার নাচলেন। সাধারণ জনগণ উপভোগ করলেন পর্দার বাইরের কার্যকলাপ। অভিনয়শিল্পীদের এই ডামাডোলের মাঝে অকস্মাৎ নিহত হলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি থেকে বাদ পড়া একজন অভিনেত্রী।

সিনেমার কলাকুশলীদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, ক্রমে রাজনৈতিক বাতাবরণে ঢাকা পড়ে যাচ্ছেন তারকা-অভিনয়শিল্পীরা। অভিনয়ের বাইরে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাইবার উদগ্র বাসনা এখন সরাসরি কেউ গোপন করতে চাইছেন না। শিল্পীসমাজের অধিকারের আন্দোলন করতে গিয়ে নির্বাচনে অভিনয় করাটাও এখন যেন জীবন সংগ্রামের অংশ। এ ক্ষেত্রে অভিনেতা-অভিনেত্রীর পরিচয়টুকু স্রেফ একটি হাতিয়ার। রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিতি পাওয়ার পরোক্ষ উদ্দেশ্য এখন স্পষ্ট।

আপাতদৃষ্টিতে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার নেপথ্যের কারণ খোঁজার আগে বুঝে নিতে হবে যেকোনো উপায়ে রাজনৈতিক বাতাবরণের ছায়ায় আশ্রয় খুঁজতে মরিয়া আমাদের শিল্পীসমাজ। বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ে এমন পরিস্থিতি আগে কখনো সৃষ্টি হয়েছিল কি না তা তর্কসাপেক্ষ!

সর্বশেষ লোম খাড়া হওয়ার মতো ঘটনাটি দেখলাম নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন মেয়র নির্বাচনসূত্রে।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে অনেকে এই নির্বাচনে গণতন্ত্রের সুবাতাস বয়ে যেতে দেখেছেন। সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের খোলাখুলি সংবাদ সম্মেলন কিংবা প্রার্থী তৈমূর খন্দকারের টেবিল থাপড়ানো দেখে তাঁদের ভেতর তেমন কোনো শিহরণ জাগেনি। এজাতীয় বিষয়গুলো সংবেদনশীল মননকে ভোঁতা করে ফেলেছে বহু আগে। বরং মিডিয়ার কল্যাণে কমেডি প্যাকেজ নাটকের আমেজ পাওয়া গেছে।

তবে এজাতীয় রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টিতে লোমকূপে শিহরণ জেগেছিল ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে। ভোটকেন্দ্রে সংসদ সদস্য শামীম ওসমান এবং নির্বাচিত মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর ভোট দেওয়ার মুহূর্তে অসংখ্য ফটো সাংবাদিকের টান টান উত্তেজনাকর আচরণে ‘রোমহর্ষণ’ ঘটেছিল। হলিউড-বলিউডে তারকাদের পেছনে ছুটে চলা পাপারাৎসিদের সঙ্গে সেই দৃশ্যের মিল পাচ্ছিলাম। এক ধরনের উন্মত্ত হুলস্থুল পরিবেশ সৃষ্টি করে ভোট প্রদানের ন্যূনতম গোপনীয়তার ধার ধারেননি, সেদিন ক্যামেরা হাতে সাংবাদিকরা। বিশেষ করে বুথকেন্দ্রে মেয়র আইভীর ভোট প্রদানের সময় সাংবাদিকদের ছবি তোলার আকুতি ছিল অভূতপূর্ব। বস্তুত কোনো ধরনের নির্বাচন আচরণবিধি মানা হয়নি সেই মুহূর্তে। বলা বাহুল্য, আমজনতার রুচির চাহিদা অনুযায়ী পুরো নির্বাচনী ব্যাপারটিকেই যেন সার্কাসে পরিণত করা হয়েছিল।

তবে মনে দাগ কেটেছিল নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যতিক্রমী ঘটনা। নবনির্বাচিত মেয়র আইভী তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ‘কাকা’ তৈমূরের সঙ্গে মিষ্টিমুখ করানোর ছবিটি উষ্ণতা ছড়িয়েছে। সেখানেও ছিল ছবি তোলার দৃষ্টিকটু প্রতিযোগিতা।

প্রাগুক্ত উত্তাপ ছড়ানো ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করে গায়ের লোম যখন খাড়া হয়ে যাচ্ছিল তখন ভাবছিলাম, সভ্যভব্য এবং সংস্কৃতিবান হওয়ার জন্য আমাদের আর কতটা পথ পাড়ি দিতে হবে? এই ঘটনাগুলোর বাইরে শিহরণ জাগানো অসংখ্য ‘লোমহর্ষক’ ঘটনা প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করছি আমরা।

একটি মানসিক এবং মানবিক ভারসাম্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিবেশ আর কত দিন কাল্পনিক থাকবে!

লেখক : তথ্যচিত্র নির্মাতা, লেখক ও চিকিৎসক



সাতদিনের সেরা