kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

এই পরিবেশ ইসি বা বিশেষ কোনো দল সৃষ্টি করেনি

ড. তোফায়েল আহমেদ   

১৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০৪:৩৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এই পরিবেশ ইসি বা বিশেষ কোনো দল সৃষ্টি করেনি

নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে একটি পরম্পরা সৃষ্টি হয়েছে। এই পরম্পরাটি শুরু হয় ২০১১-তে। ওই সময় সেলিনা হায়াত আইভী আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তখন বিশেষ করে গণমাধ্যমে নারায়ণগঞ্জকে সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

সেলিনা হায়াত আইভী ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। বিভিন্ন কারণে একটি নির্বাচনের পর  যথাসময়ে পরবর্তী নির্বাচন না হওয়ায় সিটি করপোরেশন হওয়ার আগে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে আইভীর অবস্থান অনেক দীর্ঘ হয়। এই অবস্থা থেকে ২০১১ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আইভী আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ, নাগরিক সমাজ যারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ছিল, তারা আইভীকে সমর্থন দেয়, এমনকি বিএনপি তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে কৌশলগতভাবে তাদের ভোটারদের ভোট আইভীকে দিতে উৎসাহিত করে। এই অবস্থায় তখন প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে আইভী বিজয়ী হন। ওই ঘটনা বড় ধরনের সাহস ও শক্তি জোগায় নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ, যারা শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে চায়, তাদের। সে সময় আইভী ওই ম্যান্ডেট পাওয়ার পর ২০১৬ সাল পর্যন্ত নিজের একটি স্বচ্ছ ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। দীর্ঘ সময় তিনি নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পেরেছেন বলে নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে মনে হয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনেকটা কমে এসেছে, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন কেন্দ্রিক সন্ত্রাস হয়নি।

২০১৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে তাঁকে মনোনয়ন দেয় এবং তিনি আবারও নিজের পক্ষে সাধারণ মানুষ যে আবেগ ধারণ করে, সেই আবেগ কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে জয়ী হন। এবারের নির্বাচনেও তাঁর জনপ্রিয়তার পেছনে অনেক বিষয় কাজ করেছে। অনেক দিন ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে তিনি ধারাবাহিকভাবে অনেক কাজ করতে পেরেছেন এবং সেসব কাজে স্থানীয় জনগণ উপকৃত হয়েছে। এই নগরীর বড় অনেক সমস্যার সমাধান এখনো বাকি থাকা সত্ত্বেও দৃশ্যমান কিছু রাস্তাঘাট হয়েছে, রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় জলাবদ্ধতা নিরসন হয়েছে, খাল সংস্কার এবং বড় একটি পার্ক হয়েছে—এ রকম কিছু কাজ তিনি দেখাতে পেরেছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ দল-মত-নির্বিশেষে যেসব সাধারণ মানুষ, নাগরিক সমাজ তাঁর পক্ষে একসময় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তারা তাঁকে ছেড়ে যায়নি, আর তিনিও তাদের ছেড়ে আসেননি।

এই অবস্থায় নারায়ণগঞ্জে নিরপেক্ষ ভোটের একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে এবং এর একটি ভালো কাঠামো পেয়েছে; যার ফলে এবারের নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শান্তিভঙ্গের, বিধিভঙ্গের অভিযোগ বড়ভাবে কেউ করেননি। সব পক্ষই শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন চেয়েছে। এ ছাড়া নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে নারায়ণগঞ্জ সিটির ভোটারদের মনস্তত্ত্ব—এসব মিলিয়ে যে পরিবেশ গড়ে উঠেছে, সেটিও হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। এই পরিবেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) বা বিশেষ কোনো দল সৃষ্টি করেনি। এর ইনস্ট্রুমেন্টের একটি হচ্ছে আইভী নিজে, আরেকটি হচ্ছে ওই এলাকার মানুষ, যারা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, নানা ধরনের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়ে সুরক্ষাবলয় তৈরি করেছে। তবে এই অনুকূল অবস্থার পরও নারায়ণগঞ্জের নাগরিক সমাজের সব প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যেমন—ত্বকী হত্যার বিচার। এই বিচার এখনো হয়নি। সাত খুনের বিচারের একটি প্রক্রিয়া চলমান। এটি সম্পর্কে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। তবে সাত খুনের মামলার আসামির আত্মীয়-স্বজন এবারের নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছেন। এর পরও নারায়ণগঞ্জ সিটিতে স্থানীয় এবং ইতিবাচক রাজনীতি কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

