kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

মঙ্গলালোকে

বন্দিশ-এ মালিক হোতা

মিরাজুল ইসলাম   

১৮ জানুয়ারি, ২০২২ ০৪:২৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বন্দিশ-এ মালিক হোতা

সংগীতের সঙ্গে ধর্মীয় গোঁড়ামির বিবাদ আমাদের দেশে ইদানীংকালের বিষয়। উচ্চাঙ্গ ঘরানা কিংবা বাউলগান, যা-ই হোক না কেন, আঘাত এসেছে নানাভাবে।

তবে গত সপ্তাহে কাওয়ালিগানের আসরকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসিতে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনাটি নিছক বালখিল্য অন্যমনস্ক ছাত্ররাজনীতির অংশ ভাবাটা ভুল হবে।

বরং বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কাওয়ালিগানের আয়োজনের পক্ষে-বিপক্ষে অন্য কোনো গূঢ় কারণ আছে কি না, তা নিয়ে যতটা আলোচনা হওয়ার কথা, তা ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে গতানুগতিক প্রতিবাদের মাঝে।

বিজ্ঞাপন

প্রাথমিকভাবে ‘কাওয়ালি প্রতিহত’ করার ঘটনার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে।

প্রথমত, কাওয়ালির মূল ভাষা উর্দু হওয়ায় তা নিয়ে ‘ভাষাকেন্দ্রিক জাত্যভিমানপ্রসূত’ প্রতিবাদ সংগীতটির আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গ থেকে বড় করে দেখার সুযোগ করে দেয়। আড়ালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ভাবধারার শিক্ষার্থীদের আবেগ পুঞ্জীভূত হওয়ার মওকা মেলে।

দ্বিতীয়ত, কাওয়ালিসংগীতকে একাধারে হিন্দি গান কিংবা পশ্চিমাভাবাপন্ন ব্যান্ডদলগুলোর কনসার্টের মুখোমুখি দাঁড় করানোর সূক্ষ্ম অভিসন্ধি। এর জোর প্রতিবাদের জের ধরে ভবিষ্যতে বড় আয়োজনে কাসিদা-গজল মাহফিল আয়োজনের পথ যেন প্রশস্ত হলো।

যদিও কাওয়ালির পক্ষে পাল্টা প্রতিবাদ যতটা মুক্তজ্ঞানপ্রসূত উদার সাংস্কৃতিক আবহাওয়া নিশ্চিতের নিমিত্তে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক বিবেচনায়। এটি মোটেও বাঙালি বনাম বিহারি সংস্কৃতির সংঘাত ইস্যু নয়।

অথচ প্রজ্ঞাময় পরিবেশে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ারই কথা ছিল না। কাওয়ালির প্রতিবাদে যাঁরা কোনো এক অজানা অ্যাজেন্ডার বাস্তবায়ন করলেন, তাঁরা হয়তো ইতিহাস জানেন না। কিংবা জানলেও তার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞ। পরোক্ষভাবে তাঁরা সুযোগ করে দিলেন ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের।

এখন আমাদের নতুন করে শিখতে হচ্ছে কাওয়ালির ইতিহাসবৃত্তান্ত।

কাওয়ালি মূলত সুফি ঘরানা লোকসংগীতের একটি অংশ।

প্রায় হাজার বছর আগে দিল্লি সালতানাতের আমলে উপমহাদেশের বিশিষ্ট সুফি সাধক নিজামুদ্দীন আউলিয়ার অন্যতম শিষ্য আমীর খসরু (১২৫৩-১৩২৫) কাওয়ালিসংগীতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সেই ধারা পুরো উপমহাদেশে বিভিন্ন মেজাজ এবং আবেগে চর্চা হয়ে আসছে।

বর্তমান প্রজন্মে এরই মধ্যে আত্তীকরণ হয়েছে একাধারে ফোক, রক অ্যান্ড রোল ও সুফি ঘরানা।

এই তিনের মিশেলে ‘সুফি ফোক রক মিউজিক’ হালে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তিনটি ভিন্ন ঘরানার ফিউশন এটি। গিটার-সেতার-স্যাক্সোফোন-পিয়ানো-ড্রামসের সঙ্গে সুফি মেজাজে গাওয়া উর্দু আর হিন্দি গানের বিশাল ক্রেজ চলছে এখন মূলত এমটিভির কোক স্টুডিও সূত্রে। এক বিশাল শ্রোতা তৈরি হয়ে গেছে এই ঘরানার। বিখ্যাত কাওয়ালি ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’- এই ঘরানায় এখনো জনপ্রিয়।

