kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দিলে কারচুপি করতে হয় না

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০৪:২৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গ্রহণযোগ্য প্রার্থী দিলে কারচুপি করতে হয় না

এবারের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা অন্য নির্বাচনেও অব্যাহত রাখতে হবে। তবে এ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার উচিত হবে না। এমন মত দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের।

বিজ্ঞাপন

তাঁরা গতকাল শনিবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ভার্চুয়াল সংলাপে এমন অভিমত জানান।
‘সদ্যঃসমাপ্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন : জনপ্রতিনিধি নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক সিপিডির সংলাপে বক্তারা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব কমাতে সরকারকে পরামর্শ দেন। বক্তারা নির্বাচনে জনবান্ধব প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহবান জানান। তাঁরা বলেন, সদ্য অনুষ্ঠিত নাসিক নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী করা হলে নির্বাচনে কারচুপির প্রয়োজন পড়ে না।

সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে বত্তৃদ্ধতা করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো রওনক জাহান, সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, সংসদ সদস্য আরমা দত্ত ও রুমিন ফারহানা এবং সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।

সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারকে আরো শক্তিশালী করা দরকার। আইভীর মতো যাঁদের সদিচ্ছা আছে, কাজ করতে চান, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ না হলে তাঁরা কিভাবে কাজ করবেন? এ জন্য বড় ধরনের সংস্কার আনতে হবে। স্থানীয় সরকারকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া না হলে এ সমস্যার সমাধান হবে না।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে মাগুরা উপনির্বাচনে ভোট কারচুপির কথা তুলে ধরে রেহমান সোবহান বলেন, সেখানে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কাজ করছিল। সেখান থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পালিয়ে এসেছিলেন। সরকারের নিয়ত ঠিক না হলে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।

রেহমান সোবহান বলেন, নারায়ণগঞ্জের নির্বাচন থেকে একটি বিষয় দেখা যায়, প্রার্থী যোগ্য হলে স্থানীয় সরকার বা জাতীয় নির্বাচনে সরকারের প্রভাব খাটানোর দরকার পড়ে না। ২০১১ সালের নির্বাচনেও সন্ত্রাস ও কালো টাকার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আইভী জয় পেয়েছিলেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী বলেছেন, ‘২০১১, ২০১৬ ও ২০২২—এই তিন সিটি নির্বাচনেই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে। কোনো নির্বাচনেই আমি ষড়যন্ত্রের বাইরে ছিলাম না। আমার দল ক্ষমতায় থাকার পরও এই নির্বাচনে আমি প্রশাসনের সহযোগিতা পাইনি। আমাদের দলীয় কোন্দল ছিল, সে বিষয়ে আমি কিছু বলব না। ’

আইভী বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন কেন বুথ কমাল এবং নারীদের কেন্দ্র চার তলায় করল, আমি জানি না। যে কেন্দ্রে বুথ হওয়ার কথা ছিল ১৮টি, সেখানে গিয়ে দেখলাম বুথ হয়েছে ১০টি। মানুষ গাদাগাদি করে ভোট দিচ্ছে। ’

সংলাপে মূল প্রবন্ধে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সরকার কাজে লাগাতে চেয়েছে। কারণ তারা বার্তা দিতে চেয়েছিল, দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। তবে সাধারণ মানুষ এই বার্তা সঠিকভাবে নিয়েছে কি না, তাতে সন্দেহ রয়েছে। ’

ইভিএমের ব্যবহার নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা তুলে ধরে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘তৈমূর আলম খন্দকার ইভিএম নিয়ে নানা অভিযোগ তুলেছেন। আমাদের এই ইভিএম মেশিন নিকৃষ্ট মানের, যেখানে পুনরায় ভোট গণনার কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ প্রার্থী চাইলে ভোট গণনা করতে পারবেন না। আমি মনে করি, এই ইভিএম জাতীয় নির্বাচনে ব্যবহার করা উচিত নয়। ’

সংলাপে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো সেলিনা হায়াত আইভী জয়ী হয়েছেন ব্যক্তিগত ও দলীয় ভাবমূর্তির কারণে। তৈমূর সাহেব ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ করেছেন। আমি এটি কোনোভাবেই বিশ্বাস করি না। তবে ইভিএমের অনেক সমস্যা আছে। যেমন—আইভীও বললেন, ইভিএমের কারণে তাঁর অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। ’

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন বলেন, নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনটা ব্যতিক্রম না হয়ে এটিকেই সব নির্বাচনে অনুসরণ করা উচিত। স্থানীয় সরকারকে কখনোই কার্যকর করতে দেওয়া হয়নি। আমলাতন্ত্র কিছুতেই তাদের ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নয়। এ ক্ষেত্রে সরকার আমলাতন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নাসিক নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলেই জাতীয় নির্বাচনও শান্তিপূর্ণ হবে—এমন ভাবনা থাকা উচিত নয়। নাসিক নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর হয়েছে, তার অন্যতম কারণ নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছ ভূমিকা এবং প্রার্থীদের শান্তিপূর্ণ আচরণ। সরকার এই নির্বাচনে তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করেনি। কারণ সরকার প্রায় নিশ্চিত ছিল, তাদের প্রার্থী সেখানে জয়ী হবেন।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমি এই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার জন্য কমিশনকে কোনো ক্রেডিট দিচ্ছি না। ক্রেডিট দিচ্ছি দুই প্রার্থীকে, তাঁদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানের জন্য। ’

বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অন্য নির্বাচনের সঙ্গে মিলিয়ে তুলনা করা যায় না। ২০১১ সাল থেকেই এ নির্বাচন যতটা না দলীয় বা প্রতীকের নির্বাচন, তার চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে একটি বিশেষ গোষ্ঠী, পরিবার বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নির্বাচন। ২০১১ সাল থেকে আমরা সেই প্রবণতাটাই দেখছি। ’

রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আইভী কোন প্রতীকে দাঁড়াচ্ছেন বা কোন দলের প্রার্থী হচ্ছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তবে এই নির্বাচন থেকে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের মতো পর্যায়ে আমরা এখনো পৌঁছাইনি। ’

বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে মাগুরায় বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছিল স্বীকার করে রুমিন ফারহানা বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার পেছনে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বিরাট ভূমিকা রাখে। স্থানীয় নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।

সংসদ সদস্য আরমা দত্ত বলেন, ‘রাজনীতির সঙ্গে আমলাতন্ত্রের একটা সংঘাত আছে। এ ক্ষেত্রে কিভাবে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা যায়, সেগুলো নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আমাদের এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। ’



সাতদিনের সেরা