kalerkantho

সোমবার ।  ১৬ মে ২০২২ । ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৪ শাওয়াল ১৪৪৩  

হাইকোর্টের রায়ে অভিমত

বেসিক ব্যাংকের অর্থ লোপাট মামলার তদন্ত নিয়ে দুদকের বক্তব্য ‘বিভ্রান্তিকর’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ জানুয়ারি, ২০২২ ২২:৫১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বেসিক ব্যাংকের অর্থ লোপাট মামলার তদন্ত নিয়ে দুদকের বক্তব্য ‘বিভ্রান্তিকর’

‘আত্মসাৎকৃত টাকার গতিপথ শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত মামলার তদন্তকাজ শেষ করা সম্ভব না’ রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের মামলার তদন্ত নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের এমন বক্তব্যকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলেছেন হাইকোর্ট।

সেই সঙ্গে আদালত এও বলেছেন, ‘টাকার গতিপথ অনুসরণের দাবি করে মূলত তদন্তকে অহেতুক প্রলম্বিত করে আসামিদের রক্ষা করার এক ধরনের চেষ্টা কিনা সে প্রশ্ন উদ্ভব হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক।

অতএব আমাদের বলতে দ্বিধা নেই যে, কমিশন ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে মামলার তদন্ত পরিচালনা করেছে। যার কারণে সাড়ে পাঁচ বছরেও মামলার তদন্তকাজ শেষ করতে পারেনি; অর্থাৎ তদন্তকাজে স্থবিরতা বিরাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের একটি মামলায় ব্যাংকটির শান্তিনগর শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর জামিন মঞ্জুর করে দেওয়া রায়ে এ অভিমত এসেছে।

বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি) ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত বছর ১৪ মার্চ এ রায় দিয়েছিলেন। সম্প্রতি রায়টি প্রকাশিত হয়েছে।

এ মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে বিষয়বস্তু কী হওয়া উচিত, তা নিয়েও অভিমত এসেছে রায়ে।

রায়ে বলা হয়েছে, ‘এই মামলার তদন্তের মূল বিষয়বস্তু হওয়া উচিত সরকারি কর্মচারী অথবা ব্যাংকার হিসেবে আসামিদের দিয়ে ‘অপরাধমূলক অসদাচরণ’ সংঘটিত হয়েছে কিনা। আমাদের সুচিন্তিত অভিমত এই যে, অপরাধসমূহ প্রমাণে অর্থাৎ ‘আত্মসাৎকৃত অর্থের গতিপথ শনাক্তকরণ’ আদৌ কোনো অপরিহার্য বা বাধ্যতামূলক শর্ত হতে পারে না। বর্তমান মামলাটি মানি লন্ডারিং আইনের অধীনে নয় যে, অর্থের গতিপথ নির্ধারণ অপরিহার্য বা বাধ্যতামূলক। দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারার অপরাধের ক্ষেত্রে আত্মসাৎকৃত অর্থ বা সম্পত্তি উদ্ধার মূখ্য কোনো বিষয় হতে পারে না। বরং দণ্ডবিধির ৪০৫ ধারার ‘অপরাধ বিশ্বাস ভঙ্গের’ সংজ্ঞা অনুযায়ী অভিযুক্তরা তাদের কাছে জিম্মাকৃত কিংবা কর্তৃত্বে বা অধীনে থাকা সম্পত্তি বা টাকার ক্ষেত্রে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে কিনা এটাই মূখ্য বিবেচ্য বিষয়।

তদন্ত নিয়ে কমিশনের বক্তব্যকে ‘বিভ্রান্তিকর’ উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর মামলার এজাহার দাখিল হলেও আজ পর্যন্ত প্রায় ছয় বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও কমিশন মামলার তদন্তকাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। টাকার গতিপথ শনাক্ত করতে পারেনি বলে তদন্তকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে উল্লেখ করে কমিশন দাবি করেছে, মামলার এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)’র নির্দেশনা অনুসরণ করছে।  