পাশ্চাত্যে অবশ্য ফোক রকের চর্চা বহু আগে থেকেই চলে আসছে। প্রখ্যাত অস্ট্রিয়ান সুরকার জোসেফ হাইডেন (জন্ম ১৭৩২ সাল) ছোটবেলা থেকে লোকসংগীতের ভক্ত ছিলেন। তাঁর সিম্ফনিতে এর রেশ পাওয়া যায়। তবে অর্কেস্ট্রায় সরাসরি লোকসংগীতের ব্যবহার প্রথম করেছিলেন বিথোভেন ঘরানার সেরা সুরকার জার্মানির জোহানস ব্রাহমস। তাঁর ‘হাঙ্গেরিয়ান ডান্সেস’ অর্কেস্ট্রা সাজানো হয়েছে লোকসংগীতকে উপজীব্য করে। এরপর লোকসংগীত নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেন চেক রিপাবলিকের প্রখ্যাত সুরকার অ্যান্তোনি দভোরক, যাঁর জন্ম ১৮৪১ সালে। বোহেমিয়ান লোকসংগীত নিয়ে তিনি রচনা করেন ‘স্লভোনিক ডান্সেস’।

১৯৬৯ সালে চন্দ্র অভিযানের সময় অ্যাপোলো চন্দ্রযানে নিল আর্মস্ট্রং সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন দভোরকের ‘দ্য নিউ ওয়ার্ল্ড’ অর্কেস্ট্রার রেকর্ড। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রাশিয়ান সুরকার ইগর স্ট্রাভিন্সকি বলতেন, তাঁর সুর বোঝে শুধু শিশু ও পশুরা। ফোক মেলোডির সঙ্গে উচ্চাঙ্গ ঘরানার ফিউশন তিনি প্রথম সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন।

আমাদের দেশের নিজস্ব লোকসংগীতের ধারা অনেক সমৃদ্ধ হলেও বাদ্যযন্ত্রের আধুনিকতায় অনেক পিছিয়ে আছে সমসাময়িকতায়। কলকাতার পবন দাস বাউলের জ্যাজ ফিউশনের ধারাবাহিকতায় বাংলা লোকসংগীতে নতুন ধারার যে সূচনা ঘটেছিল, তা এখনো নিরীক্ষার পর্যায় অতিক্রম করতে পারেনি।

সেই সঙ্গে সুফি রক ঘরানার প্রতি সহজাত অমোঘ আকর্ষণের মূল কারণ কিন্তু সুফিজমের ইতিহাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। উপমহাদেশে যার উৎপত্তি ছিল এগারো শতকে গজনভি আমলে আরব-ইরান-আফগানিস্তান থেকে আসা উত্তর ভারত-কাশ্মীর এলাকায় সুফি সাধকদের মাধ্যমে।

পরবর্তী সময়ে হিন্দু ভক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যার মত ও পথ এক স্রোতে মিশে নব্য ইসলামী সুফি ধারার সৃষ্টি হয়। খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী ছিলেন যার পথিকৃৎ। একই সঙ্গে বাঙালি মাটির শরীরে পূর্বপুরুষের রক্তের নাচন আবার নতুন করে জেগে ওঠার কারণটা জানতে চাইলে সুফি ধারার ‘নাথ যোগী’ ও ‘হাথ যোগী’দের উত্তরসূরি কারা, তা অনুধাবন করাটাও সহজ হয়ে ওঠে।

কাওয়ালি লোকসংগীতের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়-রাজনৈতিক যোগসূত্রটি অবচেতন মনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনুধাবন করলেও তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই অনুভব করতে ব্যর্থ।

তাঁর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে উল্লেখ করেছিলেন, ‘খাজাবাবার দরগার পাশে বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান হচ্ছে। যদিও বুঝতাম না ভাল করে, তবুও মনে হতো আরও শুনি। বাইরে এসে গানের আসরে বসলাম। অনেকক্ষণ গান শুনলাম, যাকে আমরা কাওয়ালী বলি। কিছু কিছু টাকা আমরা সকলেই কাওয়ালকে দিলাম। ইচ্ছা হয় না উঠে আসি। তবুও আসতে হবে। ’

