kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

নির্বাচন কমিশন আইন নিয়ে কথা

আবদুল মান্নান   

২৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০৪:৪৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নির্বাচন কমিশন আইন নিয়ে কথা

দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে এই সময়ের আলোচিত বিষয় নির্বাচন কমিশন আইন। এরই মধ্যে আইনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদে পাস হয়েছে। প্রকাশিত খবর থেকে জানা যাচ্ছে, আইনমন্ত্রী আজ এটি সংসদে উত্থাপন করবেন। সব কার্যপ্রণালী মেনে সংসদের এই অধিবেশনে আইনটি পাস হয় কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়।

বিজ্ঞাপন

সব ঠিক থাকলে আগামী ২০২৩ সালের শেষের দিকে দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা আছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ সামনের মাসে শেষ হয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক সংস্থা। সেটি গঠন করার দায়িত্ব একান্তভাবে রাষ্ট্রপতির। সব সময় তিনি এই কমিশন এককভাবে গঠন করেছেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান একটি রেওয়াজ চালু করেছিলেন। কমিশন গঠন করার আগে তিনি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলতেন। তাদের পরামর্শ শুনতেন। জিল্লুর রহমানের প্রয়াণের পর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও এই রীতি বজায় রেখেছেন। তিনিও নির্বাচন কমিশনে তালিকাভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে তাদের মতামত জানার জন্য। রাষ্ট্রপতির ডাকে সাড়া দিয়ে অনেক রাজনৈতিক দল তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলেও বিএনপিসহ বাম ঘরানার দলগুলো রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে সাড়া দেয়নি।

অনেকেই বলেন, নির্বাচনের আগেই নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সংবিধানে যে আইনের কথা উল্লেখ আছে, সেই আইনটি আগে করা হোক। বিশ্বের অনেক দেশে এমন আইন আছে। আবার এজাতীয় আইন নেই এমন দেশের সংখ্যাও কম নয়। তবে একটি আইন থাকলে তা কমিশন গঠনে সহায়ক হয়। তবে এটাও সত্য যে আইন করে নির্বাচন কমিশন গঠন করলেই যে নির্বাচন ভালো হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। একটি নির্বাচন ভালো হবে কি না তা নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা আর নির্বাচন কমিশনের ওপর। সংবিধানে তাদের অনেক ক্ষমতা দেওয়া আছে। তারা যদি এই ক্ষমতা সঠিকভাবে ব্যবহার করে, তাহলে যেকোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে বাধ্য।

নির্বাচন কমিশন আইন প্রণয়ন নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। তবে যে আইন ৫০ বছরে হয়নি, তা করাটা সময়সাপেক্ষ। কয়েক দিন আগে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আইন প্রণয়নের বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করে। এর পরদিন নির্বাচন কমিশন আইনের একটি খসড়া মন্ত্রিপরিষদে পাস হয়। বর্তমানে রাষ্ট্রপতি যে পদ্ধতিতে (বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা করে) নির্বাচন কমিটি গঠন করেন এই খসড়া অনেকটা একই রকম। আইনের খসড়া আজ সংসদে উত্থাপিত হলে তার ওপর আলোচনা হবে, এরপর তা সংসদীয় কমিটিতে যাবে। সেখানে তা বিচার-বিশ্লেষণ করে আবারও সংসদে পেশ করা হবে। এই সংসদে তা পাস হতেও পারে আবার না-ও পারে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এই আইন পাস হবে কি না তা এখনো পরিষ্কার নয়। এই যখন অবস্থা, তখন যথারীতি এই খসড়া আইন নিয়ে বিএনপিসহ তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল দল, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী তার সমালোচনা করা শুরু করেছে। একটি সংস্থা বলেছে, আইনটি করার আগে অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। দেশের যেকোনো নির্বাচনে মূল অংশীজন দেশের জনগণ। তার সঙ্গে আছে রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি আবার বর্তমান সরকারকে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করে এবং বলেছে সরকারের এই আইন করার কোনো এখতিয়ার নেই।

