kalerkantho

বুধবার ।  ১৮ মে ২০২২ । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৬ শাওয়াল ১৪৪৩  

টিসিবির ট্রাকের জন্য অপেক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ জানুয়ারি, ২০২২ ০৩:২৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



টিসিবির ট্রাকের জন্য অপেক্ষা

সকাল ১১টা। রাজধানীর কমলাপুর স্টেডিয়াম চত্বরে দেখা গেল কিছু নারীর জটলা। পরনে ময়লা তাঁতের শাড়ি। বেশির ভাগই চল্লিশোর্ধ্ব।

বিজ্ঞাপন

লুঙ্গি পরা কিছু পুরুষও রয়েছেন কাছাকাছি বয়সের। মূল সড়ক লাগোয়া এই স্টেডিয়াম চত্বরে তাঁরা অপেক্ষা করছেন প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে থেকে।

সালেহা বেগম থাকেন কাছেই খালপারের একটি টিনশেড ভাড়া বাসায়। তিনি জানালেন তাঁদের এই অপেক্ষার কারণ। বলেন, ‘এইখানে টিসিবির গাড়ি আসবো। গাড়ি থাইক্কা কম দামে তেল-ডাল কিনুন যায়। এর লাইগা বসে আছি। তয় কুন সময় আইবো কেউ জানে না। ’

গাড়ি এলো দুপুর সাড়ে ১২টায়। ট্রাক দেখামাত্র সবাই একসঙ্গে ছুটে গেল। ট্রাক তখনো থামেনি। ট্রাকের পেছনেই দৌড়াতে লাগলেন সালেহা বেগমরা। অবশেষে খালের পার ঘেঁষে ট্রাক থামল। ডিলার প্রতিনিধি লাইন ধরতে বললেন সবাইকে। এরপর নারীদের লাইনে লেগে গেল হট্টগোল—কে কার আগে ছিল। হট্টগোল রূপ নিল ঝগড়ায়। ডিলার ‘নিউ মিম মনি এন্টারপ্রাইজের’ বিক্রয় প্রতিনিধি বারকয়েক ধমক দিয়ে থামানোর চেষ্টা করলেন। এর মধ্যেই নারী ও পুরুষ ক্রেতার সারি লম্বা হতে লাগল। ১০ মিনিটের মধ্যে ২৫০ থেকে ৩০০ মানুষের দুটি সারি ট্রাকের পেছনে দাঁড়িয়ে গেল।

সারিতে দাঁড়ানো আনোয়ার বলেন, ‘আমি রিকশা চালাই। দেখলাম ট্রাকে তেল-চিনি দিতাছে, তাই দাঁড়াইলাম। বাজারে তেল, ডালের দাম অনেক বেশি। এখান থেকে কিনলে অনেক কমে কেনা যায়। ’

চারজনের সংসারে মাসে তিন লিটারের বেশি তেল, আর দেড়-দুই কেজি ডাল লাগে বলে জানালেন আনোয়ার।

পঞ্চাশোর্ধ্ব আমেনা খাতুন কাছেই খালপার এলাকায় ছেলের সংসারে থাকেন। বলেন, ‘কোনো কাম করি না। তাই লাইনে খাঁড়াইলাম। তবে যে থাক্কাধাক্কি, শরীলে কুলাইতাছে না। ’

গত রবিবার এভাবে রাজধানীর মতিঝিল বক চত্বর, প্রেস ক্লাবের সামনে, মহাখালী সাততলা বস্তি, রামপুরা টিভি সেন্টার, মিরপুর বেনারশিপল্লী, সোয়ারীঘাট, মধুবাগসহ মোট ৬৭টি ডিলারের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করেছে টিসিবি। প্রতি ট্রাকে ১০০ কেজি চিনি, ৫০০ কেজি ডাল, ৭০০ লিটার তেল ও ৩০০ কেজি পেঁয়াজ—মোট ১৬০০ কেজি পণ্য বিক্রি করা হয়। প্রতিজন সর্বোচ্চ চার লিটার তেল, দুই কেজি করে চিনি ও ডাল এবং পাঁচ কেজি করে পেঁয়াজ কিনতে পেরেছেন। সে হিসাবে ট্রাকে থাকা পণ্য ১৭৫ থেকে ২৫০ জনকে দেওয়া গেছে। কিন্তু প্রতি ট্রাকের পেছনে এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষ দাঁড়ায়।

দুপুর আড়াইটায় বক চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, এখানে পুরুষদের একটাই লাইন। ১৫০ থেকে ২০০ মানুষ। লাইনে দাঁড়ানো মজিবুর রহমান জানান, তিনি পাশেই একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। অফিস থেকে কিছুক্ষণের জন্য ছুটি নিয়ে এসেছেন পণ্য কিনতে। দিন ১৫ আগে একবার নিয়েছিলেন তিনি।

পরের দিন সোমবার ৭৬টি ট্রাকে পণ্য বিক্রি করেছে টিসিবি। এদিন প্রতি ট্রাকে দেওয়া হয় ১০০ কেজি চিনি, ৪০০ কেজি ডাল, ৬০০ লিটার তেল ও ৬০০ কিজি পেঁয়াজ। এ হিসাবে প্রতি ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে পেরেছেন ১২০ থেকে ২০০ জন।

সোমবার দুপুরে আজিমপুরে গিয়ে দেখা যায়, বাসস্ট্যান্ডের অদূরে ফুটপাতে বসে আছেন পুরান ঢাকার শহীদনগরের ৯৫ বছর বয়সী শুক্কর আলী। দেরিতে আসায় লাইনের অনেক পেছনে পড়ার কারণে রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসে আছেন। তাঁর সামনে শতাধিক নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। তাঁদের কেউ সকাল ৯টা, কেউ ১০-১১টা থেকে অপেক্ষা করছেন। দুপুর পৌনে ১টা বাজলেও ট্রাক আসার দেখা নেই। লাইনে অপেক্ষমাণ কামরাঙ্গীর চর এলাকার বাসিন্দা মনসুর মিয়া বলেন, ‘রিকশা রাইখ্যা এক ঘণ্টারও বেশি টাইম ধইরা ট্রাকের অপেক্ষায় লাইনে দাঁড়াইয়া রইছি। ’

বর্তমানে বাজারে এক লিটার সয়াবিন তেল কিনতে লাগে ১৬০ টাকা। টিসিবির ট্রাক থেকে কেনা যায় ১১০ টাকায়। মসুর ডাল কিনতে লাগে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা কেজি, টিসিবি থেকে কেনা যায় ৬০ টাকায়। চিনি বাজারে ৭৫ টাকা কেজি হলেও ট্রাকে দাম রাখছে ৫৫ টাকা এবং পেঁয়াজের কেজি বাজারে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা আর টিসিবির ট্রাকে ৩০ টাকা।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সম্প্রতি বলেন, দরিদ্র মানুষের সমস্যা হলে তা সমাধান করাই টিসিবির কাজ। ট্রাক যেকোনো সময় চাইলেই বাড়ানো যাবে। কিন্তু পণ্য আনতে কিছু সময় লাগে। ’ তিনি জানান, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ২১ মাসে মোট তিন লাখ মেট্রিক টন পণ্য প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি করেছে টিসিবি। এর মাধ্যমে চার কোটি ৫৮ লাখ পরিবার উপকৃত হয়েছে। দেশে ১৭ কোটি মানুষ, এর মধ্যে কম-বেশি ছয় কোটি পরিবার।



সাতদিনের সেরা