বাংলাদেশে কাওয়ালিচর্চা ম্রিয়মাণ হলেও ভারত ও পাকিস্তানে কাওয়ালিসংগীতের উচ্চ মার্গীয় ঘরানা বংশপরম্পরায় অনুশীলন এবং পরিবেশন হয়ে আসছে। ভারতে ওয়াদালি ব্রাদার্স এবং পাকিস্তানে সাবরী ব্রাদার্স কাওয়ালিসংগীতে কিংবদন্তির মর্যাদা লাভ করেছেন। এই দুই শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশী দেশে কাওয়ালির প্রতি ভালোবাসা এক ও অভিন্ন।

ভারতে সমানভাবে জনপ্রিয় পাকিস্তানি গুলাম আলী, নুসরাত ফতেহ আলী খান, গুলাম ফরিদ সাবরী, মকবুল সাবরী, আমজাদ সাবরী, আবিদা পারভীন প্রমুখ। একইভাবে পাকিস্তানে সমান জনপ্রিয় পুরানচাঁদ ওয়াদালি, পেয়ারলাল ওয়াদালি, জাভেদ আলী, আজিম নাজা প্রমুখ। বলা বাহুল্য, তাঁদের অনেকেই বাংলাদেশে কাওয়ালি পরিবেশন করেছিলেন। তখন কিন্তু এমন ‘রাজনৈতিক’ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।

প্রতীয়মান হচ্ছে, কাওয়ালির পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থানে গোপনে শক্ত অবস্থান নেবে তৃতীয় কোনো পক্ষ। ঘটনার আড়ালে থাকা কুশীলবদের উদ্দেশ্য পূরণের সুযোগ আমরা দেব কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষণের সময় এসেছে। তবে সময় কাউকে ছাড় দেবে না, তা নিশ্চিত বলা যায়।

কর্মফল কেমন হতে পারে, তা নিয়ে শিল্পী ওয়াদালি ভাইদের একটি জনপ্রিয় কাওয়ালিকাহিনির আশ্রয় নিলাম।

সৃষ্টি আর স্রষ্টার প্রেম কেন্দ্র করে তাঁদের প্রতিটি কাওয়ালিতে একটি শিক্ষামূলক রূপক গল্প থাকে।

একজন ফকির বাবা মাজার প্রাঙ্গণে বসে এক সুন্দরী মহিলার চুল আঁচড়ানো দেখছিলেন গভীর মনোযোগ দিয়ে। মহিলার গায়ের কাপড় যখন হালকা খসে পড়ছিল, তখন সেই সুন্দর শরীরের দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলেন না ফকির। তাকিয়ে তাকিয়ে বিড়বিড় করছিলেন।

দৃশ্যটি সেই মহিলার স্বামী দেখতে পেয়ে মেজাজ হারালেন। তাঁর স্ত্রীকে এভাবে এক ফকির দেখছেন, দেখে তাঁর রাগ হলো খুব।

‘বদমাইশ ফকির’ বলে হাতের স্যান্ডেল দিয়ে কয়েকটি আঘাত করল ফকির বাবাকে।

ফকির বাবা মনে অনেক দুঃখ পেলেন।

দুই হাত তুলে সেই মহিলার স্বামীকে দেখিয়ে ওপরওয়ালাকে নালিশ করলেন, এটাও কি তোমার সৃষ্টি?

ওপরওয়ালা ফকিরের অভিযোগ শুনলেন।

ফকিরকে পিটিয়ে হাতের সুখ মিটিয়ে ওই সুন্দরী মহিলার স্বামী মাজারের সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে অনেক নিচে পড়ে গেলেন এবং মাথায় আঘাত পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে মারা গেলেন।

এবার মাজারের লোকজন হৈহৈ করে ফকিরের কাছে এসে অভিযোগ করল, তাঁর বদদোয়ার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। কেন ফকির হয়ে তিনি এত বড় সর্বনাশ করলেন? কেন ধৈর্য দেখাতে পারলেন না?

ফকির তখন অবাক হয়ে বললেন, ‘আমি কী করেছি? এটা ওই মহিলার মালিক আর আমার মালিকের বোঝাপড়া। আমাকে কেন দোষ দাও?’

একেই বলে ‘বন্দিশ-এ মালিক হোতা!’

লেখক : তথ্যচিত্র নির্মাতা, লেখক ও চিকিৎসক



সাতদিনের সেরা