প্রায় ১৫ বছর (২০০৬ থেকে এ পর্যন্ত) দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তার মিত্ররা ক্ষমতার বাইরে। যে দলটি ক্ষমতা দখল করে গঠিত হয়েছিল সেই দলটি এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা কিছুটা হলেও অস্বাভাবিক। অন্যদিকে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতায় করোনার কারণে মুক্ত হয়ে পরিবারের সঙ্গে আছেন। তিনি নানা রোগে আক্রান্ত। পছন্দসই হাসপাতালে নিজের বাছাই করা চিকিৎসকদের অধীনে চিকিৎসাও নিচ্ছেন। অন্যদিকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে লন্ডনে সপরিবারে পলাতক জীবন যাপন করছেন। তিনি সেখানে বসে চুটিয়ে রাজনীতি করছেন এবং প্রতিনিয়ত কী উপায়ে বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলা যায় তার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

২০০৯ সাল থেকে দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে। এই সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হয়েছে। আওয়ামী লীগ দল থেকে সব আবর্জনা দূর করে যদি প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় সঠিক ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দিতে পারে, তাহলে দলটির বিরুদ্ধে যত ষড়যন্ত্রই হোক না কেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আবার ক্ষমতায় আসাটা খুব কঠিন হবে না। দেশের জনগণ সিদ্ধান্ত নিতে কখনো ভুল করে না। আর এই মুহূর্তে দলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছে এ দেশের কিছু সুধী ও তাঁদের কিছু সংগঠন। নির্বাচনের পর তাঁরা সবাই জিগির তুললেন ২০০৬ সালে নির্বাচন বানচাল ও এক-এগারোর সরকার আনতে আওয়ামী লীগের একটি বড় ভূমিকা ছিল। তার কিছুদিন পর শুরু হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার। খালেদা জিয়া দাবি করলেন, এই বিচার বন্ধ করতে হবে আর যাঁদের বিচার হচ্ছে তাঁরা সবাই দেশপ্রেমিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ। বিএনপির এই তৎপরতা ব্যর্থ হলে তাদের দৃষ্টি পড়ে পদ্মা সেতুর বায়বীয় দুর্নীতির ওপর। শেষতক প্রমাণিত হলো পুরো বিষয়টা ছিল একটি বড় ষড়যন্ত্রের অংশ।

শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে বললেন, পদ্মা সেতু হবে, আর তা হবে নিজেদের অর্থায়নে। দেশের কয়েকজন পণ্ডিত বললেন, বলেন কী শেখ হাসিনা। এটা কি বাঁশের সাঁকো। সেই পদ্মা সেতু উদ্বোধন করার কথা এই জুনে। তবে বিশ্বব্যাংক বা তাদের পেছনে যে বড় শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আছে তারা তাদের প্রতি এই অবজ্ঞা কেন মেনে নেবে?

র‌্যাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা কিছু মানবাধিকার সংস্থা দৌড়ঝাঁপ করছে। ২০০৪ সালে বিএনপির আমলে র‌্যাব গঠিত হয়েছিল। তখন র‌্যাবের হাতে ৪৪ জন মানুষ, হতে পারে তারা সন্ত্রাসী নিহত হয়েছিল। এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য যেন আদালতে কোনো বিচার হতে না পরে তার জন্য বিএনপি সরকার একটি ইনডেমনিটি আইন জারি করেছিল। তখন কোথায় ছিল যুক্তরাষ্ট্র বা এসব তথাকথিত মানবাধিকার সংস্থা? পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন যতই ঘনিয়ে আসবে এমন আরো অনেক ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হবে। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করার দলিল বাংলাদেশের হাতে এসেছে বলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি জানিয়েছেন।

অথচ এই বিএনপি ২০১৮ সালে বর্তমান সংসদ গঠনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল এবং বেশ কয়েকটি আসনে জয়ী হয়েছিল।

অনেকের প্রশ্ন, ২০২৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি কি অংশ নেবে? এই মুহূর্তে বলা হয়তো মুশকিল। কিন্তু যেহেতু নির্বাচন মানেই বিএনপির জন্য কোটি কোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্য, তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে নারায়ণগঞ্জ মডেলে। প্রার্থী আসলে বিএনপি বা জামায়াতের কিন্তু বলা হবে স্বতন্ত্র। জিতলে তখন তাঁকে বিএনপি লুফে নেবে, যেমনটি নিয়েছে কুমিল্লায়। আর হেরে গেলেন তৈমূর আলম খন্দকার। মডেল তৈরি হয়ে আছে। কিছুদিন বিএনপি নির্বাচন কমিশন আইন নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, তারপর হাতে হয়তো অন্য কোনো এজেন্ডা এসে যাবে।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক



সাতদিনের সেরা