আত্মসাৎকৃত টাকার গতিপথ শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত কমিশনের পক্ষে মামলার তদন্তকাজ শেষ করা সম্ভব না। আদালত ক্ষোভ, হতাশা ও দুঃখের সঙ্গো বলতে বাধ্য হচ্ছে যে, কমিশনের এহেন বক্তব্য আদালতের কাছে ‘বিভ্রান্তিকর’ মনে হয়েছে।

দুদককে দায়িত্ব মনে করিয়ে দিয়ে রায়ে বলা হয়েছে, কমিশনের দায়িত্ব দুর্নীতি চিহ্নিত করা এবং অপরাধীকে আইন ও বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। আত্মসাৎকৃত সম্পদ বা অর্থ উদ্ধার কমিশনের মূখ্য কোনো কাজ নয়। সুতরাং অপরাধী ঋণগ্রহীতা অর্থের সামান্য পরিমাণ ব্যাংকে ফেরত দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিল করেছে। এতে কমিশনের আত্মতুষ্ট হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। এ কারণে অপরাধীর দায়মুক্তির কোনো সুযোগ নেই।

আদালতে জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী জয়নুল আবেদীন। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান।

জামিন আবেদনের পর গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সাক্ষাৎকার হলফনামা করে আদালতে দাখিল করেন।

প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে ইকবাল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘বেসিক ব্যাংকের টাকা কোথায় গেছে কার কাছে গেছে সেটি এখনো নির্দিষ্ট করা যায়নি। তাই বেসিক ব্যাংংকের অর্থ আত্মসাতের ৫৬ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ’

মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর জামিনের পক্ষে আইনজীবী জয়নুল আবেদীনের যুক্তি ছিল, কমিশনের চেয়ারম্যানের কথায় সহসাই এ মামলার তদন্তকাজ শেষ হবে না। এর জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। সে কারণে আসামি জামিন পাওয়ার হকদার এবং এ মামলার অন্য আসামিরা জামিনে আছেন।

অন্যদিকে মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর জামিনের বিরোধিতায় একটি প্রতিবেদন দাখিল করে বলেছিলেন, এ সংক্রান্ত ৭টি মামলায় আত্মসাৎকৃত অর্থের মধ্যে ৬০৯ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়াও বেসিক ব্যাংক সংশ্লিষ্ট দুদকের মামলায় এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি একই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকে জমা করা হয়েছে এবং প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার পুনঃতফসিল করা হয়েছে। মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে তদন্তাধীন। মামলার তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম কারণ আত্মসাৎকৃত টাকা নগদ উত্তোলনের মাধ্যমে টাকার অবস্থান গোপন করা হয়েছে।

এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)’র বরাত দিয়ে তিনি আরো বলেছিলেন,  এপিজির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আত্মসাৎকৃত টাকার গন্তব্য পথ নির্ণয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যে কারণে অত্মসাৎকৃত টাকার গতিপথ (ফলো দ্য মানি) নির্ণয় করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।

উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য, হলফনামা পর্যালোচনা করে মোহাম্মদ আলী চৌধুরীকে শর্ত সাপেক্ষে জামিন দেন হাইকোর্ট।

এ বিষয়ে রায়ে বলা হয়েছে, বর্তমান মামলার তদন্তকাজ দীর্ঘ দিনেও সমাপ্ত না হওয়ার কারণে ইতিমধ্যে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ অনেক আসামি হাইকোর্ট বিভাগ থেকে জামিন লাভ করেছেন, যাতে আপিল বিভাগ কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। অবস্থা বিবেচনায় বর্তমান আসামিকে (মোহাম্মদ আলী চৌধুরী) জামিন দেওয়া সমীচীন মনে করা হচ্ছে। তাকে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশত্যাগে বারণ করা হলো। আসামি অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের সুবিধা অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আদালত আইনের নির্ধারিত নিয়মে জামিন বাতিল করতে পারবেন।

বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি মামলায় তিনি জামিনে আছেন। চারটি মামলায় তার জামিন আবেদন শুনানির অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা।  



সাতদিনের সেরা