এই নির্বাচনে মানুষ মার্কা দেখেনি, দেখেছে ব্যক্তি ও তাঁর কাজ। এসব কারণেই সেলিনা হায়াত আইভী এ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। আইভীকে মনোনয়ন না দিয়ে ক্ষমতাসীন দল অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলে এ নির্বাচনের ফল কেমন হতো, তা বলা যায় না। আর নির্বাচনের এই অনুকূল পরিবেশের সুযোগে বিএনপি দলীয়ভাবে সংগঠিত হতে পারত, কিন্তু পারেনি। বিএনপি দলীয়ভাবে এ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এই দলের প্রার্থীকে স্বতন্ত্র প্রতীকে নির্বাচন করতে হয়েছে। তিনি দলের পরোক্ষ সমর্থন পেলেও দল লাভবান হয়নি। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ১৪ জন কাউন্সিলর প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির ৯ জন কাউন্সিলর প্রার্থীও জিতেছেন। জাতীয় পার্টি, বাসদ সমর্থিত এবং দলের বাইরের কাউন্সিলর প্রার্থীরাও জিতেছেন। এর অর্থ এখানে সুষ্ঠু নির্বাচনের একটি পরিবেশ কাজ করেছে। এটি দেখে দেশের অন্যান্য শহরের মানুষও শিক্ষা নিতে পারে।

এ নির্বাচনে আরো একটি বিষয় কাজ করেছে, আইভী যে জিতবেন তা নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো সংশয় ছিল না। আইভী নিজেও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, যে কারণে সরকারিভাবে বাহিনী দিয়ে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের যে অপচেষ্টা হয়, সেসব দিকে তারা যায়নি। আর অপজিশনে যিনি ছিলেন, তাঁরও বিশ্বাস ছিল যে তিনি জিতবেন। সে কারণে তাঁর পক্ষ থেকেও কোনো অনিয়মের আশ্রয় গ্রহণ করা হয়নি। এই যে ভারসাম্য, এটি অনন্য। এটি অন্য এলাকার ক্ষেত্রে কতটা মেলানো যাবে আমি জানি না, তবে নারায়ণগঞ্জ ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই অনন্য অবস্থান দেখিয়েছে। ভালো, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের যে কোনো বিকল্প নেই, এটিও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রমাণ করেছে। যোগ্য প্রার্থী পেলে ভোটারদের রায় ওই প্রার্থীর পক্ষেই যাবে। আইভী বাংলাদেশের ইতিহাসে সে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পেরেছেন। সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে একজন নারী মেয়র হয়েছেন, তিনি নিজের ইতিবাচক ভাবমূর্তি যেভাবে ধরে রেখেছেন, তা এককথায় অসাধারণ।

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহার এ নির্বাচনে কিছুটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আমি ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে। আমি সর্বান্তঃকরণে ইভিএম ব্যবহার চাই। কিন্তু এতে যে সমস্যাগুলো আছে তার সমাধান করতে হবে। একটি সমস্যা হচ্ছে, এতে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক ভোটারের আঙুলের ছাপ মিলছে না। যারা কর্মজীবী মানুষ, তাদের আঙুলের ছাপ নিয়ে সমস্যা হবেই। তাদের আঙুলের রেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এ কারণে কি তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে? এর বিকল্প কী হতে পারে। চোখের মণির চিত্র মিলিয়ে বা অন্য কোনোভাবে তাদের শনাক্ত করার পথ বের করতে হবে। ইভিএম নিয়ে বড় যে সন্দেহ তা হচ্ছে, এর মাধ্যমে দেওয়া ভোট চ্যালেঞ্জ করার কোনো সুযোগ নেই। প্রমাণ করার কোনো ব্যবস্থা নেই। যে সংখ্যাটি বলা হবে, সেটিই গ্রহণ করতে হবে। এটি হতে পারে না। একটি চেক পয়েন্ট থাকতে হবে। ইভিএম থেকে প্রিন্ট আউট বের করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পেপার ট্রেইল থাকতে হবে। এ ধরনের ব্যবস্থা করা বড় কোনো বিষয় নয়। কিন্তু কেন জানি না, তা করা হচ্ছে না। ইভিএমের ভোট সুষ্ঠু, নির্ভুল এবং এর ভোট দ্রুত গণনা করা যায়, কিন্তু এর সুফল পাওয়া যাবে যদি নির্বাচনী এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক থাকে। যদি ভোটকেন্দ্র দখল হয়, ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে না থাকে, পোলিং এজেন্ট না থাকে, তাহলে ইভিএমের ওই সব সুফল পাওয়া যাবে না। সে জন্য ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং ইভিএমকে সন্দেহমুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। বৃদ্ধ এবং ভোটকেন্দ্রে আসতে অক্ষম ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। ভোটের দিনের এক সপ্তাহ আগেই এ সুযোগ দিতে হবে এবং ওই সব ভোট সংরক্ষণ করতে হবে। অনেক দেশে এটি হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তো প্রায় অর্ধেক ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেয়। দেশে এই পদ্ধতি চালু করলে ভোটকেন্দ্রে চাপ অনেক কমে আসবে।

লেখক : অধ্যাপক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ



সাতদিনের সেরা