kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস

উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ ১০ জন গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০৯:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ ১০ জন গ্রেপ্তার

প্রতিরক্ষা মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের ডিফেন্স ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের ৫৫০টি পদের বিপরীতে নিয়োগে গত শুক্রবার ৭০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ডিভাইসের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র বাইরে পাঠানো হয়েছিল। আবার বাইরে থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর পাঠানো হয় পরীক্ষাকেন্দ্রে নির্ধারিত পরীক্ষার্থীদের কাছে।

ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হওয়া সরকারি এই নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও উত্তরপত্র সরবরাহের অভিযোগে এক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

বিজ্ঞাপন

 

গত শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মিরপুর, কাকরাইল ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মাহমুদুল হাসান আজাদ, মাহবুবা নাসরীন রূপা, নোমান সিদ্দিকী, আল আমিন রনি, নাহিদ হাসান, শহীদ উল্লাহ, তানজির আহমেদ, রাজু আহমেদ, হাসিবুল হাসান ও রাকিবুল হাসান। এঁদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান আজাদ হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের (সিজিএ) কার্যালয়ের কর্মকর্তা এবং মাহবুবা নাসরীন রূপা বগুড়ার ধুপচাঁচিয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান।

তাঁদের কাছ থেকে ছয়টি ইয়ার ডিভাইস, মাস্টারকার্ড, মোবাইল সিম, ব্যাংকের চেক পাঁচটি, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প সাতটি, স্মার্টফোন ১০টি, বাটন মোবাইল ছয়টি, প্রবেশপত্র ১৮টি এবং চলমান পরীক্ষার ফাঁস হওয়া তিন সেট প্রশ্নপত্র জব্দ করা হয়।

গতকাল শনিবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবিপ্রধান) এ কে এম হাফিজ আক্তার এই তথ্য জানান।

ডিবিপ্রধান হাফিজ আক্তার বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্রের সদস্য। গোয়েন্দা পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, চক্রের সদস্যরা ইলেকট্রনিক ডিভাইস, মোবাইল অ্যাপ ও ব্যক্তি পরিবর্তন করে পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, উত্তর ও সমাধান সরবরাহসহ অসদুপায় অবলম্বন করতে পারেন। এমন তথ্যের ভিত্তিতে ডিবির একটি দল কাকরাইলে নিউ শাহিন হোটেল থেকে প্রথমে গ্রেপ্তার করে অসাধু উপায় অবলম্বনকারী চক্রের সদস্য দুই পরীক্ষার্থীকে। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্য মতে কাফরুল থানার সেনপাড়া পর্বতা এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ডিভাইস, প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্রের খসড়াসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ডিবি পুলিশের অন্য দল বিজি প্রেস উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে পরীক্ষার্থী এবং অন্যতম পরিকল্পনাকারী মাহবুবা নাসরীন রূপাকে নগদ টাকা, ডিজিটাল ডিভাইসসহ গ্রেপ্তার করে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।

হাফিজ আক্তার আরো বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান আজাদ, নাহিদ হাসান, আল আমিন সিদ্দিকী এর আগেও প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত ঘটনায় ২০১৩, ২০১৬ ও ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

বিভিন্ন সোশ্যাল অ্যাপ ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে অন্যদের যোগসাজশে পরীক্ষার হল থেকে প্রশ্ন ফাঁস করতেন এঁরা। এ ছাড়া পরীক্ষার হলের বাইরে ওয়ানস্টপ সমাধান কেন্দ্র বসিয়ে স্মার্ট ওয়াচ, ইয়ার ডিভাইস, মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে উত্তর সরবরাহ করার কাজ করতেন তাঁরা।   

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ডিবিপ্রধান বলেন, চক্রটির একটি গ্রুপ পরীক্ষার্থী সংগ্রহ ও অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। নগদ, রকেট, বিকাশসহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও চাকরি পাইয়ে দিতে অর্থ লেনদেন করতেন তাঁরা। তাঁরা টার্গেট পরীক্ষার্থীপ্রতি ১৪ থেকে ১৬ লাখ টাকার লিখিত চুক্তি করতেন। যেহেতু এমসিকিউ পরীক্ষা, তাই এমসিকিউ পরীক্ষায় পাস করার পরই ভাইভা। তাই এমসিকিউ পরীক্ষার আগে কিছু টাকা নিয়ে নেন তাঁরা। নিয়োগ পাওয়ার পর বাকি টাকা দেওয়ার চুক্তি হয়।

ডিবিপ্রধান বলেন, এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যাংক, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন, হিসাব নিরীক্ষক কার্যালয়, জ্বালানি অধিদপ্তর, সমবায় অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তর, সাধারণ বীমা করপোরেশনসহ অন্যান্য সংস্থার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও উত্তরপত্র সরবরাহ করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।   

প্রশ্ন ফাঁসের সর্বশেষ ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল করা হবে কি না, এই প্রশ্নের জবাবে হাফিজ আক্তার বলেন, ‘কোনো সংস্থাই চায় না পরীক্ষা বিতর্কিত হোক। পরীক্ষা বাতিল হবে কি না, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দপ্তরই সিদ্ধান্ত নেবে। ’

চক্রে বগুড়ার ধুপচাঁচিয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবা নাসরীন রূপার ভূমিকা সম্পর্কে ডিবিপ্রধান বলেন, চক্রে তাঁর ভূমিকা ছিল মাধ্যম হিসেবে কাজ করা। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে চক্রের একটি গ্রুপ অর্থ সংগ্রহ করেছে আর আরেকটি গ্রুপ ডিভাইস সরবরাহ করেছে। রূপা নিজে পরীক্ষা দিয়েছেন, সঙ্গে অন্য পরীক্ষার্থীদের কাছে ডিভাইস সরবরাহের কাজ করেছেন। এঁদের মধ্যে চক্রের শিক্ষার্থী তিনজন, চক্রের সদস্য সাতজন। ১৮ শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁদের চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত তদন্তে ৯ শিক্ষার্থীর কাছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের উত্তর সরবরাহের তথ্য মিলেছে।

ডিবি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন। ডিএমপির গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মশিউর রহমানের নির্দেশনায় অভিযানটি পরিচালিত হয়।



সাতদিনের সেরা